তোমার টাকা রয়েছে যে তাঁর কাছে…
থাকগে।
নেবে না তোমার টাকা?
কী হবে টাকায়? টাকার আমার কোনো দরকার নেই আর। ইচ্ছে করলে তুমি সেটা নিতে পারো চেয়ে।
শুনে সে একটু খুশি হয়। আর আসবে না এখানে কখনো?
কী প্রয়োজন?
আর কিছু না হোক, তোমার পরীক্ষার ফলাফলটা জানাতে?
তার জন্যে কোনো মাথাব্যাথা নেই আমার–যা হবার হবে, সারা জীবনটাই তো পরীক্ষা। জীবনভোরই চলবে এই! বলেই আমি পা বাড়াই।
ও পথে যেয়ো না ভাই! মারা পড়বে বেঘোরে। আমার হিতচিকীর্ষায় সে সদুপদেশ দিতে আসে।
কোন পথের কথা কইছো? থমকে দাঁড়াতে হয় আমায়-চমক লাগে ওর কথাটায়।
ঐ ইলিসিয়াম রো-এর পথ। গোয়েন্দাগিরির অনেক ঝামেলা, অনেক জ্বালা। কাঁচা টাকা হাতে আসে বটে, কিন্তু একটু গড়বড় হলেই মারা পড়তে হয়। হয় পুলিসেই মার লাগায় নয়তো অ্যানার্কিস্টদের হাতে খতম হতে হয় শেষটায়।
মনে থাকবে আমার। বলতে বলতে আমি এগোই। আরো সদুপদেশের অপেক্ষায় সেখানে দাঁড়াই না আর।
এই ভেবে সান্ত্বনা পাই, এই কদিনে নিজেও যেমন খেয়েছি এনতার, তেমনি বিপিনদাকেও খাইয়ে যেতে পারলাম খানিক।
আর কিছু না, ঐ ঘোল!
ছআনা দামের প্রায় ছত্রিশ গেলাশ বসিয়েছি এই ছদিনে। সবান্ধব চপ কাটলেট যে কতো ধ্বসালাম তার তো লেখাজোখা নেইকো।
আমার কাছে নেই অন্তত। থাকলে তাদের কাছেই রয়েছে-সেই বেচারাম বেচারাদের কাছেই। কেনারামের কোনো দায় নেই তার। তারা সবাই এখন গিয়ে ছিঁড়ে খাবে বিপিনদাকেই–পারে যদি। তাঁর কাছেই রেফার করার কথা।
নামমাত্র তো দাম না। সাতাশ টাকা তো নির্ঘাত, মনে মনে হিসেব কষে পাই।
আর তাঁর কাছে মজুত আমার সাত টাকা মাত্তর?
সাত টাকা থেকে সাতাশ টাকা বাদ দিলে কী থাকে?
মাইনাস বিশ। প্রায় বিষতুল্যই।
কিন্তু আমার কাছে নিছক আনন্দই!
এর চেয়ে ফুর্তি আর হয় না।
আর ফুর্তি নিজের মুক্তি লাভ করেও। সম্মুখে উন্মুক্ত ঐ পথ ধরে…স্বরাজলাভের পথে। পা বাড়াবার আগে রাজপথের স্বরাজ আমার হাতে এসে গেল।
.
৩৭.
পরদিন দেড়টা না বাজতেই আমি মতিশীলের দেউড়িতে।
টিফিনের ঘন্টা পড়তেই হকার বন্ধু সেই ছেলেটি বেরিয়ে এসেছে। স্কুলের গেটেই তাকে ধরা গেল।–তোমাদের দারোয়ান আমাকে আটকে রেখেছে ভাই। যেতেই দিচ্ছে না। ভেতরে।
দেবে না তো। হেডমাস্টারের হুকুম না হলে বাইরের কাউকে কি যেতে দেয় কখনো?
যাকগে, যেতে দাও। চলো এবার খবর কাগজের আপিসে যাওয়া যাক, কেমন?
মল্লিক বাড়ি যাচ্ছি যে এখন। এখনই যে খেতে দেয়, এই টিফিনের সময়টাতেই ফাঁক পাই খাবার।
খাবার জায়গায় অভাব নাকি কলকাতায়? এই গেটের থেকেই পেটে দিতে থাকে না। এখান থেকেই শুরু করা যাক। কেমন আলুকালি ঘুগনি সব বিক্রি হচ্ছে এখেনেই। ডালমুট, চানাচুর, চিনেবাদাম ছড়ান মোড়ে মোড়ে। খেতে খেতে যাই আমরা, যেতে যেতে খাই।
বাজে খরচা খালি। মল্লিকবাড়ি অমনি অমনি খেলে পেটও ভরে, তেমনি পয়সাটা বেঁচে যায় না আমাদের?
তোমার কোনো খরচা হবে না, আমি খাওয়াচ্ছি তোমায়।
তুমি কোথায় পাবে? কাল যে বললে তোমার কাছে কোনো পয়সাই নেই আর?
কাল ছিল না, আজ হয়েছে। ফাউন্টেন পেনটা বেচে দিলাম না সকালে? কী হবে আর কলম রেখে? লেখাপড়ার পাট চুকেছে, পরীক্ষাটাও মিটে গেল। কলমের আর কী দরকার আমার।
অমন ভালো কলমটা, অত শখের, বেচে দিলে অমনি?
কিনবো আবার কোনদিন। কাগজের দাম জমা দিতে হবে না আজ? সেইজন্যেই বেচতে হোলো
আহা, বললাম না তোমায় আমি, চেষ্টা করলে টাকা জমা না দিয়েও মিলত কাগজ? আনন্দবাজারের কর্তাদের তুমি জানো না ভাই! কী চমৎকার লোক যে সুরেশদারা! তাঁরা তো বাঙালীর ছেলেদের নিজেদের পায়ে দাঁড়াবার জন্যই উৎসাহ দেন, সবরকম সাহায্য করেন সব সময়। কেন নাহক বেচতে গেলে কলম!
ওর চেয়ে ভালো কলম কিনবো দেখো। কাগজ বেচে টাকা হোক না! চলল তো এখন।
আমরা বউবাজারের পথ ধরি। আগে বসুমতীর কাজটা সেরে তার পরে গোলদীঘিতে আনন্দবাজার কার্যালয়ে যাওয়া যাবে। তারপর সেখেন থেকে সে আমায় নিয়ে যাবে ২৩দেলখোশ কেবিন বলে খাসা একটা খাবার জায়গায়। হ্যারিসন রোড়ের মোড়ে।
ডানদিকের ফুটপাত ধরে যেতে যেতে চেরী প্রেস নজরে পড়ল আমাদের। বিজলীর সাইনবোর্ড লাগানো দেখলাম। দেখেই না আমি লাফিয়ে উঠেছি।
আরে, বিজলী যে! সাপ্তাহিক বিজলী। দেশের বাড়িতে যেত আমাদের। বাবা নিতেন। বোমারু বারীন ঘোষদের কাগজ। দ্বীপান্তর থেকে ফিরে এসে বের করেছে ওরা। বাবা ভারী ভক্ত তা জানো?
হপ্তায় একদিন বেরোয় মোটে। সে বললে : দৈনিক নয় তো।
নাই বা হোলো। এ কাগজও তো বেচতে পারি আমরা? পারি না? পাওয়া যায় না বিজলী?
কেন যাবে না। একই কমিশন, ওই টোয়েনটি ফাইভ পারসেন্ট। বিজলীরও খুব বিক্রি, আমি জানি। ভেতরে গিয়ে খোঁজে নেওয়া যাক, এসো।
হৃষীকেশ কাঞ্জিলাল বিজলীর ম্যানেজার। মাটির মানুষ। এমন ঠান্ডা শান্ত প্রকৃতির যে, বোমার দলে কখনো যে ছিলেন তা ভাবাই যায় না। ভোলানাথের মতন চেহারা। আস্তে আস্তে কথা কন।
আমাদের আরজি শুনে সহজেই রাজী হয়ে গেলেন। নাম-ঠিকানা টুকে নিলেন আমাদের।
আমার নামটায় কেমন একটা খটকা লাগল তাঁর। একটুকরো চিরকুটে কী যেন লিখে তিনি পাঠিয়ে দিলেন আমাদের নলিনী সরকারের কাছে।
নলিনীকান্ত বিজলীর সম্পাদক। চিরকুটখানা দেখে তিনি আমার দিকে তাকালেন তোমার নামই শিবরাম? তুমিই কি আমাদের কাগজে লিখেছিলে?
