না, চলেই যেতে হবে আমাকে এখান থেকে। সহিংসর মত অহিংস পথেও দেশোদ্ধার আমার দ্বারা হল না। কোনো নিয়মনিগড় মেনে চলার ক্ষমতাই নেই আমার। এই শৃঙ্খলাবোধহীনতার জন্যে পরে সুভাষচন্দ্রের কাছেও আমার একবার এই হেনস্তা-এ হেন অবস্থা হয়েছিল। যেমন এখানে তেমনি সেখানেও দোষটা ছিল সম্পূর্ণ আমারই–এই দস্তুর না মানার দোষ। বিশৃঙ্খল আমার কাছে বিশ্রী বলে ঠেকলেও ব্যাপারটার কোথাও কোনো খলতা ছিল না অবশ্যই।
না, বিপিনবিহার, দেখা যাচ্ছে, আমার বরাতে বরদাস্ত হবার নয়। এক বিপিন থেকে আরেক বিপিনের পরিব্রজ্যা শুরু না হতেই খতম হয়ে গেলে দেখতে না দেখতে।
মালদহের বিপিনে সেই পীনোন্নত চরকার খোঁচা খেয়েছিলাম, আর এখানকার ইনি নিজেই পিনের মতন ফুটলেন।
না, চলেই যাব এখান থেকে। এই প্রস্ফুটিত পিনকুসুমের আওতা থেকে। কেবল ওই আদ্য পরীক্ষাটা হওয়া পর্যন্ত থেকে কিংবা আদ্যোপান্ত না দেখেই।
বেরিয়ে পড়লাম তক্ষুনি।
হঠাৎ কী খেয়াল হতে ঘাড় ফিরিয়ে দেখি যে, স্পাই-আইডিয়ার ছেলেটি দূর থেকে নজর রেখে পিছু নিয়েছে আমার।
নিক গে, ইলিসিয়াম রো-র পথে যাচ্ছি না তো, আমার দৌড় ওই ওয়েলিংটন স্কোয়ারের মোড় অব্দি।
কাগজের হকার ছেলেটার দেখা পাওয়া–গেল সেখানে তখন পর্যন্ত কাগজ বেচছে কোণঘেঁষা হয়ে দাঁড়িয়ে। খবর কাগজের সান্ধ্য সংস্করণ বেচছিল সে তখন।
বসুমতী টেলিগ্রাম! বসুমতী টেলিগ্রাম এক পয়সা, এক পয়সা। হাঁকছিল, সে তেড়ে ফুঁড়ে।
ওঃ! কখন থেকে হন্যে হয়ে আছি তোমার জন্যে। এলফিনস্টোনে নটার শোয়ে যাব না আমারা! এর ভেতর কিছু খেয়েটেয়ে তৈরি হতে হবে না? ব্যস্তভাবে বলল সে।
না ভাই, আমি আজ যাচ্ছিনে।
বারে! আমার টিকিট কিনে রেখেছি যে! দিনভোর কাগজ বেচি-নটায় ছাড়া তো যাবার উপায় নেই আমার।
তুমি যাও। একলাই যাও তুমি। আমার টিকিট বাজেয়াপ্ত হয়ে গেছে আজ। আমি জানাই।
তাতে কী হয়েছে! কিনে নেব আবার।
পয়সা কড়ি আর কিচ্ছু নেই আমার! তামাম ফরফীট!
তোমার না থাক, আমার আছে। আমিই না হয় দেখাবো তোমাকে। তুমি কতত দিন যে খাইয়েছো আমায়?
না, থাকগে। আজকে থাক। তুমি আমায় এই কাগজ ফেরির কাজটা পাইয়ে দাও তো আগে। তারপর দেখা যাবে, কতো সিনেমা দেখা যায়, খাওয়া যায় তারপর।
বেশ, কালকেই আমি নিয়ে যাব তোমায় বসুমতী আপিসে আর আনন্দবাজারে। কর্তাদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবো তোমার…
কিন্তু দাম জমা রেখে কাগজ কেনার টাকা তো নেই আর আমার…?
আমি একটু কিন্তু কিন্তু হই।
তাতে কী! বিশ্বাস করে তোমাকে কাগজ দেবেন তাঁরা, বাঙালীর ছেলেরা নিজের পায়ে দাঁড়াক, তারা চান। সে ভরসা দেয়-তবে প্রথম প্রথম হয়ত কম কম দেবেন। তারপর তাঁদের বিশ্বাস অর্জন করতে পারলে, যততা চাইবে, তততা পাবে।
বেশ। কাল ঠিক কাঁটায় কাঁটায় দেড়টায় যাব ইস্কুলে। এখন যাই। একজন নজর রাখছে আমার ওপর। তা জানো?
তারপর পার্কে তিন চক্কর মেরে মাথা ঠান্ডা করে ফর্বেস ম্যানসনে ফিরি–সেই ছেলেটিকেও তিন পাক ঘুড়িয়ে, তার লেজুড় নিজের পিছনে জুড়ে ফিরে আসি।
তার কদিন বাদে সেই আদ্য পরীক্ষাটা। বাধ্য ছেলের মতই বসে গেলাম পরীক্ষায়।
খাতাপত্তর সব বিদ্যায়তন থেকে যুগিয়েছিল। দেশবন্ধুর টাকায় গোড়াতেই একটা ফাউন্টেনপেন কিনেছিলাম বুক পকেটের শোভাবর্ধনে। আর সস্তা দরের একটা হাতঘড়ি কিনতেও কসুর করিনি সেই সঙ্গে।
কাগজের পিঠে লিখে দিলাম খসখসিয়ে তারপর–যা এল মগজে। আর আমার কলমের ঝর্ণায়।
এবং ঘন্টায় ঘন্টায় খেলাম কত কী যে! বিদ্যায়তনেরই কয়েকজন মিলে পরীক্ষার্থীদের টিফিনের জন্য সাময়িক ক্যানটিন খুলেছিল। গরম গরম চপ কাটলেট বেচত তারা-আর ঘোলের সরবত।
সরবত তো নয়, যেন সুধাই! পরম উপাদেয় সুপেয়টি সেই প্রথম আমার জীবনে চাখা।
তবে ঘোল আমাকে অনেকবারই খেতে হয়েছে, নানা রঙের, নানা রকমের। কিন্তু প্রথম পরিচয়ের সেই সুমধুর স্বাদ এখনো ঘোলাটে হয়ে যায়নি আমার স্মরণে।
সরবত শুধু নিজেই খেলাম না, পছন্দসই আমার বন্ধুদেরও খাওয়ালাম ধরে ধরে। দামটা? রেফার বিপিনদা! তাঁর কাছে আমার টাকা জমা রয়েছে। তাঁর কাছ থেকে পাবেন। তাঁর নাম করতেই রেহাই! ঘোলের সঙ্গে চপ কাটলেট আর মাখন-রূটিরও সদগতি করলাম প্রাণভরে খেয়েছি, খাইয়েছি।
শেষ পরীক্ষাটা দেড়টায় খতম হল যেদিন–মাত্র একখানা পেপার ছিল সেদিন। বাংলার বাংলায় তো আমি দিকপাল, দিগ্বিদিক জ্ঞানহীন হয়ে পাশ করেছি চিরদিন, এবারও সেইভাবেই তার পাশ কাটালাম।
আদ্য পরীক্ষাটার আদ্যন্ত সেই ছেলেটার নজর ছিল আমার ওপর–বিপিনদার সহচর সেই ছেলেটির।
শেষ হতে না হতেই এগিয়ে এল সে। এবার তো তোমায় যেতে হচ্ছে এখান থেকে। মনে আছে বিপিনদার কথাটা?
নিশ্চয়! যাব বইকি!
কবে যাচ্ছ? কখন?
এক্ষুনি। চললাম এই। দ্যাখো না! বলেই ফাউন্টেনপেনটা বুক পকেটে খুঁজে হাতঘড়িটা একবার দেখে নিয়েই আমি পা বাড়াই।
কোথায় যাবে শুনি?
যেদিকে দুচোখ যায়। আমি ফোঁস করে উঠি : তোমার কী?
না, আমার কিছু নয়। বিপিনদার কথাটা কেবল মনে করিয়ে দিতে এসেছিলাম আমি।
মনে আছে আমার। সেকথা কি কখনো ভোলবার? আমি জানাই।
যাবার আগে বিপিনদার সঙ্গে দেখা করে যাবে না? দেখা করবে না?
কী জন্যে আবার?
