পৃথিবীর ২২টি দেশের ৬৬ জন বিদ্বানের সঙ্গে কয়েকদিন যাপন করার সুখস্মৃতি নিয়ে ১৮ তারিখ সকালে কিয়োটো ছাড়লাম।
২৩.
ওসাকা থেকে এলাম হংকংয়ে। এবার কিছু কেনাকাটার ফর্দ নিয়ে গিয়েছিলাম। হংকং বিমানবন্দর থেকে যোগাযোগ করে এবারে কোনো হোটেলে জায়গা পাওয়া গেল না। আর কতক্ষণ অপেক্ষা করা যায়! একটা ট্যাকসি নিয়ে চলে এলাম হোটেল অ্যামবাসাডরে। বিমানবন্দরে যে-মেয়েটি আমার জন্যে জায়গা। খুঁজছিল, সে অবশ্য বলেছিল, ওখানে জায়গা নেই। আবার এ-ও বলেছিল যে, আমি যেতে যেতে কোথাও হয়তো কোনো অতিথি হোটেল ছেড়ে গেলে জায়গা পাওয়া যেতে পারে। সেই ভরসায় অ্যামবাসাডরে এলাম। কিন্তু ঠাই নেই। হোটেলের বেল-ক্যাপ্টেনকে বললাম, আগে এখানে থেকে গেছি, কিন্তু আজ ঘর খালি নেই। আমি কি তোমার কাছে সুটকেস রেখে জায়গার সন্ধানে যেতে পারি? সে সম্মত হলো।
চরণযুগল ভরসা করে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরি। হোটেলে স্থান নেই, গেস্ট হাউজে খোঁজ করি। একটা গেস্ট হাউজে দেখলাম লেখা রয়েছে খালি আছে। কিন্তু রিসেপসনিস্ট মহিলা বললেন, জায়গা নেই। বুঝলাম, আমি প্রাচ্যদেশীয় হওয়ায় তাঁর এই জবাব।
ক্লান্ত ও পিপাসাত হয়ে একটি বারে ঢুকে পড়ি। তখনো বার ভালো করে খোলেনি। অদূরে এক ভদ্রলোক বসে আছেন মাত্র–আপ্যায়ন করার লোকজন। কাউকে দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ শুনি অপর খরিদ্দারের কণ্ঠস্বর : তোমাকে এত মনমরা দেখাচ্ছে কেন? এসো, কাছাকাছি বসা যাক।
উঠে এসে ভদ্রলোকের পাশে বসলাম। পরিচয় হলো। উনি নিউ ইয়র্কে প্যানাম এয়ারলাইনসে প্রশাসনিক কাজ করেন। আমার দুরবস্থার কথা শুনে বললেন, কিছু মনে কোরো না। এ তোমার অবিবেচনার ফল। একটা ব্যস্ত শহরে আসছো। আগে থেকে বাসস্থান ঠিক করে আসবে না? দু-সপ্তাহ আগে চেষ্টা করলে নিশ্চয় জায়গা পেতে।
কথাটা শুনতে ভালো লাগলো না, কিন্তু তার যথার্থতা অস্বীকার করতে পারলাম না। একটি ছেলে এসে অর্ডার নিয়ে গেল–খুব যে প্রসন্নচিত্তে, তা বলা যায় না। হাসিমুখে একটি মেয়ে অর্ডার নিয়ে এলো।
ভদ্রলোক বললেন, এই যে তোমরা বাংলাদেশ এয়ারলাইনস চালাও, কেন চালাও? ন্যাশনাল ক্যারিয়ার–একটা মর্যাদার ব্যাপার! কিন্তু তার জন্যে কত লোকসান দিতে হয়, তোমার কোনো ধারণা আছে? আমি বলতে পারি, বহুকাল তোমাদের লোকসান দিতে হবে, হয়তো কখনো লাভের মুখ দেখবে না। এত টাকা নষ্ট করে জাতীয় মর্যাদালাভের কোনো অর্থ হয়? স্ক্যান্ডেনেভিয়ার দেশগুলো সকলে মিলে একটা এয়ারলাইনস চালায়। দক্ষিণ এশিয়ার সবগুলো দেশ মিলে কি একটা এয়ারলাইনস চালাতে পারে না? আমি তোমাকে বলছি, প্যানামের মতো এয়ারলাইনস এখন হিমশিম খাচ্ছে। সেখানে তোমরা?
আরো খানিকক্ষণ গল্প হলো। আমরা একসঙ্গে বের হলাম, কিছুক্ষণ একসঙ্গে হাঁটলাম। ভদ্রলোক বিদায় নেওয়ার সময়ে বললেন, ‘আই হোপ, ইউ ডোনটু এন্ড আপ ইন এ হোরহাউস।
আবার খোঁজাখুঁজি। কে যেন চুংকিং আর্কেডের কথা বললো। সেখানে গিয়ে ঘর পাওয়া গেল। অত্যন্ত অপরিসর, দরজা খুলে লাফ দিয়ে বিছানায় উঠতে হয় আর কি! তাই সই, অ্যামবাসাডরে গিয়ে সুটকেস নিয়ে এলাম–এবারে ট্যাকসিতে।
তারপর বেরিয়ে খেয়েদেয়ে ফিরলাম, অমন ঘরে ফিরতে মন চাইছিল না যদিও।
পরদিন কেনাকাটা। নিজেদের জন্যে একটা টেলিভিশন, কনিষ্ঠ শ্যালিকা সিমিনের বিয়ে সামনে–তার জন্য পাথরের একটা গয়না। মেজো শালি নাজু। ডলার দিয়ে দিয়েছিল ক্রিস্টালের কিছু জিনিস কিনতে–তাও নেওয়া হলো। এসব জিনিস রাখার মতো জায়গা নেই ঘরে। টেলিভিশনটা গেস্ট হাউজ কর্তৃপক্ষের জিম্মায় রাখলাম।
২০ তারিখে হংকং থেকে ব্যাংককে এলাম। থাই এয়ারওয়েজ অতিরিক্ত মালের মাশুল নিলো না। মনে মনে খুশি হলাম।
ব্যাংককে থাই এয়ারওয়েজের অতিথি হিসেবে রাত কাটালাম। হোটেল বরাদ্দ করতে এবং ট্যাকসির কুপন দিতে প্রয়োজনাতিরিক্ত সময় নিলো বিমানবন্দরে। তবে সেখানে সুটকেস বাদে বাকি সব মাল নিজের খরচে রাখা গেল, এই যা স্বস্তি।
পরদিন ঢাকা যাওয়ার সময়ে অতিরিক্ত মালের মাশুল গুনতে হলো। যতই বলি না কেন হংকংয়ে বাড়তি পয়সা নেয়নি, ব্যাংককে নতুন জিনিস যুক্ত হয়নি, তাতে কাজ হলো না।
২৪.
হাসান হাফিজুর রহমান মস্কোতে প্রেস কাউনসেলর হয়ে গিয়েছিলেন ১৯৭৩ সালে, ১৯৭৪-এ তাঁর সেই নিয়োগের অবসান ঘটে। দেশে ফিরিয়ে এনে তাকে তথ্য মন্ত্রণালয়ে ওএসডি–অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি, আমার এক বন্ধুর ভাষ্যে অফিসার ইন স্পেশাল ডিফিকালটিজ–নিয়োগ করা হয় বছরখানেকের জন্যে। তারপর তিনি বেকার। একটা পর্যায়ে সংসারের জিনিসপত্র বিক্রি করে তাঁকে চলতে হয়। আমার সঙ্গে একবার তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগে যোগদানের সম্ভাব্যতাও আলোচনা করেছিলেন। কিন্তু যে-পদমর্যাদা বা বেতন পেলে তার পোষাতো, সেটা তাঁকে দেওয়া সম্ভবপর ছিল না বলে কথাটা আর বেশিদূর এগোয়নি। বৎসরাধিকাল বেকারজীবন যাপনের পর তাকে আবার তথ্য মন্ত্রণালয়ে ওএসডি করা হয় এক বছরের জন্যে। তারও কিছুকাল পরে, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ইচ্ছায়, তাকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনা ও মুদ্রণ প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার পরামর্শে নিম্নলিখিত ব্যক্তিদের নিয়ে সরকার ওই প্রকল্পের একটি প্রামাণ্যকরণ কমিটি গঠন করে ১৯৭৮ সালের জুলাই মাসে :
