আমার সঙ্গে দেখা হওয়ার কয়েকদিন পরে তিনি মারা যান। তখন তাঁর বয়স ৫৫ হয়েছে কি হয়নি।
২২.
আনোয়ার আবদেল-মালেকের চিঠি পেলাম। তিনি জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা-প্রকল্প হাতে নিয়েছেন দেশীয় বুদ্ধিবৃত্তিক সৃজনশীলতা সম্পর্কে। ১৯৭৮ সালের নভেম্বর মাসে জাপানের কিয়োটোতে এশিয়ান সিম্পোজিয়াম অন ইনটেলেকচুয়াল ক্রিয়েটিভিটি ইন এনডোজেনাস কালচার অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে আমাকে প্রবন্ধ পড়তে হবে। আমি সম্মত হলে তিনি জাতিসংঘ। বিশ্ববিদ্যালয়-কর্তৃপক্ষকে জানাবেন। তারা আমার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করবেন।
জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ক্যাম্পাস নেই, ছাত্র নেই, শিক্ষক নেই। তার এই বৈশিষ্ট্য লক্ষ করে এক রসিক ব্যক্তি মন্তব্য করেছিলেন যে, ঈশ্বরের মহত্ত্ব এখানেই যে, তাঁকে না-যায় দেখা,–যায় শোনা। টোকিওতে আছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের দপ্তর–সেখানে রেক্টর আছেন, ভাইস-রেক্টর আছেন, বেশ কিছু কর্মকর্তা আছেন। ১৯৭৬ সালে যখন টোকিও যাই, তখন সেখানে গিয়েছিলাম। জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ-কর্মকর্তা চিদাম্বরম ছিলেন আমার পূর্বপরিচিত। তিনি আমাকে অফিস ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন এবং তাঁদের কাজকর্ম সম্পর্কে বলেছিলেন। জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয় নানা গবেষণামূলক প্রকল্প গ্রহণ করে, পৃথিবীর নানা দেশের বিদ্বজ্জনকে তার সঙ্গে জড়িত করে এবং সেসব গবেষণার ফল প্রকাশ করে।
খবরের কাগজে জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের খবর পড়ে বেবী একবার জানতে চেয়েছিল, তার সঙ্গে জড়িত হওয়ার আগ্রহ বা সুযোগ আমার আছে কি না। আমি বলেছিলাম, ওরা আর যাই করুক, বাংলার গবেষণা করবে না। এখন আনোয়ার আবদেল-মালেকের কল্যাণে সংযোগটা ঘটলো।
চিঠি এলো ভাইস-রেক্টর কিনহিডে মুশাকোজির কাছ থেকে। আমন্ত্রণ, আসা-যাওয়া-থাকার ব্যবস্থা এবং প্রবন্ধের সম্মানী বাবদ দু হাজার মার্কিন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। সম্মতি জানাতে বিলম্ব করলাম না। প্রবন্ধ লেখার কাজে লেগে গেলাম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক স্বপন আদনানকে বললাম আমার কাজে সাহায্য করতে। আমি প্রবন্ধটার খসড়া করবো, সামাজিক পটভূমির সঙ্গে সৃজনশীলতার যে-সম্পর্ক আমি দেখাতে চাই, তিনি সেটার বিচার করবেন এবং সামগ্রিকভাবে পরামর্শ দেবেন। সম্মানীর অর্থ আমরা ভাগাভাগি করে নেবো।
বেশ পরিশ্রম করে প্রবন্ধ লিখলাম। স্বপন আদনানও প্রভূত সাহায্য করলেন। বিষয়টির একটি তাত্ত্বিক ভিত্তিও তিনি দেওয়ার চেষ্টা করলেন। সম্মেলনের আগেই প্রবন্ধটি টোকিওতে পাঠিয়ে দেওয়া সম্ভবপর হলো।
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এলাম ৮ নভেম্বরে, ঢাকা থেকে রওনা হলাম ১০ তারিখে। ব্যাংককে একদিন কাটিয়ে শহরটির সঙ্গে পরিচিত হওয়া গেল। ১২ তারিখে সেখান থেকে পৌঁছলাম ওসাকা বিমানবন্দরে। সেখান থেকে গাড়িতে কিয়োটোয়।
কিয়োটো জাপানের প্রাচীন রাজধানী। বনেদি শহর। জাপানের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বলে এই শহরের অধিবাসীরা তাকে দাবি করে। তাদের মতে, টোকিও হতে পারে জাপানের রাজধানী ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র, কিন্তু দেশের সংস্কৃতিকে জানতে হলে কিয়োটোয় আসতে হবে। সিম্পোজিয়মের ফাঁকে ফাঁকে কিছু সময় পাওয়া গেল বটে, কিন্তু কাজে এবং নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলতেই তার অনেকখানি চলে গেল। আয়োজকদের ব্যবস্থাপনায় সামান্য কিছু দেখা হলো–জাদুঘর এবং বৌদ্ধমন্দির, তবে কিয়োটোকে জানবার পক্ষে তা কিছু নয়।
সিম্পোজিয়ম হলো ১৩ থেকে ১৭য়। উদবোধনী ছাড়া চারটি খোলা অধিবেশন এবং প্রতি অধিবেশনের বিষয়ে ওয়ার্কিং গ্রুপের পৃথক বৈঠক। উদৃবোধনী অধিবেশনে কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে ভাষণ দিলেন তার প্রেসিডেন্ট মিশিয়ো ওকামোতো এবং অতিথির ভাষণ দিলেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস প্রফেসর তাকেও কুওয়াবারা। আনোয়ার আবদেল-মালেক সমন্বয়ক হিসেবে দীর্ঘ বক্তৃতা পাঠ করলেন। জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বললেন ভাইস-রেক্টর কিনহিডে মুশাকোজি এবং রেক্টর জেমস হেস্টার। শুনলাম, মুশাকোজি খুব অভিজাত পরিবারের মানুষ, তাঁর পাণ্ডিত্যের খ্যাতি আছে। হেস্টার যে পণ্ডিত হিসেবে খুব বিশিষ্ট, তা বোধহয় নন, তবে মার্কিন বলে জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম রেক্টর হওয়ার গৌরব লাভ করেছেন। দুজনেই খুব ভদ্র ও সহৃদয় মানুষ। আরেক ভাইস-রেক্টর, আলেকজান্ডার কোয়াপং, একটু গোমড়ামুখ করে ছিলেন। প্রকল্পটি এই আফ্রিকি বিদ্বানের এলাকার বাইরে বলে সিম্পোজিয়মে তার তেমন কোনো ভূমিকা নেই–হয়তো এই কারণে। প্রোগ্রাম অফিসার হোসাম ইসা, চিফ অফ কনফারেনসেস অ্যান্ড সার্ভিসেস রবিন্দর মালিক এবং সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার পুনা উইগনোরাজা ছোটাছুটি করছেন সব সময়ে। উইগনোরাজাকে তখন কেবল ব্যবস্থাপক মনে করেছিলাম, পরে তাঁর পাণ্ডিত্যের সঙ্গে পরিচিত হই।
সিম্পোজিয়মের জেনারেল র্যাপোর্টিয়র নিযুক্ত হয়েছিলেন জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও সভাপতি এবং ভারতীয় রাজ্যসভার সদস্য রশীদউদদীন খান। চারটি অধিবেশনের সভাপতি ও র্যাপোর্টিয়র যথাক্রমে কলকাতার সেন্টার ফর দি স্টাডিজ অফ সোশাল সায়েন্সেসের পরিচালক বরুণ দে ও আমি; চীনের অ্যাকাডেমি অফ সোশাল সায়েন্সেসের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনালিটি স্টাডিজের ভাইস-ডিরেক্টর ফেই সিয়াও-তুং ও হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনারেল সায়েন্সেস ফ্যাকালটির অধ্যাপক শিংগো শিবাতা; সিঙ্গাপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মালয় স্টাডিজ বিভাগের প্রধান সৈয়দ হুসেন আলাতাস ও প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক, ভিয়েতনামের সন্তান, লে থান খোয়; এবং কাবুলে ইউএনডিপিতে কর্মরত আফগান কূটনীতিবিদ এ এইচ তাবিবি ও দিল্লির ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক এ এন পাণ্ডেয়া। জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়কে ঈশ্বরের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন এই তাবিবি। পাণ্ডেয়া পরে। আনোয়ার আবদেল-মালেকের সঙ্গে যৌথভাবে সিম্পোজিয়মের প্রবন্ধাবলি ও কার্যবিবরণী সম্পাদনা করেছিলেন। সেটা দেখেই এতজনের নাম ও পরিচয় দিতে পারছি।
