আমাদের অ্যাডভোকেট বলে, চলো চলো। নো প্রবলেম।
আমি যেতে সাব্যস্ত করি। দুই বাস ভর্তি হয়ে যাই। প্রতি বাসে সাত-আটজন তরুণ-তরুণী দোভাষী ও পথপ্রদর্শক। তারা খুবই মিশুক, বন্ধুসুলভ।
ফিরতি পথে দোভাষীদের প্রস্তাবে ছবি তোলার ধুম পড়ে গেল। সদলে, দু তিনজনে, কোনো একজনের সঙ্গে। যে-অল্পবয়সী মেয়েটি আমার দোভাষী ছিল, সে এগিয়ে এসে হঠাৎ আমার গালে গাল লাগিয়ে ছবি তোলার জন্যে দাঁড়িয়ে গেল। এক তরুণ জিজ্ঞেসা করলো, ছবির কপি চাই নাকি আমার। বললাম, চাই তো বটে, কিন্তু আমি তো আজ রাতেই টাবাসকো ছেড়ে যাচ্ছি। সে বললো, তুমি খরচ দিয়ে গেলে তোমার ঠিকানায় পাঠিয়ে দিতে পারি। দিলাম কিছু। আরেকজন বললো, ছবি প্রিন্ট করার জন্য কিছু দেবে না ওকে? দিলাম। অন্য কেউ কেউও, দেখি, দিচ্ছেন। ওসব ছবি আমি কোনোকালে পাইনি। মনে হয় না, আর-কেউ কখনো পেয়েছেন।
ফিরে আসতে আসতে সন্ধ্যা হয়। হোটেলে খোঁজ করে জানতে পাই, হায়াশি বিমানবন্দরে চলে গেছে। মালপত্র গোছানোই ছিল। সেসব নিয়ে দ্রুত গাড়িতে উঠে বিমানবন্দরে পৌঁছানো গেল।
দেখি, হায়াশি ফুঁসছে। অ্যাডভোকেটকে লক্ষ্য করে বলছে, ইউ আর স্টুপিড।
কী হয়েছে? অ্যাডভোকেট এত বলা সত্ত্বেও সে আমাদের ফেরার আসন সংরক্ষণ করতে ভুলে গেছে। কোনো ফ্লাইটেই এখন জায়গা নেই। আমরা সাতজন আটকে গেছি।
অ্যাডভোকেটের বিকার নেই। বলে, ‘নো প্রবলেম।
একটু পরে বাসে করে হোটেলে ফিরে আসি। রুম ছেড়ে দিয়ে গেছি। নতুন করে রুমও দিচ্ছে না। হোটেলের লোক আমাদের লাউঞ্জে অপেক্ষা করতে বলছে আর ইচ্ছেমতো খেয়ে নিতে বলছে। অ্যাডভোকেট একের পর এক ফোন করে যাচ্ছে–কাকে কে জানে!
অনেকক্ষণ পরে সে বললো, চলো।
কোথায়?
এয়ারপোর্ট, এয়ারপোর্ট।
বিমানবন্দরে এলাম। আমাদের সাতজনের জন্যে একটা একজিকিউটিভ প্লেন চার্টার করা হয়েছে। মেক্সিকো সিটি থেকে সেটা এসে পৌঁছোলেই আমরা ফিরতি যাত্রা করতে পারব। অ্যাডভোকেট বলছে, ‘নো প্রবলেম।
হায়াশির রাগ তাতেও কমছে না।
জীবনে ওই একবারই একজিকিউটিভ প্লেন চড়লাম। আসনগুলো চমৎকার। গোল টেবিল জুড়ে কনফারেন্সের জায়গা। সেখানে বসে খাওয়া-দাওয়াও চলে। দুজন মাত্র ক্রু। আমাদের জন্যে তাই যথেষ্ট। তারা সর্বক্ষণ খাওয়াতে চায়।
গভীর রাতে মেক্সিকো নগরীতে ফেরা। সেখান থেকে হোটেলে। রাতে আর ঘুমোবার অবকাশ হলো না। ভালো করে সকাল হওয়ার আগেই আবার বিমানবন্দরে রওনা হয়ে গেলাম। লন্ডনের প্লেন ধরতে হবে।
এবারে কুয়েতির সুটকেস আমার সঙ্গে।
৩১.
মেক্সিকো থেকে ফিরে আমার প্রথম কাজ হলো কুয়েতি অধ্যাপকের সুটকেস। নিয়ে কুয়েত এয়ারলাইনসে যাওয়া। সেখানকার লোকজন জানিয়ে দিলো, সুটকেস পাঠাতে হলে পুরো ভাড়া চুকিয়ে পাঠাতে হবে-মাশুল দিয়ে মাল ছাড়িয়ে নেওয়ার কোনো ব্যবস্থা তাদের নেই। অগত্যা পঞ্চাশ পাউন্ড পকেট থেকে দিয়ে সুটকেস পাঠালাম। পথে-পাওয়া বন্ধুকে সেটা জানিয়ে চিঠিও দিলাম। আশায় আশায় থাকলাম, ধন্যবাদসহকারে একটা ব্যাংক ড্রাফট আসবে। ড্রাফট দূরের কথা–প্রাপ্তিস্বীকারই এলো না।
তবে লন্ডনে ফিরে এটাই যে প্রথম কাজ ছিল, তা বলা ঠিক হলো না। প্রথম কাজ ছিল নতুন ঠিকানা খোঁজা। হিথরো এয়ারপোর্ট থেকে ফোন করেছিলাম ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরির প্রতিভা বিশ্বাসকে। তিনি একসময়ে বলেছিলেন যে, প্রয়োজনে আমার থাকবার ব্যবস্থা করে দেবেন। এখন আমার। ফোন পেয়ে বললেন, খোঁজ নিয়ে জানাবেন। মিনিট ১৫ পরে আবার ফোন করলাম। বললেন, মর্ডেনের দিকে একটা জায়গা আছে। তাঁর কাছ থেকে নম্বর নিয়ে গৃহকত্রী ছায়া বসাককে ফোন করলাম। তিনি জানালেন, একটি ঘর খালি আছে এবং সেটা আমাকে দিতে পারবেন। আমি কবে থেকে নিতে ইচ্ছুক–তাঁর এই প্রশ্নের জবাবে যখন বললাম, এখনই আসতে চাই, তিনি একটু অবাক হলেন, তবে আপত্তি করলেন না। বললেন, মর্ডেন আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে তাকে যেন আবার ফোন করি। এই মর্ডেনের দু স্টেশন উত্তরে কলিয়ার্স উড–১৯৭৪-৭৫ সালে সেটিই ছিল আমার বাসস্থানের নিকটতম টিউব স্টেশন। মর্ডেন থেকে গৃহকত্রীকে ফোন করে দিকনির্দেশনা চাইলাম–সেটাও বাহুল্য, কেননা স্থানীয় মানচিত্র তো আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনেই থাকে। ছায়া বিশ্বাস বললেন, আপনি একটু অপেক্ষা করুন, আমি আসছি। আমার আপত্তিতে কাজ হলো না। তিনি গাড়ি চালিয়ে এলেন এবং মালপত্রসমেত আমাকে বাড়ি নিয়ে গেলেন।
বাড়িটা স্যান্ডবোর্ন অ্যাভিনিউতে–স্টেশন থেকে হাঁটা-পথ। সুন্দর বাড়ি, গৃহকত্রীর যত্নে তা ছিমছাম। ভদ্রমহিলার স্বামী অতুল বিশ্বাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য বিভাগের ছাত্র ছিলেন, পরে পেশাগত পড়াশোনা করেছেন লন্ডনে, এখন লিবিয়াতে কর্মরত। পরিবারের সবাই–মানে স্বামীস্ত্রী ও পুত্রকন্যা–সেখানেই ছিলেন, ছায়া বিশ্বাস সম্প্রতি সন্তানদের নিয়ে চলে। এসেছেন লন্ডনে। তিনি ব্রিটিশ সরকারের চাকরি করেন, ওভালের দিকে তার অফিস। জলি হাইস্কুলে পড়ছে, ছেলেটিও সবে স্কুলে যেতে শুরু করেছে। বাড়ির একতলায় ড্রয়িং রুম, ডাইনিং রুম–সেটা লিভিং রুমও বটে–এবং রান্নাঘর। দোতলায় তিনটি বেডরুম ও বাথরুম। দুটি বেডরুমে ওঁরা তিনজন থাকেন, তৃতীয়টি আমি অধিকার করলাম। পরে জানা গিয়েছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবাদে অতুল বিশ্বাস আমাকে চেনেন এবং লিবিয়ায় তাঁদের অন্তরঙ্গ এক পরিবার ঢাকায় আমার পূর্বপরিচিত।
