মন খারাপ করো না। বলেছি তো, তোমার সঙ্গে সিনেমায় যাব আমি আজকে। সে আমার দুঃখ দূর করতে চায় : এলফিনস্টোন তো? নটার শোর দুখানা টিকিট কেটে ফোর্থ ক্লাসের গেটে দাঁড়িয়ে থাকব ঠিক সময়ে তোমার অপেক্ষায়…বলছি তো আমি।
দুঃখ কিসের! জন্মেছি যে সেই ভাগ্যি! যে-কুলে যেভাবেই জন্মাই না-হওয়াটাই বড়ো কথা। কিছু যদি নাও হতে পারি, কিছু তো হবোই। হয়েছি তো…হচ্ছি তত…হলেই হোলো!
.
বউবাজারের কর্ণার থেকেই কি শুরু হোলোকাগজ নিয়ে ফেরি করতে দাঁড়াইে না! একশ গজ ঠিকরে পড়লাম।
আরে ইয়ে বংগালি ফিন কাঁহাসে আয়া রে! গুঞ্জন উঠল সেখানকার হকারদের ভেতর। মৌচাকে ঢিল পড়লে যেমনটা হয়।
দো চার মুক্কা লাগা দেও না, আভি ভাগি।
মনে করেছিলাম ওদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারব কিন্তু মৌরসী পাট্টার বনেদীরা সহজে বনে না। কায়েমী স্বার্থ আপস করতে জানে না।
মুক্কার কথা উঠতেই আমি নিজেকে গুটিয়ে নিই, বেমক্কা পড়ে পড়ে মার খাওয়ার চেয়ে বেমুক্কা এখান থেকে সরে পড়াই শ্রেয়। এক ধাক্কায় চলে যাই মীর্জাপুরের গোড়ায়।
গোলদীঘির রেলিং-এর ধারে দাঁড়িয়ে হাঁকি–আনন্দবাজার! আনন্দবাজার! জোর জোর হাঁকতে থাকি।
আমার শোরগোল একজনের কানে লাগে–এমন বিটকেল আওয়াজ ছাড়ছো কেন হে? চেঁচাচ্ছ কেন এখানে দাঁড়িয়ে? এখানে তোমার আনন্দবাজার কিনবে কে? পয়সা দিয়ে কিনতে যাবে কেন শুনি? যখন একটুখানি এগিয়ে গেলে দীঘির ওপারে গিয়ে শ্রীগৌরাঙ্গ প্রেসের গায়ে লাগানো আনন্দবাজার অমনি অমনি পড়তে পাওয়া যায়?
কথাটা আমার মনে লাগে। আরে, আমিও তো তাই ভেবে রেখেছিলাম আজ সকালবেলায়।
কাগজ নেবার কালে প্রথমটায় ভাবলাম যে, শেষ কাগজখানা বেচব না, নিজের পড়ার জন্য রাখব। তার পরেই ভেবে দেখলাম, যদি সব কখানাই বেচা যায়, একটা কাগজও বেঁচে যায় মন্দ কী! বিকেলে যখন আপিসে টাকা জমা দিতে আসব তখন বাইরের দেয়ালে সাঁটা (আমার নজরে ঠেকেছিল তখনই) কাগজটা পড়ে নিলেই চলবে তো!
সেখান থেকে সরে চলে গেলাম সোজা হ্যারিসন রোড়ের ধারে-কেষ্টদাস পালের ছত্রতলে।
মর্মর মূর্তির এলাকায় কাগজের ফেরিওয়ালা ছিল না একজনাও। হকারদের জমায়েত ছিল মুখোমুখি ঠিক তার উল্টোদিকে। খদ্দেরেরও ভিড় ওধারেই।
জনাকয়েক বাঙালীর ছেলেও বেচছিল সেখানে দেখলাম। বিক্রি হচ্ছিল বেশ তাদের। কিন্তু হিন্দুস্তানীরা খানিক পরেই রুখে উঠল তাদের ওপর। কিন্তু ছেলেগুলোও দেখলাম বেশ তেড়িয়া, কোনো তাড়নাতেই নড়বে না সেখান থেকে।
পিঠোপিঠি পিটাপিটি শুরু হয়ে গেল। দোরোখা কিলচড়ঘুষি দু তরফে। ছেলেরাও ছাড়বার পাত্র নয়। যেমন মার খাবার তেমনি মারবার জন্যে তৈরি। দু পক্ষই নাছোড়বান্দা।
ঠেকে শেখার চেয়ে দেখে শেখা ভালো, বলতেন বাবা। তাছাড়া, যার বাহুবল নেই, মারামারির মধ্যে যাওয়া তার পক্ষে বাহুল্য। শখ করে ঠোকাঠুকির ঠক্করে না গিয়ে অলক্ষ্যে সেখান থেকে সরে পড়াই সমীচীন বোধ করলাম।
ভবী যেমন নিজের ভবিষ্যৎ ভোলে না তেমনি প্রথম আখর দেখেই আখেরের কথা ঠাউরে নিতে পারে।
দুর্জনদের দূরে পরিহার করে দূর থেকে নমস্কার ঠুকে সুদূরপরাহত হয়ে গেলাম। চলে এলাম ঠনঠনের মুখে।
সেখানে শুধু ভক্তজনের ভীড়। মা কালীর চন্নামৃতের তৃষ্ণা সবাইকার, খবরের খিদে নেই কারোই। বিশেষ সুবিধা না করতে পেরে সেখান থেকেও সরতে হোলো।
শঙ্কর ঘোষ লেন, শিবনারায়ন দাসের গলি, কৈলাস বোস স্ট্রীট একে একে পার হয়ে শেষে দাঁড়ালাম গিয়ে বিবেকানন্দ স্পার-এ। সোড়াপত্তনের কালে বিবেকানন্দ রোড়ের ঐ নামটাই ছিল তখন। সেখানেও কিন্তু কাগজের চাহিদা নেই।
একটা এসপার ওসপার হয়ে যাক তাহলে।
স্পারের পাড়া পার হয়ে কাগজের তাড়া নিয়ে হোদোর মোড়ে গিয়ে খাড়া হলাম। এক ভদ্রলোক বাজারের থলি হাতে হন্তদন্ত হয়ে এলেন।–দেখি তো আজকের কাগজটা।
তাঁর হাতে একখানা তুলে দিলাম। তিনি গোটা গোটা আখরের খবরে মোটামুটি চোখ বুলিয়ে মেজ মেজ ঘোট ঘোট হরফের ছোটখাট সংবাদগুলো খুঁটিয়ে দেখলেন। আমি অপলক প্রত্যাশায় তাকিয়ে রয়েছি।
মিনিট পনের ধরে কাগজখানার আগাপাশতলা নজর দেবার পর আমার হাতে ফিরিয়ে দিলেন আবার–এই নাও বাপু,তোমার কাগজ।
আমি অবাক বিস্ময়ে চেয়ে রয়েছি দেখে অযাচিত উপদেশ দিলেন আমায়–এখানে বারা তোমার এক কপিও কাগজ বিক্রি হবে না। হেদোয় লোকে বেড়াতে আসে আর সাঁতার কাটতে আসে, সকালে বিকালে হাওয়া খায়–এখানে কারো কাগজ পড়ার গরজ নেই। কাগজ যদি বেচতে চাও তো চলে যাও হাতিবাগানের মোড়ে, নয়ত সেই শ্যামবাজারের পাঁচমাথায়। এখানে তোমার কাগজ কিনবে কে?
আপনি অন্তত একটা কিনবেন আশা করেছিলাম। আমি বলি। সত্যি, ওঁর হাতেই আজকের বউনিটা হবার ভরসা ছিল আমার। কিন্তু বউনির বদলে পেলাম বকুনি। এবং কিছু কথার বুকনিও।
আমার এখন কাগজ পড়ার ফুরসত আছে নাকি? আমি যাচ্ছি এখন হাতিবাগান, বাজার করতে বেরিয়েছি দেখছ না! দৃষ্টান্তস্বরূপ থলিটা আমার নাকের উপর তুললেন–একদণ্ডও সয় আছে আমার!
বেশ তো মশাই এতক্ষণ ধরে পড়লেন আমার কাগজ। তার তো সময় ছিল খুব। কাগজ পড়ার ফুরসত ছিল আর কেনবার বেলাতেই.ইচ্ছে হলো বলি একবার। কিন্তু বলব কাকে? ততক্ষণে তিনি হাতিবাগানের দিকে সাত হাত এগিয়ে গেছেন।
