তাহলে…তাহলেই বা কি! কোনো ক্লাসেই আমি পাশ করতে পারব না। সব পরীক্ষাতেই ফেল যাবো নির্ঘাত!
ফেল যাবে? ফেল যাবে কেন?
আঁকেই আমার আটকাবে। নিজের আতঙ্ক প্রকাশ করি-সামান্য যোগবিয়োগই কষতে পারব না, ভুল হবে, ফলে মিলবে না, একেকবার একেক রকম ফল হবে। আর গুণ ভাগ…? নিজের গুণভাগ আর জাহির করি না- তাহলে দেখছি সেই কেঁচে গণ্ডুষ করে তোমার ওই ইনফ্যান্ট ক্লাসেই ভর্তি হতে হবে আবার। হাফপ্যান্ট পরে সেই ইনফ্যান্টে।
আমার কথায় আমার গুণপণা প্রকাশ পায়।
ইনফ্যান্ট ক্লাসে? ছেলেটা হাসে।
এ বি সি ডি আর অ আ ক খ ছাড়া কিছুই আমি জানি না যে। আমার অকপট কবুলতি-অক্ষর পরিচয় হয়েছে শুধু আমার। স্বাক্ষর করতে পারি কেবল।
সেটাও কি দেবাক্ষরে নাকি? আরো তার হাসি দেখা যায়। নাকি তোমার বুড়ো আঙুলের টিপসই দিয়ে?
মা সরস্বতীকে চিরকাল বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এলাম না? তার টিপের ওপর আমার টিপ্পনি।
তাহলে ওই মতিশীলের দরজা তোমার বন্ধ। সে বলে।
বললাম না তোমায়, আহিরিটোলার রাস্তাটা নিয়ে দাও আমাকে সেখানে গিয়ে কাগজ বেচি গে… তা তুমি কেয়ারই করলে না। এখন আবার তুমিই নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছো!
সেখানে গিয়ে কোনো লাভ হতো না তোমার। কটা কাগজ বিক্রি হবে সেখানে? আহিরিটোলায় তো খালি হিন্দুস্তানী গয়লাদের খাটাল।
গয়লাদের খাটাল? তাই নাকি? তা, নামটা শুনে তাই মনে হয় বটে, গয়লাদের আহীর বলে থাকে মৈথিলী ভাষায়…বৈষ্ণব পদাবলীতে পড়েছি না? আহরিণী গোয়ালিনী মুঞি কোন্ ছার। পরাণ নিছিয়া দিনু চরণে তোমার…
তার মানে?
তার মর্ম তোমাকে আমি ঠিক বোঝাতে পারব না। কোনো গোপনারী শ্রীকৃষ্ণকেই বলছে বোধ হয়, সামান্য গয়লার মেয়ে আমি, আমার মনপ্রাণ সব তোমার পায়ে বিকিয়ে দিলাম… আমার ভাষাজ্ঞান প্রকাশ পায়-মর্মটা হচ্ছে এইরকম। মর্মান্তিকও বলা যায়।
কিন্তু ভাই, এই আহিরিটোলায় আমি গেছি তো বার কয়েক, কোনো আহরিণীর দেখা পাইনি কখনো। সেখানে কোনো গোপনারী নেই হে, সব গোপ। ইয়া ইয়া গোঁফ সবার।
বলে সে তা দিয়ে দেখায়–যে গোঁফ তার গজায়নি তাইতেই। তাহলে থাক গে। কাজ নেই সেখানে গিয়ে। আজ নটার শোয়ে আমরা সিনেমায় যাব তো? যাবে তো তুমি? এলফিনস্টোন পিজ্জার প্যালেসে চমৎকার একটা ছবি দেখেছিলাম, সেটা আবার এসেছে সেখেনে। আমি আবার দেখব। দারুন ছবি!
কী রকম শুনি?
একটা ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে। আমাদের চেয়েও ছোট। বাপমার ঠিকানা নেই তার, এক অনাথ বালক। ইস্কুলের সামনের খোলা মাঠে তাকে আর সব ছেলের সঙ্গে খেলা করতে দেখা গেল। বড়লোক মেজলোকের ছেলে সবাই, চমৎকার পোশাক পরা তারা : সে-বেচারার তেমন ঝলমলে জামাটামা কিছু ছিল না। না থাক, ছেলেদের ভেতরে তো কোনো ভেদাভেদজ্ঞান নেই–তাদের সঙ্গে সমানে মিলেমিশে খেলছিল সেও। খেলাধূলার মধ্যে তাদেরই একজন হয়ে গেছল যেন সে। তারপর খেলতে খেলতে, ইস্কুল খোলার ঘন্টা যেই পড়ল না, ছেলেরা সবাই ছুটে গেল ইস্কুলে, সেও ছুটল তাদের সাথে সাথে। কিন্তু আর সব ছেলেরা ভেতরে ঢুকে যাবার পর সে যখন গেটের সামনে এসে দাঁড়ালো-লোহার রেলিং-দেওয়া দুধারের গেট দুটো আপনার থেকেই এসে বন্ধ হয়ে গেল তার সম্মুখে।
আপনার থেকেই? ম্যাজিক নাকি?
প্রায় ম্যাজিকের মতই। গেটের ধারেকাছে দারোয়ান-টাবোয়ান কেউ ছিল না, কাউকে বন্ধ করতে দেখলাম না গেট…আপনার থেকেই সেটা তার মুখের ওপর বন্ধ হয়ে গেল যেন কেমন করে।
আশ্চর্য।
ছেলেটার মুখের চেহারা যদি দেখতে তখন! ওধারে অত ছেলে…ক্ষণিক বন্ধুরা ওর…হাসছে লাফাচ্ছে। এধারে সে একলাটি। কেউ তার দিকে ফিরেও চাইছে না। ছেলেটার মুখের দিকে তাকানো যায় না, কান্না পায় এমন!
সেই কান্না পাবার ছবি দেখতে চাইছো তুমি আবার? সে অবাক হয়।
জানো ভাই, আমিও ওর মতই একটা ছেলে যে! আমার মা ছেলের জন্য মানত করে বিন্ধ্যাচলে পার্বতী দেবীর কাছে পুজো দিতে গিয়ে–পুজো দিয়ে ফিরে মন্দিরের বাইরে এসে কুড়িয়ে পেয়েছিল আমাকে। সেই জন্যেই আমার ডাকনাম পার্বতীচরণ, তা জানো?
দূর! তা কি হয় নাকি?
আমার দশাও ঐ ছেলেটার মতই হবে বোধ হচ্ছে। ওর মতন আমিও কোনোদিন ভদ্রসমাজে ঠাঁই পাব না। আমার সঙ্গেও মিশবে না কেউ। যেদিকেই যাব, সব জায়গায় দরজা আমার মুখে ওপর বন্ধ হয়ে যাবে ওর মতন…ওমনি করেই।
কী সব আজেবাজে বকছো! যা-তা ভেবে মন খারাপ করছো নাহক। সে আমাকে সানা যোগায়; ওসব ভেবে মন খারাপ কোরো না মিথ্যে।
না, মন খারাপ করার কিছু নেই। করছিও না। বাবা বলেন, দৈবায়ত্ত কুলে জন্ম মমায়ত্ত তু পৌরুষ। মহাভারতের কথা, কর্ণ বলেছিল। কাকে বলেছিল জানিনে।
বলেননি সেটা তোমার বাবা?
না, বলেছিল হয়ত বাবা, মনে পড়ছে না আমার। উৎকর্ণ কাউকে বলেছিল নিশ্চয়। অর্জুনকেই বলে থাকবে মনে হয়…
অর্জুনকে?
হ্যাঁ। যে কর্ণপাত করবে তাকেই তো বলবে? আর, অর্জুনই তো কর্ণপাত করেছিল জানি। কর্ণকে সেই নিপাত করেছিল মা?
অন্যায় যুদ্ধে। ছেলেটা বলে : অন্যায় যুদ্ধে কর্ণপাত করাটা ভারী অন্যায় হয়েছিল অর্জুনের। ঐ কথাটার জন্যেই যদি করে থাকে তো আরো অন্যায়। আরো ঘোরর অন্যায়। কেন, কথাটা এমন কিছু খারাপ কথা নয়।
নয়ই তো। কিন্তু আমার কথা আলাদা। কোন কুলে যে জন্মেছি তাও জানিনে, আবার এদিকে এক কড়ার পৌরুষও নেই আমার…
