২ অক্টোবর সকালে বাংলাদেশ বিমানযোগে আমার চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় যাওয়ার কথা। ক্যাম্পাস থেকে নিজের গাড়িতে রওনা হয়েছি, জুবিলি রোডে। বিমান অফিসে থামলাম বিমান সময়মতো যাচ্ছে কি না, তা জিজ্ঞেস করতে। বিমান অফিসে থমথমে অবস্থা, উপস্থিতিও কম। একজন বললেন, ‘ঢাকা থেকে ফ্লাইট আসেনি, আপনি বরঞ্চ পরে ফোন করে খবর নিয়ে তারপর এয়ারপোর্টে যাবেন। বিমান থেকে আবদুল আলীর বাড়িতে গেলাম। তিনি গুজব শুনেছেন, ঢাকা বিমানবন্দরে গোলযোগ চলছে। ভাবলাম, কালই তো ছিনতাই নাটকের অবসান হলো, আবার কিসের গোলযোগ। আলীর বাসা থেকে ঢাকায় ফোন। করলাম আমার মামাতো ভাই সৈয়দ কামরুজ্জামানকে। তিনি বললেন, ঢাকায় গোলমাল হচ্ছে। কোনো অবস্থাতেই আসবে না। টিকিট ফেরত দিয়ে বাড়ি চলে যাও। অন্য কোনোভাবে আসার চেষ্টা করবে না।’
এদিক-ওদিকে খবর নিয়ে যেটুকু জানা গেল, তা এই : ৩০ তারিখে বগুড়া সেনানিবাসে গোলযোগ হয়েছে, আজ সকাল থেকে ঢাকা বিমানবন্দরে এবং ঢাকা সেনানিবাসে সেনাবাহিনীর ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের দু-দলে গুলিবিনিময় হয়েছে। বগুড়া ও ঢাকায় অনেক হতাহত। মনে হয়, কোনো একদল রাষ্ট্রক্ষমতাদখলের চেষ্টা করেছে। সেদিন রাষ্ট্রপতি জিয়া জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিলেন। এরকম পরিস্থিতিতে যেমন বলা হয়, তেমনি।
কয়েকদিনের মধ্যে প্রায় পাঁচশ সেনা-কর্মকর্তা ও সৈনিকের বিচারকার্য সম্পন্ন হয়ে গেল। অনেকের মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন ও বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হলো। এসব দণ্ড কার্যকর হলো, তার পাশাপাশি আবার তদন্তের ব্যবস্থাও হলো। বিচার ও শাস্তি হলো বটে, তবে ন্যায়বিচার হলো কি না, সে-সম্পর্কে সন্দেহ রয়ে গেল। আপাতত জিয়া ক্ষমতাসীন রইলেন।
কিছুদিনের মধ্যে সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট রাজনৈতিক সংগঠন জাতীয় গণতান্ত্রিক দলের আবির্ভাব ঘটলো। এর আহ্বায়ক উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাত্তার। অচিরেই তাতে যোগ দিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়া। ৩ জুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তারিখ নির্ধারিত হলো। জিয়া প্রার্থী হলেন–জাগদল বা জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী। এই ফ্রন্টে জাগদল ছাড়া রয়েছে মশিউর রহমান ওরফে যাদু মিয়ার নেতৃত্বাধীন ভাসানীপন্থী ন্যাপ, কাজী জাফর আহমদের নেতৃত্বাধীন ইউপিপি, মুসলিম লীগ, লেবার পার্টি ও তফসিলী ফেডারেশন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী জেনারেল ওসমানী–গণতান্ত্রিক ঐক্যজোটের মনোনীত প্রার্থী। এই জোটে রয়েছে আওয়ামী লীগের দুটি অংশ (আবদুল মালেক উকিল ও মিজানুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন), ওসমানীর নেতৃত্বাধীন জাতীয় জনতা পার্টি, পিপলস লীগ ও গণ আজাদী লীগ। কমিউনিস্ট পার্টি জোটভুক্ত হয়নি, তবে ওসমানীর প্রার্থিতা সমর্থন করেছে।
নির্বাচনে প্রত্যাশিতরূপে জিয়া বিপুল ভোটে জয়লাভ করলেন। মশিউর রহমান সিনিয়র মন্ত্রী নিযুক্ত হলেন। ৩০ জনের মন্ত্রিসভা গঠিত হলো। রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা পরিষদ ভেঙে গেল।
মোজাফফর আহমদ রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা হিসেবে সরকারি কাজে চট্টগ্রামে এলে একবার ক্যাম্পাসে আমাদের কাছে আসতেন। সেবারও তিনি এসেছিলেন। রাতের ট্রেনে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ফিরে গেলেন। ট্রেনে উঠলেন উপদেষ্টা হিসেবে। ট্রেন থেকে যখন নামলেন, তখন আর তিনি উপদেষ্টা নন। তিনি জিয়ার রাজনৈতিক দলে যোগ দেননি।
২১.
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সচিব শহীদুল্লাহর সঙ্গে ঢাকায় দেখা হলে তিনি জানালেন, অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ চৌধুরী পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি আমাকে দেখতে চেয়েছেন, আমি যেন একবার যাই।
হাসপাতালে গিয়ে বুঝতে পারলাম, তার অবস্থা গুরুতর। আমাকে দেখে। তিনি খুশি হলেন। সাঞনয়নে বললেন, আনিস সাহেব, সিগারেট ছেড়ে দেন। আমার যত কষ্ট, সব সিগারেট খাওয়া থেকে।
তিনি প্রচুর সিগারেট খেতেন। লাইব্রেরিতে যখন পড়তেন, সিগারেট খেতে বাইরে বেরিয়ে আসতেন। সময় যাতে নষ্ট না হয়, তাই দুই টানে একটা সিগারেট শেষ করে আবার পাঠকক্ষে ফিরে যেতেন। কবে থেকে তিনি সিগারেট খাওয়া ধরেছিলেন, তা আমার জানা নেই। আমি আরম্ভ করেছিলাম এমএ পাশ করার পরে। অতদিনে যখন সিগারেটের নেশা হয়নি, তখন আর হবে না মনে করে বন্ধুবান্ধবদের আড্ডায় কেউ সিগারেট দিলে এক-আধটা খেতে শুরু করি। তারপর দিনে দুটো কিনতে থাকি। এখন রোজ ২০/২৫টা খাই। সিগারেট ছেড়ে দেবার কথা ভাবিনি। মুজাফফর সাহেব সনির্বন্ধ অনুরোধ করায় বললাম, ‘চেষ্টা। করবো, সার্।
কথা বলতে তার কষ্ট হচ্ছিল। একটু পরে কেবিন ছেড়ে চলে এলাম। তিনি যে একবার আমার ওপর রাগ করেছিলেন, সেকথা মনে হলো। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে কলকাতায় কীভাবে দিন কাটিয়েছেন, তা মনে পড়ল। স্বাধীনতালাভের পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছিলেন–তখন আমাকে সেখানে আনতে চেষ্টা করে কেমন হেনস্তা হয়েছিলেন, তাও মনে হলো। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন গঠিত হলে তিনি তার প্রথম সভাপতি হন। তখন আমলাদের অসহযোগিতার কথা বলতেন। বাকশাল আমলে তিনি শিক্ষামন্ত্রী হন, কিন্তু মন্ত্রিত্ব তাঁর ভালো লাগেনি। খন্দকার মোশতাকের আমলেও তাঁকে মন্ত্রিত্ব করতে হয়েছিল, সে ছিল আরো খারাপ অবস্থা। মোশতাকের পতনের পরে মন্ত্রিসভা ভেঙে গেলে তিনি আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় ফিরে আসেন।
