লন্ডনে আমাদের হাই কমিশনে যাই। ডেপুটি হাই কমিশনার মহসিনকে খুলে। বলি আমার অবস্থা। তার পরামর্শে তাঁর অফিস থেকে আনোয়ার আবদেল মালেককে ফোন করি প্যারিসে–তিনি আগাম চলে গেছেন মেক্সিকোয়। তার সেক্রেটারি আমাকে কোনো সাহায্য করতে পারবেন বলে মনে হয় না। মহসিন ভেবেচিন্তে বলেন, তিনি একটা ডিও লিখবেন মেক্সিকোর রাষ্ট্রদূতকে–তাতে কাজ হবে কি না বলা যাচ্ছে না।
মহসিনের চিঠি নিয়ে আবার যাই মেক্সিকান দূতাবাসে। তারা বিরক্ত হয়। বলে, বাংলাদেশের পাসপোর্টধারীকে কী করে ভিসা দেওয়া সম্ভব? তাদের দপ্তরের এক মহিলাকে জিজ্ঞাসা করি, আমি কি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দেখা করতে পারি? তিনি একটু ভেবে বলেন, জেনে আসি তিনি দেখা করবেন কি না। তবে তিনিই আপনার শেষ আদালত।
রাষ্ট্রদূত দেখা করতে সম্মত হন। মহসিনের চিঠিটা পড়েন। আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, তুমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক? তাহলে তো তোমার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করতে হয়। তিনি ফোনে কাউকে কিছু বলেন স্প্যানিশে। তারপর আমাকে বলেন, তোমাকে নিচে খানিকক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে-ভিসা দিতে যতক্ষণ লাগে। আমি অবাক হয়ে যাই এত অল্প সময়ে সমস্যার সমাধান হয়ে যাওয়ায়। তাকে ধন্যবাদ দিয়ে কূল পাই না। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে করমর্দন করেন, নিজে দরজা খুলে দেন।
নিচে নেমে অপেক্ষা করি। সামনে লোকজন কাজ করছে। ভেতর থেকে এক তরুণী এসে কারো সঙ্গে কথা বললো। আমার দিকে একটু তাকালো। তারপর চলে গেল।
অত সুন্দরী আমি এর আগে দেখিনি। পরেও যে খুব দেখেছি, তা নয়। জামার ওপর থেকে সে যেভাবে নিজের স্তনযুগল স্পর্শ করলো, তাতে মনে হলো, নিজের সৌন্দর্য সম্পর্কে সে সচেতন।
একটু পরে একটি অল্পবয়সী ছেলে আমার পাসপোর্ট নিয়ে এলো। মাথা ঈষৎ ঝুঁকিয়ে বললো, রাষ্ট্রদূতের সৌজন্যসহ।
কেএলএম থেকে টিকিট পেতে কোনো ঝামেলা হলো না।
জ্যান এবং মেরি ও তার বোনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চললাম। ২১ এপ্রিলে লন্ডন থেকে আমস্টারডাম। সেখান থেকে মেক্সিকো সিটিতে পৌঁছোবো পরদিন।
লন্ডন থেকে আমস্টারডাম অল্পক্ষণের যাত্রা। সেখানে পৌঁছে মেক্সিকোগামী ফ্লাইট ধরতে গিয়ে জানা গেল, যাত্রা বিলম্বিত হবে–বিমান খারাপ হয়ে গেছে, সেটা সারানো হচ্ছে।
বিমানবন্দরে অপেক্ষা। এয়ারলাইনসের সৌজন্যে লাঞ্চ খাওয়া। তারপর ঘোষণা, ইচ্ছে করলে এই ফ্লাইটের যাত্রীরা নিজের খরচে শহর ঘুরে আসতে পারে।
এই অবস্থায় বিমানবন্দরে কে বসে থাকতে চায়? পাসপোর্ট রেখে একটা কাগজ নিয়ে বাসে করে শহরের মধ্যস্থলে পৌঁছোলাম। মনোরম দৃশ্য চারদিকে। কিন্তু আসতে যত সময় নিলো, তাতে বেশিক্ষণ ঘোরাঘুরির সম্ভাবনা তিরোহিত হয়ে গেল। অল্প খানিকক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে ফেরার বাস ধরার চেষ্টা করলাম। বাস পেতে সময় লাগলো। বিমানবন্দরে বাস থেকে নেমে খোঁজ নিয়ে বুঝলাম, ভুল টার্মিনালে এসেছি। এখান থেকে হেঁটেই যেতে হবে জায়গামতো। ফেরার সময় চলে যাচ্ছে। দৌড়োতে দৌড়োতে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছোলাম। কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। বিমান কি আমাকে। রেখে চলে গেল? তারপর জানলাম, যেতে আরো বিলম্ব হবে–যাত্রীরা সব ডিনার খেতে গেছে।
ডিনার খেতে গিয়ে গলায় খাবার আটকে যায়। শ্বাসরোধ হবার অবস্থা। আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ে গলা চেপে ধরে খাবার বের করি। আশেপাশের টেবিল থেকে দু-একজন তাকিয়ে দেখে। সাহায্য করবে-করবে ভাব করে। তার আগে আমি আবার চেয়ারে বসে পড়ি। হাঁফ ছাড়ি, পানি খাই।
অনেক রাতে বিমান ছাড়ে। মাঝে জ্বালানি নেওয়ার জন্য হিউসটনে বিরতি। তবে বিমান থেকে নামা যায় না। মেক্সিকো সিটিতে পৌঁছোতে খুব বিলম্ব হয়। সেখানে প্রায় ভোর। মালপত্র নিয়ে বাইরে এসে আমার জন্যে অপেক্ষমাণ কাউকে পাই না। কী করবো, কোথায় যাবো? ভাবলাম, কোনো মেসেজ আছে নাকি দেখে আসি। আছে। একটা হোটেলের নামঠিকানা দিয়ে সেখানে সটান চলে যেতে বলা হয়েছে। তাই করলাম। হোটেলকক্ষের বিছানায় ক্লান্ত শরীর ছেড়ে দিয়ে মনে হলো, বাঁচা গেল।
২৯.
মেক্সিকোর সভ্যতা অনেক পুরোনো। অন্তত দশ-বারো হাজার বছর আগে সেখানে যে মানববসতি শুরু হয়েছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মেক্সিকোয় বসতিস্থাপনকারীদের মধ্যে যে অনেক এশীয় ছিল, সে-সম্পর্কেও ইতিহাসবিদেরা একমত। মায়া-সভ্যতা ও অ্যাজটেক-সভ্যতার বিকাশ এ অঞ্চলকে সমৃদ্ধ করেছিল।
সেমিনারের উদ্যযাক্তারা সেই প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন দেখাবার ব্যবস্থা দেখলাম। ওই মুহূর্তে তাদের কাজের বেশি নমুনার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়নি। কিন্তু মেক্সিকো নগরীর অনতিদূরে অ্যাজটেকদের কীর্তি দেখে মন ভরে গেল। টেনচটিটুলান দেখলাম, দেখলাম সূর্য ও চন্দ্রের মন্দির। তখনো মিশরে যাইনি। সুতরাং অ্যাজটেকদের পিরামিডই আমার প্রথম দেখা পিরামিড। সে এক আশ্চর্য ব্যাপার! স্প্যানিশ বিজয়ীরা তাদের স্থাপত্য-ভাস্কর্য কিছু কিছু নষ্ট করেছিল বটে, কিন্তু যা টিকে রয়েছে, তার বিশালতা ও সৌন্দর্য মনকে। গভীরভাবে আপ্লুত করে। মানুষের কল্পনাশক্তি ও উদ্ভাবননৈপুণ্য এবং সেই সঙ্গে কর্মযজ্ঞ ও শ্রমনিয়োগের বিপুলতার যে-পরিচয় এখানকার ইট-পাথরে এখনো ধরা রয়েছে, তা ক্রমাগত বিস্ময় জাগায়। মেক্সিকোর ইতিহাসে অ্যাজটেকদের কাল একাদশ থেকে যোড়শ শতাব্দী। তারপর স্পেনীয়রা এ-ভূখণ্ড জয় করে নেয়। মিগুয়েলা নামে যে-মহিলা আমাদের প্রদর্শক ছিলেন, তার কথাবার্তায় অ্যাজটেকদের পুরাকীর্তির প্রতি ভালোবাসা এবং সে-সম্পর্কে গর্ববোধ যেমন প্রকাশ পাচ্ছিল, তেমনি স্পেনীয় বিজয়ীদের অসভ্যতা ও নির্মমতা সম্পর্কেও লজ্জাবোধ ও বিতৃষ্ণা লুকোনো থাকছিল না।
