কিংস ক্রস স্টেশনের খুব কাছে জাড স্ট্রিটের একটা বাড়িতে জ্যানের বাস। সেখানে একতলা ও দোতলার খানিকটা নিয়ে থাকেন দুই চিরকুমারী–মেরি ও তার বোন। দোতলার খানিকটা ও তেতলা জ্যানের দখলে। জ্যান খুব আনন্দের সঙ্গে আমাকে থাকতে দিলো, তবে অনেকরকম সাবধানবাণী উচ্চারণ করলো। মেরি ও তার বোন দুজনেরই বয়স হয়েছে, একটু খিটখিটে মেজাজের, তার ওপর বর্ণবিদ্বেষী-মোমেন তাদের চক্ষুশূল। শ্বেতাঙ্গিনী জ্যানের কাছে কৃষ্ণাঙ্গদের আসা-যাওয়া তাঁরা পছন্দ করেন না। আমি যেন ঘরে আওয়াজ না করি, রাতে টয়লেট ব্যবহার করলেও যেন ফ্লাশ না করি। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফিরতে না পারলে, নিচে যে-লিখিত নোটিশ আছে, তা যেন টাঙিয়ে দিয়ে যাই। বাড়িতে যেন একসঙ্গে বেশি লোককে আমন্ত্রণ না করি। ফুলের টবগুলোয় কখন কতটা পানি দিতে হবে, জ্যান তা বুঝিয়ে দিলো। টেলিফোনে লোকে যেন তাকে বিরক্ত না করতে পারে, তার একটা ব্যবস্থা সে করেছিল। সেটাও বুঝে নিলাম। জ্যান হংকং রওনা হওয়ার আগেই তার বাড়িতে আস্তানা গেড়ে ফেললাম।
জ্যানের বাড়িতে মাসাধিককাল আমি খুব স্বচ্ছন্দে ছিলাম, কিছু অভিজ্ঞতাও সঞ্চয় করেছিলাম। ওর বাড়ির সামনের রাস্তায় একটা লড্রেটে কাপড় ধুতে যেতাম। সেখানে মহিলাদের ভিড়, ক্কচিৎ কখনো পুরুষের দেখা পাওয়া যেতো। আমাকে দেখে মহিলারা পরস্পর যেসব সংলাপ বিনিময় করতেন, তা এরকম : লন্ডনের আসল বাসিন্দারা কোথায় গেল? শহরটা সব বিদেশিতে ভরে গেল, তাই না? এই পরদেশিরা কী যে করে এদেশে! আমাদের বাড়িঘর দোকানপাট আস্তে আস্তে সব বেদখল হয়ে যাচ্ছে।আমি শুনে না-শোনার ভান করি, বুঝে না বোঝার ভাব করি।
বাড়িতে আমি জ্যানের নির্দেশমতো চলি। খুব কমই কাউকে আসতে বলি। আমার ভাগ্নি শিরিণ কয়েক বছর লিবিয়ায় কাটিয়ে দেশে ফেরার পথে লন্ডনে এলো। সঙ্গে তার স্বামী ডা. আনওয়ার-উল-আজিম এবং শিশুকন্যা শাওন। তাদের আসতে বলেছিলাম একদিন। আরো কেউ কেউ অল্পক্ষণের জন্যে এসেছে–মূলত আমাকে নিতে। আমার মনে হয়েছে, ডোরবেল শুনলে মেরি অথবা তার বোন পর্যবেক্ষণ করতেন–কে আসছে। কিন্তু কখনো তা নিয়ে আমাকে কিছু বলেননি, কোনো মন্তব্যও আমার কানে আসেনি। বরঞ্চ বুলু একদিন সামনে পড়ে যাওয়ায় মেরি বেশ সৌজন্যপূর্ণ আচরণ করেছিলেন।
আমার সঙ্গে রোজই তাদের কুশলবিনিময় হতো। একদিন সকালে ঘরের ভেতরে চাবি রেখে দরজা বন্ধ করে ফেলেছিলাম বাইরে থেকে। সেদিন সাহায্য চাইতে তাঁদের কাছে যেতে হলো। মেরি আমাকে বসতে বলে নিজেই পুলিশে খবর দিলেন, চাবিওয়ালা ডাকিয়ে দরজা খোলার ব্যবস্থা করে দিলেন, অনুরূপ আরেক ঘটনার গল্প করে বোঝাতে চাইলেন এমন হয়েই থাকে। আমি তাদের কাছে খুব কৃতজ্ঞ বোধ করেছিলাম।
জ্যান ফিরে আসার আগে মেরি একদিন আমাকে ডাকলেন। জানতে চাইলেন, জ্যান চলে এলে আমি কোথায় যাব? বললাম, কোথাও একটা মাথা গোঁজার ঠাই করে নেবো। তিনি বললেন, কেন, জ্যানের বাড়িতে তো জায়গা আছে–তুমি এখানে থেকে গেলেই পারো। জ্যানকে বলে দেখো না কেন? আমি তো অবাক। বললাম, এখানে আমার পক্ষে থাকা সম্ভবপর হলে জ্যান নিজেই আমাকে বলবে, আমি সে কথা বলে ওকে বিরক্ত বা বিব্রত করতে চাই না।
জ্যান ফিরে আসার পরে আমি তাকে কিছু বলিনি, বোধহয় মেরিই বলেছিলেন। জ্যান আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, তুমি কি মন্ত্র করেছ মেরিকে? যে কালো লোক দেখতে পারতো না, সে তোমাকে রাখার জন্যে ব্যস্ত হয়ে গেছে। উত্তরে আমি শুধু হাসলাম।
মানুষ বড়ো জটিল প্রাণী। তাছাড়া, বঙ্কিমচন্দ্র যেমন বলেছিলেন, মনুষ্য বড়ই পরাধীন।
২৭.
ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরি অ্যান্ড রেকর্ডসে যেসব কাগজপত্র আমাকে তালিকাভুক্ত করতে হবে, এখন সবসুদ্ধ তা দাঁড়ালো এরকম : (১) ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঢাকা কুঠির সঙ্গে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও ত্রিপুরায় অবস্থিত তাদের আটটি আড়ঙ্গ অর্থাৎ সুতি বস্ত্র-উৎপাদন কেন্দ্রের (ঢাকা, ধামরাই, সোনারগাঁও, টিটবাদী; জঙ্গলবাড়ি-বাজিতপুর; চাঁদপুর, নারায়ণপুর ও শ্রীপুর) ১৭৯২ ও ১৮০০ সালে লেখা ২৯ খণ্ড দৈনন্দিন চিঠি; (২) ১৭৯১ থেকে ১৮০৯ সালের মধ্যে নানা সময়কার ঢাকা কুঠির বস্ত্র-উৎপাদনের ১৬ খণ্ড হিসাবখাতা; (৩) মুর্শিদাবাদের জঙ্গীপুর কুঠির এবং তার অধীন তিনটি আড়ঙ্গের অর্থাৎ রেশমি বস্ত্র উৎপাদন-কেন্দ্রের ১৭৯১ ও ১৮০৯ সালের ১৭ খণ্ড হিসাবখাতা; (৪) মুর্শিদাবাদের কাসিমবাজার কুঠির রেশমি বস্ত্র ব্যবসাসংক্রান্ত ১৮০০-০১ সালের দুটি হিসাবখাতা; (৫) চাকলা জাহাঙ্গীরনগরের ১৭৭৭-৭৮ সালের (বাংলা ১১৮৪ সনের) রাজস্বসংক্রান্ত একটি হিসাবখাতা, চাকলা মেদিনীপুর ও চাকলা জলাসসারের ১৭৮৩ সালের রাজস্বসংক্রান্ত কিছু কাগজ, নদীয়ার কৃষ্ণনগর-বোলান্দিয়ার ভাড়ার রসিদপত্র; মুর্শিদাবাদের আবগারি মহালের ১৮০৮ সালের একটি হিসাবখাতা ও একই সময়ে হিসাবের কিছু কাগজ; ২৪ পরগনার একটি তালুকের ১৮১০ সালের দুটি রোবকারি ও একটি আমলদারি, ওই জেলার বানিয়াঘাটা ফেরিসংক্রান্ত ১৮১২ সালের কিছু কাগজপত্র, ২৪ পরগনা কালেক্টরির ১৮১০ থেকে ১৮১৩ সালের মধ্যেকার নানা ধরনের পরোয়ানা, দস্তক, শিয়া, তৌজি ও ট্রেজারির মাসিক হিসাব; (৬) ঢাকার কোর্ট অফ অ্যাপিল অ্যান্ড সার্কিটের ১৭৯৫-৯৬ ও ১৮১৪ সালের দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার কাগজপত্র, হুগলির জেলা জজ আদালতের ১৮০৩ ও ১৮১৪ সালের কাগজপত্র-এর মধ্যে বর্ধমানের মহারাজা তেজচন্দ্রের, হাজি মুহম্মদ মহসিনের এবং রামমোহন রায়ের মামলার কাগজ আছে, সদর দেওয়ানি আদালতে রানি ভবানী ও অন্যান্যের ১৮০৬ সালের আপিলের কাগজপত্র, হুগলির ফৌজদারি আদালতের ১৮১৪ সালের কাগজপত্র, যশোর দেওয়ানি আদালতের ১৭৯০ সালের, বর্ধমান। দেওয়ানি আদালতের ১৭৯৭ সালের ও ২৪ পরগনার দেওয়ানি আদালতের ১৭৯৭ সালের হিসাবসংক্রান্ত কাগজপত্র; (৭) জর্জ বোগলের সংগ্রহে ১৭৭৭ থেকে ১৭৭৯ সালের মধ্যেকার নানা ধরনের কাগজপত্র; (৮) ব্রায়ান হজসনের সংগ্রহে তারিখবিহীন একটি শব্দতালিকা–বাংলা, অসমিয়া ও আরো দুটি ভাষায় লেখা, এবং (৯) ১৭৭৯, ১৮১০ ও ১৮১৩ সালের তিনটি বিবিধ কাগজ।
