ঢাকা কুঠির বেশির ভাগ কাগজপত্র ছিল সেখানকার কমার্শিয়াল রেসিডেন্ট জজ টেলরের আমলের। যে-কোনো কারণেই হোক, তিনি এসব নিয়ে দেশে ফিরে আসছিলেন। পথে জাহাজে তাঁর মৃত্যু হলে এসব কাগজ ইন্ডিয়া অফিসে চলে আসে। ২৪ পরগনার রাজস্বসংক্রান্ত কাগজপত্র কলকাতার বোর্ড অফ রেভিনিউ থেকে হেইলিবারি কলেজে পাঠানো হয়েছিল–সম্ভবত সেখানকার ছাত্রদের ব্যবহারের জন্যে। জঙ্গীপুর কুঠির কাগজও বোধহয় কোনো বিশেষ কারণে লন্ডনে পাঠানো হয়েছিল। বোগল ও হজসন নিজেদের সংগ্রহ দিয়ে গিয়েছিলেন ইন্ডিয়া অফিসে–এগুলো ইউরোপীয় পাণ্ডুলিপির অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইউরোপীয় পাণ্ডুলিপির সহকারী কিপার আর জে বিঙ্গল এগুলোর প্রতি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
এবারে দেখতে পেলাম কিছু কাগজপত্রের সঙ্গে ইংরেজিভাষায় পেনসিলে লেখা কিছু টোকা রয়েছে। খোঁজ করতে গিয়ে জানা গেল যে, বেঙ্গলি লিটারেচর (অকসফোর্ড, ১৯৪৮) গ্রন্থের লেখক এবং টমাস অটওয়ের ওয়র্কসের (অকসফোর্ড, ১৯৩২) সম্পাদক ড. জে সি [জ্যোতিষচন্দ্র] ঘোষকে কোনো এক সময়ে এইসব কাগজ তালিকাভুক্ত করতে দেওয়া হয়েছিল। ড. ঘোষ অত্যন্ত পণ্ডিত ব্যক্তি-তবে পুরোনো বাংলা লেখা বোধহয় খুব ভালো পড়তে পারতেন। না। কিছুদিন কাজ করে তিনি আর অগ্রসর হননি।
আমি আগেরবার ১২ খণ্ড চিঠিপত্র তালিকাভুক্ত করেছিলাম। তার তুলনায় এবারে কাজ বেশি। কোমর বেঁধে লেগে গেলাম। মাইকেল ও’কিফকে বললাম, আরো তিন খণ্ড যদি না-ও হয়, অন্তত আরো এক খণ্ড চিঠিপত্র কোথাও থেকে থাকবে–ভালো করে খোঁজ করে দেখো। আমি থাকতে কিছু পাওয়া গেল না–চলে। আসার পরে একটি খণ্ড বের হলো। সেটা পরে তালিকাভুক্ত করেছিলাম।
এবারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাহেদা আহমদ ও শিরিন ওসমানীকে ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে পেলাম। শরীফউদ্দীন আহমদ আছেন এখনো, ইফতিখার উল আউয়াল যোগ দিয়েছেন। শরৎচন্দ্র বসুর পৌত্র–এখন স্বনামধন্য সুগত বসু তখন কেমব্রিজে গবেষণা করছিল পিএইচ ডি পর্যায়ে। সেও খুব নিয়মিত আসততা এই লাইব্রেরিতে। তার সঙ্গে দস্তুরমতো হৃদ্যতা হয়ে গেল।
লাইব্রেরিতে ঢুকে একদিন সৈয়দ আলী আহসানকে পেলাম। রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা হিসেবে তখন তার নিয়োগের অবসান হয়েছে। তিনি যাচ্ছেন আমেরিকায়, বড়ো মেয়ে জিনাতের কাছে। পথে থেমেছেন লন্ডনে। সেই সুযোগে লাইব্রেরিতে কিছু বইপত্র দেখবেন, তবে বেশি সময় নেই তাঁর হাতে। এই লাইব্রেরি ব্যবহারের প্রস্তুতিও নেই তাঁর। আমি তাঁকে কাগজ-পেনসিল দিলাম। দুপুরে খেতে নিয়ে গেলাম কাছের গ্রিক রেস্টুরেন্টে। রেস্টুরেন্টে বসে তিনিই প্রথম মুখ খুললেন : ‘শেখ মুজিব একজন হৃদয়বান মানুষ ছিলেন।’ তারপর আরো নানা কথা হলো। সেদিনের পরে লাইব্রেরিতে আর আসতে পারেননি তিনি।
ডেভিড কফ এসেছেন আমেরিকা থেকে। তাঁকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে গেলাম ইয়ং ভিকের রেস্টুরেন্টে। যার যার ট্রে-তে খাবার তুলে নিয়েছি। দামটা আমি দিলাম। ডেভিড কফ টেবিলে ট্রে রেখে ফিরে গেলেন। দেখি, নিজের জন্য বিয়ার কিনে আনছেন। আমার কোনো পানীয় লাগবে কি না, একবারও জানতে চাননি।
কোয়েটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই বালোচ আবার এসেছেন জার্মানি থেকে। বললেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। চান্সেলর জিয়াউল হককে চিঠি দিয়ে বলেছেন, আপনি জানেন, জুলফিকার আলী ভুট্টোর হাতে আমি নির্যাতিত হয়েছি। কিন্তু ভুট্টোকে ফাঁসিতে লটকে আপনি কলঙ্কভাগী হয়েছেন। আপনি যে-বিশ্ববিদ্যালয়ের চান্সেলর, সে-বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি শিক্ষক হয়ে থাকতে পারি না। বালোচকে জিজ্ঞাসা করি, এর প্রতিক্রিয়া কী হবে? তিনি বলেন, জিয়াউল হক যতদিন ক্ষমতায় থাকবে, আমি দেশে ফিরতে পারব না। জানতে চাই, তার পরিবারের কী হবে? বালোচ পিঠ খাড়া করে উত্তর দেন, আমার উপজাতি আছে না?
খান আবদুল ওয়ালী খান কদিন কাজ করলেন লাইব্রেরিতে। যেচে গিয়ে আলাপ করলাম। পাকিস্তানের অবস্থা ভালো নয়, এটুকু বললেন তিনি। যোগ করলেন, তাঁর নিজেরও নিরাপত্তা নেই।
তাঁর সঙ্গে ওঠাবসা করতে চান না বালোচ। বলেন, এই হলো পাকিস্তান। দেশের দুঃসময়ে রাজনৈতিক নেতা নিরাপদে থাকতে চলে এসেছেন লন্ডনে, বই লেখার মালমশলা সংগ্রহ করছেন। নেতা না থাকলে দেশে আন্দোলন করবে কে? সাধারণ মানুষকে চালাবে কারা? এই করেই তো জিয়াউল হকের মতো সামরিক একনায়কেরা নিষ্কণ্টক হয়। আমার দেশের কোনো ভবিষ্যৎ নেই।
২৮.
বেবী জরুরি বার্তা পাঠিয়েছে চট্টগ্রাম থেকে। এপ্রিলের শেষে মেক্সিকো সিটিতে জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনার হবে। আনোয়ার আবদেল-মালেক চিঠি পাঠিয়েছেন, ঢাকার কেএলএম অফিস থেকে টিকিট সংগ্রহ করতে বলেছেন। বেবী তাঁকে জানিয়েছে যে, আমি আছি লন্ডনে। কেএলএমকেও জানানো হয়েছে সেকথা। সব কাগজপত্র সে পাঠিয়ে দিয়েছে জ্যানের ঠিকানায়।
লন্ডনে কেএলএম অফিসে যোগাযোগ করলাম। হ্যাঁ, সব ঠিক আছে, এখান থেকে টিকিট দিতে কোনো অসুবিধে নেই, কিন্তু তার আগে আমাকে মেক্সিকোর ভিসা নিতে হবে।
মেক্সিকোর দূতাবাসে গেলাম। বাংলাদেশের সঙ্গে তখনো মেক্সিকোর কূটনৈতিক সম্পর্ক হয়নি, অতএব আমাকে ভিসা দেওয়া যাবে না।
