প্রথম অধিবেশনে এক ইন্দোনেশীয় মহিলা অনর্থক তর্ক জুড়ে দিয়ে এত সময় নষ্ট করলেন যে, কর্মসূচির ব্যাঘাত ঘটে গেল। প্রথম অধিবেশন তো সময়মতো শেষ হলো না, দ্বিতীয় অধিবেশনও শেষ করতে বিলম্ব হলো। তৃতীয় অধিবেশনের সভাপতি তাই ঘোষণা করলেন যে, তিনি কাউকে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে এক মিনিটও বেশি বলতে দেবেন না; সময় শেষ হলেই টেবিল ঠুকবেন হাতুড়ি দিয়ে, আর সেই সঙ্গে বক্তার মাইক্রোফোন বন্ধ হয়ে যাবে। সৈয়দ হুসেন আলতামাসের দশাসই শরীর, শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখমণ্ডল গাম্ভীর্যপূর্ণ–তাঁকে অমান্য করবার সাহস কার! আর মাইক্রোফোন বন্ধ হয়ে গেলে কথা বললেও বা শুনবে কে! আমাকে যখন তিনি প্রবন্ধ উপস্থাপন করতে আহ্বান জানালেন, আমি বললাম, আশা করি, হাতুড়ি পেটাবার আগেই আমি বক্তব্য শেষ করবো। আমার প্রবন্ধ প্রচারিত হয়েছে, সুতরাং ইচ্ছা। করলেই যে-কেউ তা দেখে নিতে পারবেন। আমি মাত্র কয়েকটি বিষয়। সকলের গোচরে আনতে চাই। তারপর কিছু কথা বলে নির্ধারিত সময়ের দু তিন মিনিট আগেই বক্তব্যের ইতি টানলাম। এতেই আমার প্রতি সবার দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো। সভাপতি আমার কাণ্ডজ্ঞানের ভূয়সী প্রশংসা করলেন, রেক্টর হেস্টার পাশ থেকে আমাকে ধন্যবাদ জানালেন, আনোয়ার আবদেল-মালেক নিজের আসন থেকে উঠে এসে বললেন, তোমার ভদ্রজনোচিত আচরণ সিম্পোজিয়ম বাঁচিয়ে দিয়েছে–এরপর কেউ বেশি বলতে লজ্জা পাবে, আলোচনা-পর্বে তুমি আবার সময় নিও। সত্যি সত্যিই আলোচনা-পর্বে আমার নাম ঘোষিত হলো প্রথমে। আমি বলতে চাইনি, বলতে প্রস্তুতও ছিলাম না। তবু দু-একটা অকিঞ্চিত্ত্বর কথা বললাম, সংক্ষেপে বলায় তার অন্তঃসারশূন্যতা বোধহয় ধরা পড়েনি।
র্যাপোর্টিয়রদের একটা অসুবিধা এই হলো যে, তারা যে-অধিবেশনে প্রবন্ধ পড়েছেন, তার ওয়ার্কিং গ্রুপে উপস্থিত থাকতে পারলেন না, রিপোর্ট করার জন্যে থাকতে হলো অন্য অধিবেশনের ওয়ার্কিং গ্রুপে। কারণ, মূল অধিবেশনের বিবরণীর সঙ্গে ওয়ার্কিং গ্রুপের কার্যবিবরণী তৈরি করাও ছিল র্যাপোর্টিয়রের কাজের অন্তর্ভুক্ত। তার জন্যে সভাপতির সঙ্গে বসার কথা। বরুণ দে বললেন, ‘আর বসতে হবে না। আপনি লিখে ফেললে আমি একবার চোখ বুলিয়ে দেবো। ভালোই। তবে বরুণের দেখার সময় কখন হবে, তার জন্য কিছু অপেক্ষা করতে হলো। এক সন্ধ্যায় অনেকে বেড়াতে যাচ্ছেন দল বেঁধে। ফিলিপিনসের মেরি রাসলিস হোলনস্টাইনার আমাকে ডাকতে এলেন। বরুণকে ফোন করতে তিনি বললেন, আপনি থাকুন, আমি আসছি।’ মেরিকে বললাম, কর্তব্যের ডাক এসেছে–আমার আর যাওয়া হবে না।’ মেরি চলে গেলেন। পরে বরুণ আড্ডা জমিয়ে ফেললেন। শেষকালে আমার খসড়াটা সঙ্গে নিয়ে ঘরে ফিরলেন। এমন হবে জানলে বেড়াতে যেতে পারতাম। বরুণ যেমন পণ্ডিত, তেমনি তীক্ষ্ণধী। সামান্য যা যোগ-বিয়োগ করলেন, তাতে রিপোর্ট অনেক উন্নতমানের হলো।
এই পর্যায়ের পরে জেনারেল র্যাপোর্টিয়র বসলেন সব ব্যাপোর্টিয়রদের নিয়ে। সেখানে সব অধিবেশনের সভাপতিদের ডাকা হয়েছিল, তবে সবাই। আসেননি। এই বৈঠকে আমি একটু বেশি কথা বলে ফেললাম। তবে সবাই সেটা ভালোভাবে নিয়েছিলেন। ফলে কোথাও আটকে গেলে রশীদউদদীন খান আমার দিকে তাকিয়ে বলতেন, আনিস কি বিষয়টার সমাধান দেবেন?
এই কাজ করতে গিয়ে বাকি র্যাপোর্টিয়রদের সঙ্গে বেশ বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। লে থান খোয় ও পাণ্ডেয়ার সঙ্গে আমার পরেও দেখা হয়েছিল, শিংগো শিবাতার সঙ্গে হয়নি। তবু আমার বিশ্বাস, আমরা সবাই সবাইকে। মনে রেখেছি।
আর যাদের সঙ্গে সৌহার্দ্য ঘটেছিল, তাদের মধ্যে ছিলেন ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ জাকার্তার রেক্টর সুলতান তকদির আলিসাভানা। তিনি আমাকে ইন্দোনেশিয়া-ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তখন একজন জানালেন, বালি দ্বীপের সকল নাচের দলকে নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। তিনি যে একজন বড়ো পণ্ডিত, সেকথা আমি ঢাকায় ফিরে জানলাম মনসুর মুসার কাছ থেকে এবং, আরো পরে, তার সম্মানে প্রকাশিত বিদ্বজ্জনদের রচনাসমৃদ্ধ একটি গ্রন্থ দেখে। টোকিওর ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকসের তাকেশি হায়াশি খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ, সেই সঙ্গে রসিক মানুষও। আতানেও দ্য ম্যানিলা ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অফ ফিলিপিনস কালচারের সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক মেরি রাসলিস হোলনস্টাইনার খুব মিশুক প্রকৃতির। সিম্পোজিয়মেই তিনি এক মজার গল্প করেছিলেন : ফিলিপিনসে জেলে-অধ্যুষিত কিছু দ্বীপ আছে। কিছু পর্যটন-ব্যবসায়ী অমন একটা দ্বীপ কিনে নিয়ে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তুলতে স্থির করে। তবে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্যে তারা পরিকল্পনা করে যে, কিছু সুন্দরী কেবল মাছধরা জাল পরে পর্যটকদের অভ্যর্থনা জানাবে। যাদের প্রবল আপত্তির মুখে এই পরিকল্পনা পরিত্যক্ত হয় এবং দ্বীপটি অক্ষুণ্ণ থাকে, তাদের মধ্যে মেরি একজন। আমার Cultural Pluralism বক্তৃতায় আমি এই ঘটনাটা বলেছিলাম। আরেকজনের সাহচর্য আমার ভালো লেগেছিল–তিনি টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের লিবারাল আর্টস ফ্যাকালটির অধ্যাপক মুনেসুকে মিতা।
সম্মেলনে আরো যেসব বিশিষ্ট ব্যক্তি অংশ নিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক স্বনামধন্য সচ্চিদানন্দ মূর্তি, পেনাংয়ের ইউনিভার্সিটি সেইনস মালয়েশিয়ার সেন্টার অফ পলিসি রিসার্চের পরিচালক কে জে রত্নম, ফিজির ইউনিভার্সিটি অফ সাউথ প্যাসিফিকের ভাইস-চ্যান্সেলর জেমস মারাজ, বেলগ্রেড বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর মিরোস্লাভ পিচুইলিক, ব্রাজিলের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ সেলসো ফুরতাদো এবং প্যারিসের ফাদার ব্রুনো রাইস উল্লেখযোগ্য।
