বললাম, আগেভাগে কাজটা করতে হতো। এখন আর কী করবে!
সে বললো, কিছু না নিয়ে আমি বাড়ি ঢুকতে পারবো না। তবে তুমি আমাকে বাঁচাতে পারো।
আমি অবাক হই। বলি, আমি?
হ্যাঁ। ওই সামনের দোকানে মেয়েদের যে-পোশাক আছে এদেশি, তার তিন সাইজের প্রত্যেকটি পাঁচটি করে কিনবে। একটা সুটকেসও কিনতে হবে। তাতে ওসব ভরে কুয়েত এয়ারলাইনসে লন্ডন থেকে আমার ঠিকানায় পাঠিয়ে দেবে। এয়ারলাইনসকে পয়সা দিতে হবে না–সুটকেস ছাড়াবার সময়ে আমি ভাড়া দিয়ে দেবো। তুমি শুধু জিনিসপত্র কিনে সুটকেসে ফেলবে আর সুটকেস সঙ্গে করে নিয়ে যাবে লন্ডনে। আর সেখানে কুয়েত এয়ারলাইনসের অফিসে পৌঁছে দিয়ে তোমার কাজ শেষ। বলল, আমার এই উপকারটা করবে। নইলে বাড়িতে কুরুক্ষেত্র হয়ে যাবে।
বললাম, করবো।
কুয়েতি এতক্ষণে উঠে বসলো। পোশকের দাম গুনে গুনে দিলো–সুটকেসের দামও ধরে দিলো একটা।
আমি কখনোই বাজার-সওদা করতে পারি না। তারপর এরকম পাইকারি হারে মেয়েদের পোশাক কেনা! ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বউ কটা তোমার? বলেছিল, বউ একটা, কিন্তু শালি আছে, বোন আছে। কোথাও গেলে পনেরো বিশটা কাপড়ের নিচে কিনতে পারি না।
নিজেকে ভাগ্যবান মনে হলো।
বোধহয় সেই রাতেই ঘুমের মধ্যে আমার মাল-পুল হলো। তীব্র যন্ত্রণায় বিছানা থেকে ছিটকে পড়লাম মেঝেতে। গড়াগড়ি দিলাম কার্পেটে। বেশ অনেক পরে ব্যথার উপশম হলো। তারপর প্রায়ই এই কষ্টে পড়েছি। তবে অত যন্ত্রণা কখনো পাইনি। হয়তো প্রথমবার বলে যন্ত্রণার বোধ তীব্র হয়েছিল।
কুয়েতির জিনিসপত্র কিনে সুটকেসে ভরে হোটেলে রেখে গেলাম। টাবাসকো থেকে ফিরে এখানে আসবো। তখন নিয়ে যাবো।
৩০.
বিমানবন্দরে এসে বসে আছি। এক অ্যাডভোকেট আমাদের পথপ্রদর্শক। তাকে যতই জিজ্ঞাসা করি, প্লেন কটায় ছাড়বে, সে খালি বলে, সবাই এসে পড়লেই রওনা হবো; এই এখনই ছাড়বে; প্লেনে ওঠার ডাক এলো বলে। তাকে পইপই করে বলে দিয়েছি কবে আমরা ফিরে আসতে চাই। সে মাথা নাড়ায় আর বলে, নো প্রবলেম। যাত্রার রহস্যটা বোঝা গেল। আমরা কোনো নিয়মিত ফ্লাইটে যাচ্ছি না। তাই বিমানযাত্রার কোনো নির্ধারিত সময় নেই। টাবাসকো বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিশতবর্ষপূর্তি অনুষ্ঠান উদ্ববাধন করবেন মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট। তাঁর বিমানবহরের একটি দয়াপরবশ হয়ে তিনি বরাদ্দ করেছেন আমাদের যাত্রার জন্যে। শুধু আমরা কজন বিদেশি নই, মেক্সিকোর অনেক বিদ্বজ্জন, সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, বিশিষ্ট নাগরিক আমাদের সঙ্গে যাচ্ছেন। সবাই এসে পৌঁছোলে বিমান ছাড়বে। যিনি বেশি গুরুত্বপূর্ণ মানুষ, তিনি তত দেরিতে বিমানবন্দরে আসছেন। সবাই এসে গেলে আমরা যাত্রা করলাম।
টাবাসকোতে একটি পাঁচতারা হোটেলে আমাদের থাকার ব্যবস্থা। হোটেল কক্ষে পৌঁছোবার পরপরই টেলিফোন বাজল। ফোন তুলতেই একটি নারীকণ্ঠ চমৎকার ইংরেজিতে সঙ্গদানের প্রস্তাব করলো। দুপুরে খেতে বসে আমাদের জাপানি বন্ধু তাকেশি হায়াশি চোখ পাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ফোন পেয়েছিলে কোনো?
সম্মতিসূচক উত্তর দিলাম।
সে কেবল বললো, হোটেলের রিসেপশনের সঙ্গে নিশ্চয় ওদের যোগ আছে। এটা ভাবতে পারিনি।
পরদিন টাবাসকো বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে বেশ আগে যেতে হলো। আমরা যাওয়ার পরে একটা মহড়া হলো–সমাবর্তন-অনুষ্ঠানের মহড়া যেমন হয়। তারপর বসে থাকা। তারপর প্রেসিডেন্টের আগমন। অনুষ্ঠান খুব দীর্ঘ নয়। কিন্তু সুচারু। তারপর চা-পান। সেই রাতে টাবাসকো প্রদেশের গভর্নরের নৈশভোজ। সন্ধ্যা হতে না হতেই কয়েকজন লোক কিছু গাউন আর হাওয়াই শার্ট নিয়ে হোটেলে এসে হাজির। কী ব্যাপার! মাননীয় গভর্নর এসব। পোশাক পাঠিয়েছেন নিমন্ত্রিতদের জন্যে–তাঁরা এই পোশাকে সজ্জিত হয়ে গভর্নরের প্রাসাদে নৈশভোজে যাবেন, এই তার বিনীত অনুরোধ। তিন সাইজের গাউন, তিন সাইজের হাওয়াই শার্ট–যার যেটা লাগে। মেয়েদের পোশাক যেমন সব একরকম নকশা ও ছটকাটের, পুরুষদের পোশাকও তেমনি অভিন্ন। হাওয়াই শার্ট আনারসের খোসা থেকে তৈরি তন্তু দিয়ে বানানো–ফিলিপিনসে খুব দেখা যায়।
পুরো ব্যাপারটা বুঝতে, পোশাক বাছাই করতে, কারো কারো পক্ষে বাছাই করা পোশক বদল করতে, সময় নিলো। সরকারি গাড়ির বহর এসেছে–অতিথিদের যেন ঠাসাটাসি করে যেতে না নয়। কিন্তু কর্মকর্তাদের খবরদারি আর একসঙ্গে যাওয়ার চেষ্টায় আমাদের প্রাণান্তকর অবস্থা। সরকারি গাড়িতে যাচ্ছি বলে নিরাপত্তা বাহিনীর উৎপাত তেমন নেই। তবে মেক্সিকোতে এরা নিরাপত্তা সম্পর্কে বেশ সচেতন। বলে, যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তে মেক্সিকো থেকে মাদকদ্রব্য চালান হয়, বিনিময়ে আসে আগ্নেয়াস্ত্র। সারা দেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে আর কিছুর দরকার নেই।
গভর্নরের প্রাসাদে আনুষ্ঠানিক ভাব-বিনিময়, উস্কৃষ্ট পানভোজন, চমৎকার সংগীত। বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিশতবর্ষ আর কোথাও এমন জাতীয়ভাবে পালিত হয় কি না কে জানে!
টাবাসকো ঐতিহাসিকভাবে যেমন প্রাচীন, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ। নবীন প্রবীণের চমৎকার সমাবেশ। আমরা আজ নগরীর উদ্যানে যাই তো কাল পুরাকীর্তি দেখতে যাই। যেদিন মেক্সিকো নগরীতে ফেরার কথা, সেদিনও বেড়াবার কর্মসূচি। হায়াশি যাবে না। বলে, বেড়াতে গেলে প্লেন ধরতে পারবে না। এদের যা সময়জ্ঞান!
