কাগজের পাঁজা ঘাড়ে হেদোর ধারে দাঁড়িয়ে হেদোচ্ছি, কতক্ষণ ধরে জানি না, হঠাৎ দেখি একটি মেয়ে বইখাতা হাতে ওধারের ফুটপাথ ধরে চলেছে।
কিশোরী মেয়ে! চমক লাগল কেমন! রিনি! রিনিই না?
ট্রাম বাস মোটর কোনোদিকে না তাকিয়ে পড়ি কি মরি হয়ে ছুটে গেছি আমি ওধারে। পড়েছি প্রায় মেয়েটির ঘাড়ের ওপর।
হতচকিত হয়ে সে দাঁড়িয়েছে–কী?
না, রিনি নয়। আমি অপ্রস্তুতের মত বলেছি- কাগজ নেবেন একখানা? আজকের কাগজ? মহাত্মা গান্ধী বলিয়াছেন…
আর বলতে হল না। মেয়েটি কোন কথা না বলে দাম দিয়ে কাগজখানা নিয়ে পাশের গেটের ভেতর দিয়ে সেঁধিয়ে গেল সটান।
দেউড়ির মাথায় দেখলাম, ঘোরালো সাইনবোর্ডে লেখা : বেথুন স্কুল অ্যাণ্ড কলেজ।
দেখেই আমার চক্ষুস্থির! আরে, এখানেই রিনি পড়ে যে! এখানে পড়ানোর জন্যেই তো ওকে চাঁল থেকে নিয়ে আসা হয়েছে।
এ কী! যে পর্বত কিনা মহম্মদের ডাকে সাড়া দেয় না, তাই কি আজ মা পার্বতীর দয়ায় এই আহাম্মকের কাছে এসে গেল–না চাইতেই!
আহিরিটোলার পথ নাই চিনলাম, নাই কেউ দেখালো আমায়-আমার চাইনেকো আর। আহিরিটোলার আহরিণীকে আমি এখানে দাঁড়িয়েই আহরণ করতে পারব। আমার কাগজের ফেরি নিয়ে সেখানে ঘোরাফেরা না করেও সেই বনহরিণীকে আমি ধরতে পারব এখানেই। অনায়াসে।
বেচতে পারি আর না পারি, আমার পসরা নিয়ে এই পথেই আমি দাঁড়াব এসে রোজ। রোজগার হোক বা না হোক।
একটি দুটি করে আরো আরো মেয়েরা আসতে লাগল একে একে। একা একা, জোড়ায় জোড়ায়–বড় মেয়ে, মেজ মেয়ে, ছোট ছোট মেয়ে যত।
আর আমিও হাঁকতে লাগলাম জোর জোর–আনন্দবাজার? আজকের আনন্দবাজার। মহাত্মা গান্ধী বলিয়াছেন, আর দশ মাসের মধ্যে স্বরাজ দিব।
মহাত্মা গান্ধী ঠিক কী কথাটি যে বলেছেন জানি না, কাগজে চোখ বোলানোর ফাঁক পাইনি তখনো, কিন্তু ঐ বড়ো খবরটা মোটা মোটা হরফে গোটা পাতা জুড়ে কাগজের মাথায় জানানো হয়েছিল। যা পথচলতি লোকেরও চোখে না পড়ে যায় না।
সেই কথাটাই হাঁকছিলাম খালি খালি। আর কাগজ বিক্রি হচ্ছিল চোটপাট। আমার হাঁকডাকে চকিত হয়ে প্রায় মেয়েই কিনছিল একখানা করে।
সংবাদ পরিবেশনায় এই বাহাদুরি–এই নিত্য নতুনত্ব এখনকার মত তখনো ছিল ওই আনন্দবাজারের। এই নৈপুণ্য, এই স্বকীয়তা আর এই বৈশিষ্ট্য তার গোড়ার থেকেই।
প্রতিদিনকার জোর খবরটা জোরালো অক্ষরে ছাপানো থাকত পাতা জুড়ে। কাগজের মাথায়। কারো চোখে না পড়ার কোনো ওজর ছিল না।
এতে করে আমার কাগজ কাটানোর যা সুবিধা হতো!
দেখতে দেখতে সব কাগজ কেটে গেল আমার–শেষ মেয়েটিও চলে গেল কলেজের ভেতর।
পড়ে রইল খালি একখানা বসুমতী। এটা আর বেচব না। নিজেই আমি পড়ব এখন এক সময়।
রিনি আজ ইস্কুলে আসেনি কিন্তু। কেন আসেনি? অসুখবিসুখ করেছে নাকি ওর? নাকি বিয়েই হয়ে গেল শেষমেশ?
না না, এখনই বিয়ে হবে কী, ওইটুকুন তো মেয়ে-মায়ের চোখে হলেও, সত্যিই ওর বিয়ের বয়েস হয়েছে নাকি? এনট্রেন্স পাশের আগে বিয়ে করবে না বলেছিল না সে? তাই ভেবেই আমি নিজেকে ভরসা দিতে চাই। সান্ত্বনা পাই।
আজ আসেনি, কাল সে অবশ্যি আসবে। কদিন ইস্কুল কামাই করবে? তবে আমি দেখতে পাবই…একদিন না একদিন…এই এখানেই। নিশ্চয়!
রিনিকে দেখতে পাব ঠিকই, কিন্তু সেই ছেলেটির দেখা বোধ হয় পাব না আর। ভেবে মন ভার হয়। ভবানীপুরের থেকে যদি সে কোনদিনও এধারে আসে, কোনো রাস্তার মোড়েই আমার পাত্তা পাবে না। আমি যে কাগজ ফেরিতে বেরিয়ে ওয়েলিংটন-বউবাজার-হ্যারিসন রোডের সব ফেরিঘাট পেরিয়ে ফেরারী হয়ে শেষে এখানে এসে ঠেকেছি তা সে টের পাবে কি করে?
হাতিবাগান-ফেরত সেই ভদ্রলোককে এবার বাজারের থলি হাতে ফিরতে দেখা যায়।
ও বাবা! তোমার সব কাগজই যে এর মধ্যেই বেচে ফেলেছছা দেখছি! দেখে বিস্মিত হন।–না, একখানা রয়েছি দেখছি এখনো। দাও, তাহলে ওটা আমিই কিনে নি না-হয়।
তিনি ট্যাঁক থেকে পয়সা বার করেন।
না, এখানা আমি বেচব না মশাই!
বেচবে না, তার মানে? তিনি বিস্মিত আরও।
মানে, এটা আমি নিজেই পড়ব বলে রেখেছি।
তুমি পড়বে! তুমি পড়বে কাগজ! তাঁর বিস্ময় যেন ধরে না-পড়তে পারো তুমি? পড়লে বুঝতে পারবে? লেখাপড়া শিখেছ নাকি? পয়সাটা তিনি ফতুয়ার পকেটে ভরেন আনন্দবাজারটা পড়েছি, তখনি পড়া হয়ে গেছে আমার–বসুমতীটা কিনতে চাইছিলুম তাই। তোমার ভালোর জন্যেই বাপু!
আমার ভালোর জন্যে আপনাকে ভাবতে হবে না।
চিনির বলদ চিনি খায়, কাগজের হকার কাগজ পড়ে! অবাক কান্ড! বিড় বিড় করে বিরক্তিভরে তিনি চলে যান।
শুধু পড়ি না মশাই! এই কাগজে আমি লিখিও। লিখেও থাকি তা জানেন? ইচ্ছে হল ডেকে বলি ওনাকে। কিন্তু যেমন হন্যে হয়ে সকালে তিনি বাজার করতে বেরিয়েছিলেন তেমনি হন হন করে বাড়ির দিকে চলেছেন এখন।
এবং বললে পরে কথাটা প্রায় মিথ্যেই বলা হতো নাকি? বসুমতী কি আনন্দবাজারে একছত্রও আমি লিখিনি তখনো, লেখার কল্পনাও ছিল না আমার, (লিখেছিলাম তার অনেক অনেক দিন পরে) তবে বিজলীতে লিখেছিলাম তো ঠিকই। আর বিজলী কিছু বসুমতীর চেয়ে খাটো নয় কোনো দিকেই।
হাতের কাগজখানা নিয়ে হেদোর ভেতরে গিয়ে বসলাম-ঘেরাটোপের ছত্রছায়ায়।
কয়েকখানা বেঞ্চি জুড়ে জনকয়েক ঘুমোচ্ছিল আয়েস করে। তাদের কারো আরামের বিঘ্ন না ঘটিয়ে একজনের পায়ের তলায় একটুখানি ফাঁক পেয়ে সেখানে বসেই কাগজটা পড়তে লাগলাম।
