আমাদের বন্ধু অর্জুন সেনগুপ্ত ব্রাসেলসে ভারতের রাষ্ট্রদূত ছিল। দিল্লিতে সরকারবদলের ফলে তার সে-দায়িত্বের অবসান ঘটেছে। সেও চলে এসেছে। অক্সফোর্ডে।
অক্সফোর্ডে গেলে সব সময়ে ভালো লাগতো। এখন সময়টা আরো জমিয়ে কাটে।
তপন রায়চৌধুরীর অধীনে পিএইচি ডি ডিগ্রির জন্যে গবেষণা শুরু করেছেন হামিদা হোসেন। যদিও ছাত্রী তিনি ইংরেজি সাহিত্যের, তবে ইতিহাসের গবেষণায় তা বাধা হয়নি। তাঁর বিষয় : বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দাদন নেওয়া তাঁতিদের অবস্থা। গবেষণার কাজে তিনি আসেন ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে। আমি যেসব চিঠিপত্র ঘাঁটছি, তা তার কাজে আসে। তিনি আমাকে কিছু প্রাসঙ্গিক সূত্রের খবর দেন, তা আমার কাজে লাগে।
ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিরাজুল ইসলাম ও শরীফউদ্দীন আহমদ নিয়মিত আসেন, আসেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. সুশীল চৌধুরী। কিংস কলেজের পিটার মার্শাল আসেন, আমার কাজকর্মের খবর নেন।
তার নতুন বই বেরিয়েছে East Indian Fortunes–আমি তা সংগ্রহ করি।
লাইব্রেরিতে একদিন একটি ভারতীয় মেয়ে বললো, আপনাদের রাষ্ট্রপতির মেয়ে থাকে আমাদের হস্টেলে। আমার কাছ থেকে আপনার কথা জেনে সে যেতে বলেছে আপনাকে।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করেছে নিগার। এখন লন্ডনে এসেছে উচ্চশিক্ষা বা প্রশিক্ষণ নিতে। গেলাম তার কাছে। গল্পসল্প হলো। রাজনীতির কথা হলো খুবই সামান্য। মনে হলো, বিচারপতি সায়েম খুব ভালো অবস্থায় নেই।
সোয়াসে যাই। প্রফেসর স্মিথ সৌজন্য প্রকাশ করেন, তবে আমার কাজে তাঁর কোনো আগ্রহ নেই। আমি সাহিত্যের ছাত্র হয়ে কোম্পানির কাগজপত্র নিয়ে এত উৎসাহী কেন, তিনি তা বুঝে পান না।
তারাপদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কিছু সময় কাটাই। রাজেশ্বরী দত্তের ঘরটা বন্ধ–কাউকে তা বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। সেদিকে তাকিয়ে আমি দীর্ঘশ্বাস চাপি। তারাপদর বাড়িতে দেখা হয় সস্ত্রীক অমর্ত্য সেনের সঙ্গে।
নাজিয়ার সঙ্গে দেখা হয়ে যায় সোয়াসে। সাজ্জাদের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে সে এক বয়স্ক ব্রিটিশকে বিয়ে করেছে। তাদের বাড়ি যাই একদিন।
লাইব্রেরির কাজ তিন মাসে শেষ হয় না–আরো এক মাস লেগে যায়। চলে আসার আগে জোন ল্যানকাস্টার আমার সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেন। বাস্তবিকই ভোজ–পাঁচটি কোর্স অন্তত, দুরকম ওয়াইন। লাইব্রেরির ওপর দিকের তিন-চারজন কর্মকর্তার সঙ্গে মাইকেলও আমন্ত্রিত। আমি খুব সম্মানিত বোধ করি।
৩০ জুলাই দেশের পথে রওনা হই।
১৭.
এর মধ্যে দেশে অনেক কিছু ঘটেছে।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিচারপতি সায়েম প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশে সাধারণ নির্বাচন হবে। হঠাৎ করেই মওলানা ভাসানী বললেন, দেশবাসী এখন নির্বাচন চায় না। তাহলে কি তারা চায় সামরিক শাসন চলুক? এ-প্রশ্ন ওঠার বা তার জবাব দেওয়ার আগেই মওলানা মৃত্যুবরণ করলেন। আর কী আশ্চর্য! তার পরপরই নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করলেন রাষ্ট্রপতি। বললেন, যথেষ্ট সময় নেই। তারপরই তিনি প্রধান সামরিক শাসকের দায়িত্ব হস্তান্তর করলেন উপ-প্রধান সামরিক প্রশাসক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের কাছে। কয়েক মাস পরে স্বাস্থ্যগত কারণে বিচারপতি সায়েম ত্যাগ করলেন রাষ্ট্রপতির পদ। জিয়া রাষ্ট্রপতি হলেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিলেন ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচন-অনুষ্ঠানের, আর ৩০ মে। রাষ্ট্রপতিপদে গণভোটের। তিনি তো স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে খালখনন, খালনদী পুনঃখননের কর্মসূচি দিয়েছিলেন আগে, এখন ১৯ দফা কর্মসূচি দিলেন। তার প্রতি বড়রকম সমর্থন জানালেন মোহাম্মদ তোয়াহা, জিয়ার কাজকর্মের মধ্যে তিনি খুঁজে পেলেন সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা। জিয়াউর রহমান সামরিক ফরমানবলে সংবিধান সংশোধন করলেন–সংবিধানের সূচনায় সংযোজন করলেন বিসমিল্লাহ, প্রস্তাবনায় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের বদলে আনলেন স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ, ধর্মনিরপেক্ষতার জায়গায় আনলেন সর্বশক্তিমান আল্লাহের উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস, সমাজতন্ত্রের ব্যাখ্যা করলেন অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিচার বলে।
৩০ মে গণভোট হলো। জিয়াউর রহমান প্রায় ৯৯ শতাংশ হাঁ-ভোট পেলেন। যেদিন এ খবর পাওয়া গেল, সেদিন ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরির ওয়াশরুমে হাত ধুচ্ছি, এক মধ্যবয়সী ইংরেজ জানতে চাইলেন, ‘তোমাদের রাষ্ট্রপতি শতকরা ১০০ ভাগ ভোট পেলেন না কেন–তোমার মতো দু-চারজন। দেশের বাইরে আছে বলে?’ গণভোটের পরে তাঁর প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করলেন খান আবদুস সবুর খান ও আতাউর রহমান খান।
আরো একটা মজার ব্যাপার ঘটলো। জুনে জিয়া কমনওয়েলথ সম্মেলনে যোগ দিতে এলেন লন্ডনে। সঙ্গে পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহম্মদ শামসউল হক। প্রচারমাধ্যমে দেখি তার পরিচয় দেওয়া হয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এ-দেশে উপদেষ্টার কোনো অর্থ হয় না, তাই মন্ত্রী না হলেও তাঁকে অভিহিত করা হচ্ছে মন্ত্রী বলে।
বিচারপতি আবদুস সাত্তার উপরাষ্ট্রপতি নিযুক্ত হয়েছেন। উপদেষ্টামণ্ডলীর কেউ কেউ পদত্যাগ করেছেন–যেমন, হাফিজউদ্দীন, আকবর কবির। নতুন উপদেষ্টা নিযুক্ত হয়েছেন আমার বন্ধু মোজাফফর আহমদ, আত্মীয় জামালউদ্দীন আহমদ, বহুদিনের পরিচিত শামসুল হুদা চৌধুরী ও আবদুল মোমেন খান।
