১. ড. মুফীজুল্লাহ্ কবীর, প্রো ভাইস চ্যান্সেলর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
২. ড. সালাহউদ্দীন আহমদ, অধ্যাপক ও অধ্যক্ষ, ইতিহাস বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
৩. ড. সফর আলী আকন্দ, পরিচালক, ইনসটিটিউট অফ বাংলাদেশ স্টাডিজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
৪. ড. এনামুল হক, পরিচালক, ঢাকা যাদুঘর
৫. ড. কে এম মোহসীন, সহযোগী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
৬. ড. শামসুল হুদা হারুণ, সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
৭. ড. আহমদ শরীফ, অধ্যাপক ও অধ্যক্ষ, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
৮. ড. আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক ও অধ্যক্ষ, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
৯. জনাব হাসান হাফিজুর রহমান, বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, মুক্তিযুদ্ধের
ইতিহাস প্রকল্প। আহমদ শরীফ এই প্রকল্পে যুক্ত হতে অসম্মত হন। তখন তার জায়গায় জাতীয় গ্রন্থাগার ও আর্কাইভসের পরিচালক কে এম করিমকে নিয়ে কমিটি পুনর্গঠিত হয় ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এবারে অধ্যাপক মফীজুল্লাহ্ কবীরকে প্রামাণ্যকরণ কমিটির সভাপতি, হাসান হাফিজুর রহমানকে সদস্য সচিব এবং বাকি সাতজনকে সদস্য বলে অভিহিত করা হয়। ১৯৭৯ সালের জানুয়ারি থেকে প্রকল্পের অফিস স্থাপিত হয় সেগুনবাগিচায় এবং সামান্য লোকবল নিয়ে এর কাজ শুরু হয়। প্রকল্পের সার্বক্ষণিক গবেষক হিসেবে যোগ দেন ইমামুর রশীদ, আফসান চৌধুরী, শাহ আহমদ রেজা ও ওয়াহিদুল হক। সুকুমার বিশ্বাস ও রতনলাল চক্রবর্তী নানাভাবে সাহায্য করেন। পরে ত্রিদিব দস্তিদার কর্মী হিসেবে প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট হন।
প্রকল্প হাতে নিয়ে হাসান হাফিজুর রহমান যখন আমার সঙ্গে এ বিষয়ে পরামর্শ করেন, তখন আমি তাকে বলি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসরচনার চেষ্টা না করে দলিলপত্র সংকলন করতে। কারণ সরকারি উদযোগে লেখা ইতিহাস পক্ষপাতহীন হওয়া দুরূহ। অন্যদিকে দলিল নিজ থেকেই এক ধরনের সত্য প্রকাশ করে। হাসান আমার যুক্তি মেনে নেন। আরো কেউ কেউ এ-প্রস্তাব সমর্থন করেন। সরকারকে বিষয়টা বোঝাতে কিছু সময় লাগে।
প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর এক বছর করে বাড়তে থাকে। মেয়াদবৃদ্ধির আনুষ্ঠানিকতা সম্পূর্ণ হতে মাঝে মাঝেই বিলম্ব ঘটে। তখন প্রকল্পের পরিচালক ও কর্মীদের বেতন পেতে বিলম্ব হয়। এই মানসিক চাপের মধ্যে তাদের কাজ করতে হয়। দলিলপত্র ছাপা হওয়া শুরু করলে স্পেশাল ব্রাঞ্চের কর্মকর্তারা ছাপা ফর্মা নিয়ে পরীক্ষা করেন বেশ সময় ধরে। তাদের অনুমোদন পেতে দেরি হয়। তাতেও এক ধরনের মানসিক উৎকণ্ঠার মধ্যে পড়তে হয় সংশ্লিষ্ট সকলকে।
প্রামাণ্যকরণ কমিটির সভায় নিয়মিত যোগদান করা আমার পক্ষে সম্ভবপর হয়নি-মধ্যে মধ্যে দেশের বাইরে থাকা এবং দেশে থাকলেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো জরুরি কাজে ব্যস্ত থাকা তার কারণ। তবু প্রকল্পের কাজটি আমি যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করি। প্রামাণ্যকরণ কমিটির সভায় মাঝে মাঝে উত্তাপের সৃষ্টি হতো। কমিটির কোনো কোনো সদস্য যেমন আওয়ামী লীগের পক্ষপাতী ছিলেন, গবেষকদের কেউ কেউ তেমনি আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিহীন ছিলেন। দৃষ্টিভঙ্গির এই পার্থক্য কখনো কখনো সংঘাতের সৃষ্টি করতো। প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার পরে। মুক্তিযুদ্ধের বদলে স্বাধীনতা-যুদ্ধ শব্দবন্ধ ব্যবহারের সরকারি সিদ্ধান্ত হয়। প্রকল্পকে তা মেনে নিতে হয়। তবে শেষ পর্যন্ত বস্তুনিষ্ঠভাবেই কাজটি সম্পন্ন হয়। কমিটির কাজে তবু একটা ত্রুটি রয়ে যায়। প্রামাণ্যকরণ কমিটি কোন কোন দলিল অনুমোদন করলো, সভার কার্যবিবরণীতে তার তালিকা রক্ষা করা হতো না। ফলে এমন অভিযোগের সুযোগ সৃষ্টি হতো যে, প্রামাণ্যকৃত কোনো দলিল মুদ্রিত হয়নি। এমন তালিকা তৈরি করা বা কমিটির পরবর্তী সভায় তা স্থিরীকৃত করিয়ে নেওয়ার জন্যে আমরা কেউ কেউ হাসান হাফিজুর রহমানকে অনুরোধও করেছি। কেন জানি না, সে-অনুরোধ তিনি রক্ষা করেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, যা-কিছু অনুমোদিত হচ্ছে, তার সবই গ্রন্থভুক্ত হতে যাচ্ছে।
এই প্রকল্পের জন্যে হাসান হাফিজুর রহমান খুব খেটেছিলেন। প্রকল্পের গবেষকেরাও যথেষ্ট পরিশ্রম করেছিলেন। বাংলা একাডেমির মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রকল্পে সংগৃহীত দলিলপত্র এই প্রকল্পের কাছে হস্তান্তরিত হয়। প্রকল্পের উদ্যোগে বিপুল পরিমাণ দলিল সংগৃহীত হয়। অনেকে অবশ্য নিজেদের সংগ্রহের জিনিসপত্র হাতছাড়া করতে চাননি, কেউ কেউ অনুলিপিও দিতে চাননি। তবু সাড়ে তিন লাখ পৃষ্ঠার কাগজপত্র সংগ্রহ করা যায়। তার থেকে ছাপা হয় ১৫০০০ পৃষ্ঠার দলিল। মূল পরিকল্পনায় তার অর্ধেক পরিমাণ ছাপার কথা ছিল। বর্ধিত কলেবরে প্রকাশের জন্যে অর্থাৎ অতিরিক্ত ব্যয়-বরাদ্দের জন্যে হাসানকে অনেক দেন-দরবার করতে হয়। শেষদিকে তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। সম্পাদক হিসেবে তাঁর দায়িত্বভার অর্পণ করা হয় কে এম মাহসীনকে। তবে দলিলপত্রের ভূমিকা হাসান লিখে যেতে পেরেছিলেন। তার ইচ্ছায় তাতে আমি খানিকটা যোগ-বিয়োগ করেছিলাম। হাসান খুব আত্মতৃপ্তির সঙ্গে বলেছিলেন, একুশে ফেব্রুয়ারির পর আবার একটা কাজ আমরা একসঙ্গে করতে পারলাম।
