মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করার অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ড. কাজী দীন মুহম্মদ পদচ্যুত হন। এই আদেশের বিরুদ্ধে তিনি হাইকোর্টে মামলা করেন। বিষয়টার ফয়সালা হতে সময় লাগে। এর মধ্যে তাঁকে খুব আর্থিক কষ্টে দিনাতিপাত করতে হয়। আমি বিভাগের দায়িত্বে থাকতেই একদিন খাতুনগঞ্জে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। ছোটোখাটো একটা ব্যবসার কাজে তিনি এসেছিলেন। আমি তাঁকে বলি, তিনি চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তার নিয়োগের জন্যে আমি চেষ্টা করতে পারি। তিনি বলেন, না, তিনি হাইকোর্টের রায়ের অপেক্ষায় থাকবেন। পরে রায় তাঁর পক্ষে যায়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন।
১৯.
রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টার পদ থেকে আবুল ফজলকে পদত্যাগ করতে হয়। সেইদিনই সৈয়দ আলী আহসান তার স্থলাভিষিক্ত হন। আমি তখন লন্ডনে।
ফিরে আসার পরে রশিদ চৌধুরী একদিন আমাকে বলেন যে, আলী আহসান আমাকে তার সঙ্গে দেখা করতে বলেছেন। আমি ঢাকায় গিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। তিনি আমাকে বলেন, ‘দেখো, একটা ব্যাপারে মানুষের দুরকম অ্যাটিচুড হতে পারে। কেউ ভাবতে পারে, আমি এই সরকারের সঙ্গে কোনোরকম সহযোগিতা করবো না। আবার কেউ ভাবতে পারে, সরকারে যেই থাকুক, দেশকে আমার যা দেওয়ার, তা আমি দেবো। তুমি কী মনে করো?’
বললাম, আমার কাজ তো আমি করে যাচ্ছি। সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে আমার অবস্থার তো হেরফের হয়নি।’
কথাটা বোধহয় ভালো শোনায়নি। তিনি বললেন, ‘তোমাকে কোনো সরকারি দায়িত্ব দিলে তুমি কি তা গ্রহণ করবে?
জানতে চাইলাম, কী ধরনের দায়িত্ব?
বললেন, ‘শিল্পকলা একাডেমী বা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব। তাছাড়া, ভারতে যেমন ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট আছে, বাংলাদেশে ওরকম একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কথা আমি ভাবছি। জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রকে রূপান্তরিত করে সেটা হতে পারে, অথবা নতুন করে তা প্রতিষ্ঠা করা যেতে। পারে। পিইএনকেও আমি সক্রিয় করে তুলতে চাই। তার জন্যে একজন সার্বক্ষণিক নির্বাহী কর্মকর্তা দরকার। সামনেই পিইএনের আন্তর্জাতিক সম্মেলন হবে অস্ট্রেলিয়ায়, তার জন্যে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। আমি এসব কাজের জন্যে তোমার কথা ভেবেছি।’
বললাম, ‘সার, আপনি জানেন, শিক্ষকতা ছাড়া আমি আর কিছু করতে চাই না। ৭২ সালে ইউসুফ আলী তো আপনাকে দিয়েই বলিয়েছিলেন আমাকে বাংলা একাডেমির পরিচালক হতে। ৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু আমাকে শিক্ষা-সচিব করতে চেয়েছিলেন। আমি মাফ চেয়ে নিয়েছিলাম। সরকারি দায়িত্ব নেওয়া আমার পোষাবে না।
আলী আহসান এ-প্রসঙ্গে আর কিছু বলেননি, কিন্তু তিনি অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। পরে রাজ্জাক সাহেবকে বলেছিলেন, আনিস খুব রাজনীতিতে জড়িয়ে গেছে।’ সার জানতে চেয়েছিলেন, এমন মনে হওয়ার কারণ কী? আলী আহসান বলেছিলেন, তিনি আমাকে একাধিক পদের কথা বলেছিলেন, আমি কোনোটাই গ্রহণ করতে সম্মত হইনি। রাজ্জাক সাহেব বলেছিলেন, ‘এমনো তো হইতে পারে যে, হ্যায় টিচিংটা হাছাই পছন্দ করে।’
তার মেয়ে-জামাই চট্টগ্রাম ছেড়ে যাওয়ার পরে আলী আহসান ক্যাম্পাসে এসে উঠতেন তাঁর আত্মীয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারিক, শামসুল আলমের বাড়িতে–আমার একটা বাড়ির পরে। অনেক সময়ে তিনি আসার আগেই খবর পেতাম, অনেক সময়ে তিনি এসে খবর দিতেন। আমি সাধারণত সঙ্গে সঙ্গেই দেখা করতে যেতাম। একবার তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কাগজে দেখলাম, আপনি বলেছেন, আওয়ামী লীগ আমলে মসজিদে আজান দেওয়া যেতো না, নামাজ পড়ায় বিঘ্ন হতো। এমন কথা কী করে বললেন?’
আলী আহসান বললেন, এ কথা উনি বলেননি।
বললাম, একাধিক কাগজে এমন রিপোর্ট বেরিয়েছে। আপনি প্রতিবাদ করলেন না কেন?
আমার শিক্ষক বললেন, প্রতিবাদ তো করেছিলাম। আমার পিআরও একটা অপদার্থ। কাগজে প্রতিবাদ ছাপাতে পারেনি।’
একবার বকরিদে আমরা সপরিবারে কাপ্তাই যাবো বলে স্থির করলাম। তারপরই শুনলাম, আলী আহসান চট্টগ্রামে আসছেন। তিনি বোধহয় তখন আর উপদেষ্টা নেই। ঈদের আগের দিন সকালে আমি ক্যাম্পাস ছাড়লাম, তিনি তার খানিক পরই সেখানে পৌঁছোলেন। আমি নেই জেনে তাঁর ধারণা হলো, তাকে এড়াতে আমি কাপ্তাই চলে গেছি। এ কথা অন্যের কাছে প্রকাশ করেছিলেন, আমাকে কিছু বলেননি, ফলে তাঁর এই ভ্রম নিরসনের কোনো চেষ্টাও আমি করিনি।
আরেকবার ঢাকায় এক বিয়ের অনুষ্ঠানে তাঁকে সালাম দিলাম, তিনি সালাম নিলেন না। আমার ওপর বিরক্ত হয়ে আছেন ভেবে আমি দ্রুত সরে গেলাম। পরে অন্যের কাছে তিনি নালিশ করেন, আমি নাকি তাঁকে দেখেও না-দেখার ভান করে সরে গেছি। আমি খুবই দুঃখিত হলাম।
অনেক পরে, মনে হয়, তাঁর মন থেকে এসব ধারণা দূর হয়েছিল। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি আবার আমার সঙ্গে স্বাভাবিক ব্যবহার করেছিলেন।
২০.
১৯৭৭ সালের ২৭ সেপ্টেম্বরে জাপানি রেড আর্মির কয়েকজন সদস্য মধ্য আকাশে জাপান এয়ারলাইনসের একটি বিমান ছিনতাই করে ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানটিতে দেড় শতাধিক আরোহী ছিল, তা ছাড়া ক্রু তো ছিলই। ছিনতাইকারীরা জাপানে কারাবন্দি তাদের কয়েকজন দলীয় সদস্যের মুক্তি দাবি করে এবং সেইসঙ্গে চায় কয়েক লক্ষ মার্কিন ডলার। বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার ভাইস-মার্শাল এ জি মাহমুদ ঢাকা বিমানবন্দরের কনট্রোল টাওয়ার থেকে দিনরাত ছিনতাইকারীদের সঙ্গে দেন-দরবার করতে থাকেন। তার ফলে কয়েকজন জিম্মি নারী ও শিশু মুক্ত হয়। কিন্তু ছিনতাইকারীরা মুক্তিপণের দাবিতে অটল থাকে এবং যাত্রীসহ বিমানটি উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিতে থাকে। ১ অক্টোবর আরেকটি জাপানি বিমানে কারাবন্দি রেড আর্মির সদস্যদের এবং পণের অর্থ ঢাকায় আনা হয়। জিম্মিরা মুক্তিলাভ করে। পরদিন কিছু আরোহী নিয়ে আটক বিমানটি কুয়েত যাত্রা করে, অপর বিমানে রেড আর্মির সদস্যেরা কোনো অজ্ঞাত গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হয়। সকলে স্বস্তির নিশ্বাস ত্যাগ করে।
