কোথায় যাচ্ছি আমরা, কে বলবে!
১৮.
এবারে বিদেশে যাওয়ার আগেই বিশ্ববিদ্যালয়-কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলাম, এই যাত্রার সময় থেকেই বিভাগীয় সভাপতির পদ থেকে আমি অব্যাহতি নিচ্ছি, অতএব আমার জায়গায় ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নিযুক্ত না করে যেন পূর্ণ মেয়াদে নতুন সভাপতি নিয়োগ করা হয়। আমার মনের মধ্যে এই ভাবনা ছিল যে, তাতে ১৯৭৫ সালে কিছুটা নিয়মভঙ্গ করে আমার আবার সভাপতি হওয়ার ব্যাপারটার খানিক শোধন হবে। কর্তৃপক্ষ যথারীতি আবু হেনা মোস্তফা কামালকে নতুন সভাপতি নিযুক্ত করেন। ফিরে এসে আমি শুধুই শিক্ষক হয়ে থাকি, তবে বিশ্ববিদ্যালয়-প্রশাসনের সঙ্গে নানা কাজে আমার সংশ্লিষ্টতা থেকেই যায়।
জহুরুল হকের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তদন্ত কমিশন যে-রিপোর্ট দিয়েছিল, তাতে সরকার খুশি হয়। সুতরাং একই কমিশনকে দেওয়া হয় অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজকর্ম তদন্ত করার দায়িত্ব। কমিশন চট্টগ্রামে এলে তাঁদের সামনে হাজির হতে ডাক পড়ে আমার। কমিশনের সভাপতিই আমার কাছে জানতে চান, এই যে কর্মে কনিষ্ঠ একজন বিভাগীয় সভাপতির অধীনে আমাকে কাজ করতে হচ্ছে, সেটা আমার কেমন লাগছে? আমি বলি, আমার কোনো অসুবিধে হচ্ছে না। আমি যখন সভাপতি ছিলাম, তখন সহকর্মীদের নিজের অধীন বিবেচনা করিনি, এখনো নিজেকে কারো অধীন মনে করছি না। সভাপতি সহকর্মীদের নেতৃত্ব দেন, তার কমবেশি তো নয়। জহুরুল হক বলেন, ‘ও, আপনি দেখছি তাহলে নব্যপন্থী। আপনার ক্ষেত্রে কী হয়েছে জানি না, তবে সিনিয়রকে বাদ দিয়ে জুনিয়র চেয়ারম্যান হবেন–দিস ইজ হার্ডলি অ্যাকসেপ্টেবল। আমি হাসলাম, তর্ক করলাম না।
তিনি এবারে প্রশ্ন করলেন, আপনার সময়ে সুলতান আহমদ ভূঁইয়া নামে একজন টিচার অ্যাপয়েনটেড হন। তাঁর তো অ্যাকাডেমিক কেরিয়ার ভালো নয়। হাউ ওয়াজ ইট পসিবল?
সুলতান আহমদ ভূঁইয়া আমাদের উপাচার্য আবদুল করিমের সহাধ্যায়ী ছিলেন, তবে এমএ পাশ করেছিলেন পরে, ১৯৫১ সালে। তার পরীক্ষার ফলাফল তেমন ভালো ছিল না, কিন্তু যাকে আমরা বলি মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য-বিশেষ করে সে-সময়কার মুসলমান কবিদের বিষয়ে তিনি ভালো জানতেন। ছাত্রাবস্থায় মাহে নও পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন, সুকুমার সেনের বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাসে তার উল্লেখ আছে। পরে তিনি যশোর ক্যাডেট কলেজে এবং বেসরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেছিলেন। আবদুল করিম উপাচার্য হওয়ার পরে তিনি তাকে ও আমাকে একই সঙ্গে চিঠি লেখেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তার নিয়োগ হতে পারে কি না, তা জানতে চেয়ে। তার বিশেষজ্ঞতা আমাদের কাজে আসবে ভেবে আমি আগ্রহ প্রকাশ করি। উপাচার্য এতে স্বস্তি পান। আমরা তাঁকে চাকরির জন্য আবেদন করতে উৎসাহিত করি। তিনি নিয়োগলাভ করেন।
মনে হয়, এটা অনিয়ম বিবেচনা করে, আমাদের কোনো সহকর্মী এদিকে তদন্ত কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। আমি কমিশনকে ওপরের কথাগুলো বলি। নিজের দায়িত্ব স্বীকার করি। কমিশনকে বোধহয় ধারণা দেওয়া হয়েছিল যে, উপাচার্যের ইচ্ছা আমি পূরণ করেছি মাত্র। সেটা যে ঠিক নয়, সে কথা আমি কমিশনকে জানাই।
সুলতান আহমদ ভূঁইয়া অবশ্য আমাকে হতাশ করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার পরে গবেষণায় তাঁর আর আগ্রহ দেখা যায়নি। আমি তাকে শেখ। চাঁদের কাব্য সম্পাদন করার পরামর্শ দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, পিএইচডি ডিগ্রি লাভের উদ্দেশ্যে অথবা গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশের লক্ষ্যে কাজটি তিনি করতে পারেন। তিনি আগ্রহ দেখিয়েছিলেন, কিন্তু কাজে প্রবৃত্ত হননি। তাঁর নিজস্ব ক্ষেত্রে ছাত্র বা সহকর্মীদেরও আগ্রহী করে তুলতে পারেননি।
কমিশন এ-বিষয়ে কী বলেছিলেন, তা আমার জানা হয়নি। তদন্তের রিপোর্ট বেরিয়েছিল কি না তা-ই মনে পড়ে না।
এর মধ্যে জানলাম, ড. মুহম্মদ এনামুল হক বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন অধ্যাপক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছেন।
কিছুকাল আগে শিক্ষক-নির্বাচনের কাজে এনামুল হক চট্টগ্রাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলেন। তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের। পদে তাঁর নিয়োগের আকস্মিক অবসান ঘটেছে। কথায় কথায় তিনি আমাকে বললেন, তিনি যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার নিয়োগের বিরোধিতা। করেছিলেন, তার কারণ এই নয় যে, আমার প্রতি তাঁর মনোভাব প্রতিকূল কিংবা আমার লেখাপড়া সম্পর্কে তাঁর মনে সন্দেহ আছে। তিনি বাধা দিয়েছিলেন, কেননা আমি নিয়মমাফিক আবেদন করিনি। সুতরাং তিনি আশা করেন, তাঁর প্রতি আমি ক্ষোভ পোষণ করব না। আমি বললাম, ‘সার, আমার আচরণে কি আপনার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে কখনো? তিনি বিব্রত হয়েই বললেন, ‘না, আমি তা বলি না।’
এরপরে উপাচার্য আমাকে বলেন যে, জীবনের শেষ দিনগুলো জন্মভূমি চট্টগ্রামে কাটাতে পারলে এনামুল হক খুশি হবেন। এ-বিষয়ে আমরা কি কিছু করতে পারি?
আবুল ফজল তখন শিক্ষা ও সংস্কৃতি-বিষয়ে রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা। তিনিও চেয়েছিলেন এনামুল হক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আসুন।
এনামুল হককে বাংলা বিভাগে নিয়োগদানের একটা প্রস্তাব আমি উপাচার্যের কাছে পাঠাই। সে-বিষয়ে চূড়ান্ত কিছু হওয়ার আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি অধ্যাপক হিসেবে যোগদানের আমন্ত্রণ পান। তিনি সেটাই গ্রহণ করেন। নানা কারণে ঢাকায় থাকাই তাঁর পক্ষে সুবিধাজনক বলে তিনি মনে করেন।
