আমাদের সভাস্থল মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয়ে। সম্মেলন চলল ধীরগতিতে। কোনো অধিবেশনই সময়মতো আরম্ভ হয় না। কারো তেমন তাড়াহুড়ো নেই, দেরির জন্যে আফসোসও নেই। মেক্সিকো নগরীর সংবাদপত্রের সম্পাদক পরিষদ থেকে কয়েকজন এসে পরদিন তাঁদের সঙ্গে চা-পানের আমন্ত্রণ করে গেলেন। পরদিন নির্দিষ্ট সময়ে যখন উদ্যোক্তাদের জিজ্ঞেস করলাম, আমরা। কখন রওনা হবো, তাঁরা অলসকণ্ঠে জানতে চাইলেন, আমি কি সেখানে যেতে খুবই আগ্রহী? বললাম, ওঁরা তো আপনাদের সামনেই কাল আমন্ত্রণ করে গেলেন এবং, মনে হলো, আপনারা সে-আমন্ত্রণ গ্রহণও করলেন, এখন না গেলে কেমন হবে? আপনারা কি জানিয়ে দিয়েছেন যে, আমরা যেতে অপারগ? তাঁরা বললেন, হ্যাঁ, ওরা ভদ্রতা করে নিমন্ত্রণ করলো, আমরা ভদ্রতা করে প্রত্যাখ্যান করলাম না। এখন যাওয়া না-যাওয়া আমাদের ওপরে। আমরা না গেলে ওরা বুঝতে পারবে যে, আমরা অপারগ। তবে তুমি যদি যেতে চাও, আমরা তার ব্যবস্থা করে দিতে পারি। আমি বললাম, ওঁদের কাউকে তো আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না, ওঁদের আমন্ত্রণ আপনাদের সময়-সূচির অন্তর্ভুক্ত না হলে যাবোই বা কেন? তারা বললেন, তুমি দেখছি খুব সিরিয়াস মানুষ। এসব ব্যাপারে এমন হয়েই থাকে।
মেক্সিকোতে একটি ইনস্টিটিউট অফ ফাইন আর্টস আছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশাল ভবনে তার অধিষ্ঠান। চমৎকার মিলনায়তন, সুন্দর গ্যালারি, পরিচালকের দপ্তরও মনোরম। সেখানে আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো। পরিচালক পরদিন সন্ধ্যায় তার বাড়িতে আমন্ত্রণ জানালেন। আমাদের বলা হলো, রাত আটটা নাগাদ আমরা যেন হোটেলের লবিতে অপেক্ষা করি। বাস এসে আমাদের যথাস্থানে নিয়ে যাবে। আটটা থেকে আমরা অপেক্ষমাণ, নটা বেজে গেল–বাসের দেখা নেই। কর্তৃপক্ষীয় একজনকে পাওয়া গেল–তাঁর কাছে জানতে চাইলাম আমরা কখন রওনা হবো? তিনি বেশ বিস্মিত হয়ে বললেন, বাস এলেই রওনা হবো। জিজ্ঞাসা করলাম, বাস কখন আসবে? তিনি আরো অবাক হয়ে বললেন, যে-কোনো সময়ে এসে যাবে। বাস এলো, আমরা রওনা হলাম। টের পেলাম, পরিচালক থাকেন শহরের উপকণ্ঠে। ফলে, রাত দশটার পরে তাঁর বাড়িতে গিয়ে পৌঁছোলাম। বিলম্বের জন্যে কেউ ক্ষমা চাইলেন না, গৃহকর্তাও তার কারণ জানতে চাইলেন না। পানীয় হাতে আমরা তার প্রাসাদোপম অট্টালিকা, তার চিত্রসংগ্রহ, আসবাবপত্র, গৃহসজ্জা, এমনকী বাগান ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকলাম এবং সুসজ্জিত নরনারীর সঙ্গে আলাপ করতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু অতিথিদের অনেকেই ইংরেজি জানেন না বলে আলাপ খুব জমলো না। খিদে পেতে লাগলো, কিন্তু তখনো তরল থেকে শক্তে আসার সময় হয়নি। রাত এগারোটার পরে খাবার দেওয়া হলো। প্রচুর আয়োজন। কেউ যে বেশি খেলেন, তা নয়, কিন্তু ভোজনপর্ব চললো অনেকক্ষণ ধরে। রাত বারোটার পরে আমরা বাসে উঠলাম ফেরার জন্যে। যখন গেট দিয়ে বের হচ্ছি, তখন দেখি, দুই গাড়িভর্তি অতিথি সবে আসছেন নৈশভোজে যোগ দিতে।
মেক্সিকো নগরীতে অফিসের সময় কী, তা জানতে চেয়েও আমি প্রায় একই অবস্থায় পড়েছিলাম। উত্তর পেয়েছিলাম, কে কখন অফিসে যায়, তার ওপর নির্ভর করে সে কতক্ষণ সেখানে থাকবে। জানতে চাইলাম, লোকজন কারো। সঙ্গে দেখা করতে চাইলে কখন যায়? বললো, ফোনে সময় ঠিক করে যায়। একটা কোর-টাইম আছে বটে, কিন্তু সবাই দিনে আট ঘণ্টা অন্তত থাকে অফিসে, তার মধ্যে দর্শনার্থীরা হাজির হয়ে যায়।
হোটেল থেকে ছেলেমেয়েদের একটা পিকচার-পোস্টকার্ড পাঠালাম। পরদিন আরেকটা পাঠালাম ডাকঘর থেকে। মাশুল একরকম নয়। তৃতীয় পোস্টকার্ড ওই ডাকঘর থেকেই পাঠালাম–এবার মাশুল আরেকরকম। বুঝলাম, যার যেমন মনে হয়, সে তেমনি মাশুল সংগ্রহ করছে। নিশ্চয় কোথাও হার লেখা আছে, কিন্তু তা দেখার কষ্ট কেউ করছে না।
আনোয়ার আবদেল-মালেককে অজস্র ধন্যবাদ যে, সেমিনারে আমাকে কোনো দায়িত্বপালন করতে হয়নি। আমি শ্রোতা। বেশির ভাগ প্রবন্ধ স্প্যানিশে, দু-একটি পর্তুগিজে, এক-আধটি ফরাসিতে, কয়েকটি ইংরেজিতে। সব প্রবন্ধ তাৎক্ষণিক অনুবাদের ব্যবস্থা আছে, তবে অনুবাদের মান সব একরকম নয়। ফলে কিছু কিছু লেখার মর্মগ্রহণ বেশ কঠিন হয়েছিল আমার পক্ষে। তাছাড়া, ল্যাটিন আমেরিকা সম্পর্কে আমার পর্বতপ্রমাণ অজ্ঞতা অনেক কিছু বোঝার পক্ষে বাধাস্বরূপ হয়েছিল। তাই অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানো সংগত নয়।
আয়োজকরা খুবই বন্ধুবৎসল। তারা আমাদের স্বাচ্ছন্দ্যবিধানে ত্রুটি করেননি। নিজেদের মতো চলাফেরার সময়ও দিয়েছিলেন। তারা আরো একটি কাজ করেছিলেন। মেক্সিকো যাওয়ার আগেই আমাদের কাছ থেকে জেনে নিয়েছিলেন, আমরা কে কে টাবাসকো বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিশতবর্ষপূর্তি-অনুষ্ঠানে যেতে আগ্রহী। মেক্সিকো নগরীর সেমিনারশেষে সেখানে যেতে হবে। টাবাসকো বলতে এতদিন কেবল চিলি-সস জানতাম। সেখানে যে দু শ বছরের পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয় আছে, তা কখনো শুনিনি। এই সুযোগ ছাড়তে চাইলাম না।
মেক্সিকোর কাজ শেষ, টাবাসকো যাবো। তার ঠিক আগে, সেমিনারে যোগদানকারী কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এক সহযোগী অধ্যাপক একদিন আমার ঘরে ঢুকে সোজা বিছানায় শুয়ে পড়ল। মলিন মুখ, তাতে দুশ্চিন্তার বলিরেখা। জানতে চাই, কী হয়েছে। সে বলে, সর্বনাশ হয়েছে। বাড়ির জন্যে কিছু কেনার আগেই দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। আমি কাল ফিরে যাচ্ছি। দোকান পরশু খুলবে।
