হ্যাঁ। এক-আধটা লিখেছি কেবল। ঐ কবিতাই।
চাঁপদাড়িওয়ালা কোনো বয়স্ক লোকই হবে শিবরাম–এই আমরা ঠাউরেছিলাম।
শুনে আমি গালে হাত দিই। নিজের গালে।
দাড়ি পাবো কোথায়? আমাকে ছেলেমানুষ দেখে ভারী হতাশ হয়েছেন মনে হল।
লেখার হাত আছে তোমার, হাতের লেখাটাও বেশ পাকা। তিনি বলেন–তাই দেখেই ঐ সন্দেহ হয়েছিল। খাতার পর খাতা লিখে লিখে বোঝাই করে হাত পাকিয়েছ বুঝি?
না না। বেশি কী লিখেছি এমন! ঐ দুয়েকটাই। আমি জানাই–ভারতীতে আর বিজলীতেই বেরিয়েছে যে-কটা। আচ্ছা, আপনাদের উনপঞ্চাশী কে লেখেন? আর ওই খড়কুটো? ওগুলো খুব ভালো লাগে আমার।
মার্ক টোয়েনের থেকে আমি হাসির প্রেরণা পেয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু মনে হয়, ব্যঙ্গরচনার আমার প্রথম উদ্দীপনা ঐ উনপঞ্চাশীতে। সেই উনপঞ্চাশ বায়ুর প্রকোপেই আমি যেন খড়কুটোর মতই ভেসে গিয়েছি-এতদিন ধরে আমার এই অল্পবিস্তর লেখার সেইখানেই বুঝি উৎসাহ। উৎসর থেকেই অঙ্কুরিত আমার এই উৎসার। হাসির গল্পে এত উৎবসব এতদিনকার!
আমার কথার কোনো জবাব না দিয়ে নলিনীদা শুধোলেন–কী ছিল যেন তোমার কবিতাটা?
জানি জানি/সবাই সবে ছাড়বে। চলার পথে/কে কার…।
ঐ অব্দি গিয়েই আমার কেকা-ধ্বনি থামাতে হয়। খট্কার ছিটকিনিটা ভেতর থেকেই কে যেন এঁটে দেয়। বাবা! এই বোমারুদের সামনে চুমা দিয়ে এগুবো? সাহস হয় না আমার। যদিও আমার ধারণায় বোমা আর চুমা একই ধরনের প্রায়। দু-ই তোমায় মুহূর্তের মধ্যে আকাশে উড়িয়ে নিয়ে যায়।
কে কার চুমু কাড়বে। তিনি নিজেই কবিতাটাকে পদস্থ করেন। তারপরে শোনো শোনো বারীন! হাঁকেন তিনি। শুনছো!
ঘরের কোণায় আরো দুজনা বসেছিলেন। নলিনীদার কথায় তাঁরা মুখ ফেরালেন।
উপেনদা, দেখেছেন ছেলেটাকে? সেই শিবরাম।…যুগান্তকারী লোকদের কাছে যে যুগান্তকারী কবিতা পাঠিয়েছিল।…।
নলিনীদা বিশেষ অত্যুক্তি করেননি। সেকালের বাংলা লেখায় চুমুর ছড়াছড়ি তেমন দেখা যেত না। কবিগুরুর সেই বিখ্যাত সনেটটি বাদে শরৎচন্দ্রের কিরণময়ীই দিবাকরের ভিজে ঠোঁটের উপর একটা চুমু খেয়েছিল যা! শুনে আমি ভিজে বেড়ালটির মত চুপ করে থাকি।
ঘরে ঢোকামাত্র দেখেছি, একটা বর্ণচোরা আম। উপেনদা একটু দৃম্পাত করেন মাত্র। এক নম্বরের এঁচোড়ে পাকা। দেখলেই বোঝা যায়। নিজগুণেই পেকেছে, কাউকে কিলিয়ে পাকাতে হয়নি।
এক নজরেই উপেনদা ঠিক চিনে নিয়েছিলেন আমাকে।
বারীনদা কিছু বললেন না। তিনি যেন একটু গম্ভীর প্রকৃতির বলেই আমার বোধ হয়।
ছেলেটার সাহস তো কম নয়! বোমার লোকদের কাছে চুমার তত্ত্ব পাঠানো! ঠাট্টার ছলেই কথাটা বলেন যেন নলিনীদা।
উনপঞ্চাশী কে লেখেন তুমি জানতে চাইছিলে না? ঐ উপীনদা, আমাদের উনিই লেখেন। আর খড়কুটোর টিপ্পনীগুলো আমরা সবাই মিলে বানাই, বুঝেছো?
ভারী চমৎকার হয়। ঐ দুটোই। দুটো অবশ্যি দুরকমের চমৎকার।
তারপর কাজের কথা চুকে গেলে পর সেখান থেকে আমরা বসুমতীতে গেলাম–সেখান হয়ে গোলদীঘির শ্রীগৌরাঙ্গ প্রেসে। আমার সঙ্গী ছেলেটির সহায়তায় সব জায়গাতেই সহজে কাগজ পাবার ব্যবস্থা হয়ে গেল। কাল সকাল থেকেই কাগজ নিয়ে বেচতে লাগব ঠিক হল। সন্ধ্যেবেলায় কমিশন বাদে কাগজের দাম আপিসে জমা দিয়ে এলে পরের দিন ফের আবার কাগজ পাবার বন্দোবস্ত।
ছেলেটা বলল, ইচ্ছে করলে তুমি ওয়েলিংটন স্কোয়ারের মোড়েও কাগজ বেচতে পারো কাল থেকে।
আর তুমি? তোমার কোনো অসুবিধা হবে না?
আমি ভাবছি ভবানীপুরের দিকে যাব। সেখানে কাগজ বেশি কাটে বলে শুনেছি।
না। ওখানে কাগজ বেচতে পারব না আমি। আমার একটু অসুবিধা আছে। ফর্বেস ম্যানসন ছেড়ে এসেছি না আমি? তারই সামনে দাঁড়িয়ে…
কোথায় বেচবে তাহলে?
ঐ ওয়েলিংটনের মোড় ছাড়া যে কোনো জায়গায়। কিন্তু এখান থেকে তুমি চলে গেলে তোমার পাত্তা পাব কোথায়?
মতিশীলের ইস্কুলে। টিফিনের ঘন্টা পড়লেই আমি বেরিয়ে পড়ি। মল্লিকবাড়ি খেতে যাই তো। তখনই খেতে দেয় সবাইকে।
আমাকেও সেখানেই যেতে হবে খেতে মনে হচ্ছে। আমি কই–কাগজ বেচে যা এক-আধ টাকা লাভ হবে তা যদি খেয়েদেয়েই ফুকে দিই তো সিনেমা দেখব কিসে? একটা করে ছবি তত রোজ দেখতেই হবে আমাকে-নটার শোয়ে অন্তত।
শোয়ের পরে শোয়ার কথাটা মনে পড়ে যায়-খাওয়ার ধান্দাটা চুকলো না হয়, কিন্তু শোবো কোথায়? রাত কাটাব কোনখানে হে? তোমাদের ওই ইস্কুলে তোমার কাছে শুতে যাই যদি? যে পাড়াতেই কাগজ বেচো না, শুতে তো হবে তোমায় সেইখানেই।
সেইখানেই শোব বটে, কিন্তু দারোয়ান তো তোমায় অ্যালাউ করবে না ভাই! হেডমাস্টারের পারমিশন পেলে তবে সে দেবে। তাহলে আমাদের ইস্কুলে ভর্তি হতে হবে তোমাকে।
বা রে! ইস্কুলে ভর্তি হব কি! কলেজের ছেলে না আমি? কয়েকদিনের হলেও ন্যাশনাল কলেজে পড়েছি তো।
তাতে কি! লোক দেখানো ইস্কুলে অ্যাটেণ্ড করবে কেবল, তাহলেই হবে। ফ্রী ইস্কুল তো, বেতন-টেন লাগে না তো আর।
তাহলেও ভর্তি হতে গেলে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট লাগে না? সেসব আমি পাচ্ছি কোথায়?
ট্রান্সফার সার্টিফিকেট দিলেই কি না দিলেই কি! ওরা ওসব দেখে ভর্তি করে না। নিজেদের ইস্কুলে ছেলে নেবার আগে তাকে বাজিয়ে দ্যাখে। নিজেরা পরীক্ষা করে দেখে তবে নেয়। যে ক্লাসের যে, উপযুক্ত সেই ক্লাসেই তাকে ভর্তি করে।
