বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্রসংকলনে সময় লাগে, মুদ্রণেও যথেষ্ট সময় নেয়। এর ১৫ খণ্ড প্রকাশ পেতে পেতে দেশেও নানারকম পরিবর্তন ঘটে যায়।
২৫.
ঐতিহ্য সংরক্ষণ বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার জন্যে সরকার একটি কমিটি গঠন করেছিল। যতদূর মনে পড়ে, উদ্যোগটা নিয়েছিলেন আবুল ফজল। তিনি উপদেষ্টা-পরিষদ থেকে চলে গেলে কীভাবে যেন ওই কমিটির দায়িত্ব এসে পড়ে তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা শামসুল হুদা চৌধুরীর ওপরে। একজন সদস্য হিসেবে এর একটি বা দুটি সভায় যোগ দিয়েছিলাম। একটি সভার কথা বিশেষভাবে মনে পড়ে।
সভাস্থলে পৌঁছোবার পরপরই সভাপতি এসে গেলেন। শামসুল হুদা চৌধুরী মজলিসি লোক। আরো সদস্যের জন্যে অপেক্ষা করতে করতে খোশগল্প জুড়ে দিলেন। আমাকে লক্ষ করে বলতে শুরু করলেন : জাতীয় সংগীত করার জন্যে তোরা আর গান পেলি না! বঙ্গভঙ্গ-আন্দোলনের গান বেছে নিলি–তাও বাউল সুরের, যাতে উদ্দীপনার একান্ত অভাব। ধনধান্যপুষ্পভরা’ হলেও একরকম হতো। হাসতে হাসতে বললাম, আমার সোনার বাংলা’ গানটি বহুকাল আমাদের মর্মের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল। তাছাড়া বিদেশিদের দিয়ে আমাদের দেশকে সকল দেশের সেরা’ বলানো কি ঠিক হতো?’ উনি তার জবাব দিলেন না। বলতে থাকলেন : ‘আর আমাদের দাদারা তো আরো এককাঠি এগিয়ে। পঞ্চম জর্জের বন্দনাকে জাতীয় সংগীত বানিয়ে ফেললো।’ মৃদু হেসে মাথা দুলিয়ে উপদেষ্টার কথায় সায় দিচ্ছেন কেউ কেউ। আমি এবারে আর হাসতে পারলাম না। বললাম : ‘এ-নিয়ে যেসব বাদানুবাদ হয়েছে, আপনার তা জানার কথা। রবীন্দ্রনাথের নিজের বক্তব্যও রয়েছে এ-বিষয়ে। ওটা যে পঞ্চম জর্জের বন্দনা। নয়, তা এখন সুপ্রতিষ্ঠিত।’ শামসুল হুদা চৌধুরী বললেন : আমি আদ্যোপান্ত জানি। আর যাকে হোক, আমাকে বোঝাতে আসিস না যে, ওটা সম্রাটের বন্দনা নয়। ওটা যে পঞ্চম জর্জের বন্দনা, তার কনটেমপোরারি এভিডেনস আছে।’
শামসুল হুদা চৌধুরী শান্তিনিকেতনের ছাত্র ছিলেন। তাঁর পৈতৃক বাড়ি বোলপুরের একেবারে পাশে। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তিনি জানেন যথেষ্ট। তবে নিজে যা বলছেন, তার পালটা যুক্তি শুনতে রাজি নন। আমি তো সাক্ষ্যপ্রমাণ। সঙ্গে নিয়ে ঘুরছি না। অতএব, এ-তর্কের ছেদ টানলাম।
পাহাড়পুরের রক্ষণাবেক্ষণের জন্যে ইউনেসকোর সাহায্য চাইবার একটা প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল এই কমিটির সভায়। তারপর অত্যন্ত কাছাকাছি সময়ের লোকজনের স্মৃতিরক্ষার জন্যে সবাই ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। সভাপতির কোনোটাতেই আপত্তি নেই।
রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা পরিষদ ভেঙে যাওয়ার পরেও শামসুল হুদা চৌধুরী জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভার সদস্য রয়ে গিয়েছিলেন।
মন্ত্রিসভা গঠনের অল্পকাল পরেই জিয়াউর রহমান জাগদল বিলুপ্ত করেন, গঠন করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হয়েও তিনি প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব পালন করতে থাকেন, জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে নিযুক্ত করেন সেনাবাহিনীর স্টাফ-প্রধান। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল দুই তৃতীয়াংশের অধিক আসন লাভ করে। আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় স্থান লাভ করে–তবে তার আসনসংখ্যা থাকে সামান্য। নির্বাচনের ছয় সপ্তাহের মধ্যে শাহ আজিজুর রহমান প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন এবং ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও মওদুদ আহমদ হন সহকারী প্রধানমন্ত্রী। এই খবরটা আমি পাই বিদেশে বসে।
২৬.
ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরি অ্যান্ড রেকর্ডসের পরিচালক জোন সি লানকাস্টার অবসর নিয়েছেন। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন সোয়াসের গ্রন্থাগারিক বি সি ব্লুমফিল্ড। ১৯৭৭ সালে আমি ঢাকা কুঠির কাগজপত্রের তালিকা তৈরি করে দিয়ে আসার পরে লাইব্রেরিতে অনুরূপ আরো কিছু কাগজপত্র পাওয়া গেছে। ব্লুমফিল্ড আমাকে লিখলেন, আরেকবার লন্ডনে গিয়ে যদি আমি এগুলোর তালিকা করে দিতে পারি, তবে একসঙ্গে বই করে ছাপা যাবে। এবারেও ব্রিটিশ অ্যাকাডেমি ওরিয়েন্টাল ডকুমেন্টস কমিটি আমার স্থানীয় খরচ নির্বাহ করবেন, যাতায়াত খরচের ব্যবস্থা আমাকে করতে হবে।
আবুল মাল আবদুল মুহিত তখন বহিঃসম্পদ বিভাগের সচিব। তাকে আমার প্রয়োজনের বিষয়টা অবহিত করলাম। তাঁর হাতে যা আছে, তার থেকে কিছু করা গেল না। তিনি ফোন করলেন বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়ের সচিব এ বি এম গোলাম মোস্তফাঁকে। সবটা খুলে বলে অনুরোধ করলেন আমাকে বাংলাদেশ বিমানের একটি সৌজন্যমূলক টিকিট দেওয়ার ব্যবস্থা করতে। কয়েকদিন পর জানা গেল, ব্যবস্থা হয়েছে।
১৯৭৯ সালের ১০ মার্চ লন্ডন রওনা হলাম। এবারও গিয়ে উঠলাম আবদুল মোমেনের বাড়িতে। গিয়ে দেখি, তার ভগ্নিপতি, ঢাকা বেতারের সহকারী আঞ্চলিক পরিচালক আবু শাহাদাৎ, এক প্রশিক্ষণ-কর্মসূচিতে লন্ডনে এসেছেন বিবিসির সঙ্গে যুক্ত হতে। তিনি স্বাভাবিকভাবে মোমেনদের অতিথি। অনতিবিলম্বে তাঁর পরিবার এসে সেখানেই তাঁর সঙ্গে মিলিত হবে। অতএব অন্যত্র বাসস্থান সন্ধান করা আমার কর্তব্য। এ-বিষয়ে মোমেনই সাহায্য করলেন। তাঁর সহকর্মী জ্যান ড্রাইডেন এই গ্রীষ্মবকাশে খুব শখ করে বাংলাদেশে যেতে চেয়েছিল। এমন কথাও হয়েছিল যে, জ্যান বাংলাদেশে গেলে চট্টগ্রামে আমার বাড়িতে কয়েকদিন থাকবে। কিন্তু তার পাসপোর্ট দক্ষিণ আফ্রিকার বলে সে বাংলাদেশের ভিসা পেল না। কিছুক্ষণ কান্নাকাটি করে সে স্থির করলো, হংকং যাবে বেড়াতে। এখন তার ফুলগাছে পানি দেওয়ার দায়িত্ব। কাউকে নিতে হবে। মোমেন আমাকে নিয়ে গেলেন জ্যানের বাড়িতে। বললাম, ‘আমি তব মালঞ্চের হবো মালাকর।’
