সেই থেকে উভয়ের অবসরের সময়টা মিলে গেলে আমাদের সাক্ষাৎ হয়েছে। হয় আমি তার বাড়ি গিয়েছি, নয় ওয়ালথামসটো আন্ডারগ্রাউন্ডের বাইরে অপেক্ষা করেছি–বুলু সার্জারিফেরত তুলে নিয়েছে। কখনো আমরা অন্যত্র মিলিত হয়েছি। বইপড়ার যথেষ্ট সময় না পেলেও বুলু বই কিনতে ভালোবাসততা, সিনেমা-থিয়েটারে যেতে চাইতো। পাবে বসতে বা বাইরে খেতেও সে আগ্রহী ছিল। এর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হয় একা যাওয়া যায় না বা একা যেতে ভালো লাগে না। তার সঙ্গে রুচির মিল থাকায় এসব জায়গায় একসঙ্গে যাওয়া আমরা উপভোগ করেছি। অনেক সময়ে–বিশেষ করে সে ‘অন কল’ থাকলে–তার বাড়িতে বসে গল্প করেছি, কখনো তার রান্না খেয়েছি, কখনো বাইরে থেকে খাবার এনে খাওয়া হয়েছে।
গাড়িচালনায় বুলু ক্লান্তিহীন। কখনো কখনো এতটা পথ আমাকে পৌঁছে দিয়েছে। তবে সাধারণত আমি নিজের মতোই ফিরেছি। একবার গল্প করতে করতে টিউব-চলাচলের সময় উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়ায় ট্যাকসি নিতে হয়।
আরেকবার ফিরতি ট্রেনে খানিকক্ষণ চলার পরে টের পাই, ঘরের বাইরের দরজার চাবি আনতে ভুলে গেছি। মোমেনরা আগেভাগে শুয়ে পড়েন। অত রাতে ঘুম থেকে তাদের জাগিয়ে আমার বাড়ি ফেরার কথা নয়। সুতরাং পথে নেমে চলে গেছি বুশ হাউজে। বিবিসির ভোরের বাংলা অনুষ্ঠান করতে যিনিই আসেন, তাঁর বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া যাবে। গিয়ে দেখি, সেদিন শফিক রেহমানের পালা। আমার সংকটের কথা বলতে তিনি বললেন, আজই আমাদের বন্ধু মোকাম্মেল হক এসেছে তার নবপরিণীতাকে নিয়ে। ছেলের ঘরটা তারা নিয়েছে। আরেকটা বাড়তি ঘরে আমার জায়গা হতে পারে, তবে সেটা হয়তো আরামদায়ক হবে না। বললাম, এক রাতের জন্যে এমনকী আর অসুবিধে হবে!
রাতটা কাটিয়ে সকালে নাশতা খেয়ে সবার কাছে বিদায় নিলাম। মোকাম্মেলের স্ত্রী তালেয়ার সঙ্গে পরিকল্পনা করতে থাকলো দোকানে যাওয়ার এবং বিনোদন সন্ধান করার আগ্রহে।
বুলুর ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে আমি কোনো কৌতূহল প্রকাশ করিনি। ফলে একটু একটু করে সে-ই অনেকটা জানাতে থাকে। জীবনের দাক্ষিণ্যলাভ সবার ঘটে না। কেউ কেউ সেই ক্ষতির পূরণ খোঁজে কাজে ডুবে গিয়ে। দেশে বুলুর মা এবং ভাইবোনেরা আছেন তাদের জন্যে সে কর্তব্যের অধিক করতে চায়। সে সহজে বন্ধুত্ব করে, বন্ধুদের জন্যে নিজেকে উজাড় করে দেয়, মাঝে মাঝে সেখানেও ধাক্কা খায়। ফলে তার স্বভাবের একটা দিক স্পর্শকাতর হয়ে থাকে।
মানসীদের সঙ্গে বুলুর আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে, দীপংকর ঘোষদের সঙ্গে আছে আগে থেকে যোগাযোগ। সিরাজুর রহমানের সঙ্গে পরিচয় আছে, সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গেও আছে আলাপ। বিবিসি ক্লাবে আসে সে, তবে কদাচিৎ, নাজির আহমদ তাকে খুব পছন্দ করেন।
তার বাড়িতে আত্মীয়স্বজন-বন্ধুবান্ধব অনেক আসেন। তাঁদের অনেকের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে। আমার বিশেষ ভালো লাগে রানা বলে তার দূরসম্পর্কের এক ভাইকে।
এবারে লন্ডন থেকে ফেরার পূর্বমুহূর্তে রবীন্দ্রনাথের কবিতার চরণ মনে পড়েছে : প্রবাসের দিন মোর পরিপূর্ণ করি দিলে, নারী,/ মাধুর্যসুধায়। মনে মনেই তা বলেছি, কারো সামনে উচ্চারণ করিনি। বোধহয় তার প্রয়োজনও ছিল না।
১৫.
আমাদের ফুপা, পুলিশের ডিআইজি, আবু কামাল লন্ডনে এসেছেন সরকারি কাজে। কাজ সারার পর দিন দুই সময় আছে তার হাতে। ওই দুদিন আমি তার সঙ্গে ঘুরি। দ্রষ্টব্য কিছু দেখাতে নিয়ে যাই অথবা কেনাকাটায় সাহায্য করি।
অক্সফোর্ড স্ট্রিট দিয়ে চলতে চলতে হঠাৎ চোখে পড়ে, অনিরুদ্ধ রায় বসে আছে এক রেস্টুরেন্টে। একই টেবিলে এক শ্বেতাঙ্গিনী ও একটি শিশু।
ফুপাকে বলি, চলুন, এখানে চা খেয়ে নিই। তারপর দ্রুত অনিরুদ্ধের কাছে গিয়ে প্রশ্ন করি, মহিলাকে না হয় বুঝলাম, বাচ্চাটা এলো কোথা থেকে?
অনিরুদ্ধ চমকিত, আমাকে দেখে বিস্মিত ও আনন্দিত, আমার প্রশ্ন শুনে হেসে কুটিকুটি। প্যারিসে যাচ্ছে সে লাইব্রেরি ও আর্কাইভসে বইপত্র ঘাঁটতে। যাওয়ার পথে লন্ডনে থেমেছে। আরো দু-একদিন থাকবে। আছে ইন্ডিয়ান ওয়াইএমসিএ-তে।
ফুপার কাজ শেষ করে সপ্তাহান্তটা ব্যয় করি অনিরুদ্ধের সঙ্গে। আনন্দদায়ক সময় কাটে।
তখন মারারজী দেশাই ভারতের প্রধানমন্ত্রী। লন্ডনে ভারতীয় ছাত্রদের সভায় তিনি বক্তৃতা দিয়েছেন। অনিরুদ্ধ যায়নি সেখানে, তবে তার সহবাসীদের কাছে বিবরণ শুনেছে। প্রথমে তো মোরারজী তাঁর বিখ্যাত ব্যবস্থাপত্র দিয়েছেন স্বাস্থ্য ভালো রাখার। তারপর ব্রিটেনে বর্ণবাদী মনোভাব সম্পর্কে এক শ্রোতার অভিযোগের জবাবে দিয়েছেন সহজ সমাধান : ইউ লাভ দেম, দে উইল লাভ ইউ।
আমি যে লন্ডনে কাজের কিছু করছি, অনিরুদ্ধ তা স্বীকার করে না। বলে, ওসব আমার বেড়াতে আসার ছল।
যাওয়ার আগে সে আমাকে একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিলো। বললো, দোকানে গিয়ে কাপড়টা পালটে নিয়ে তার কাছে যেন ডাকযোগে পাঠাই প্যারিসে। ইচ্ছে না থাকলেও কাজটা করতে হলো।
প্যারিস অনিরুদ্ধের দ্বিতীয় শহর। কারো ভারত ভ্রমণকাহিনি নিয়ে কাজ করছে তখন সে। কাজটা করে খুব সুখ পাচ্ছে।
১৬.
কামাল হোসেনরা অক্সফোর্ডে আছেন। এর মধ্যে রেহমান সোবহান এসে সেখানে যোগ দিয়েছেন কুইন এলিজাবেথ হাউজে। কুইন এলিজাবেথ হাউজ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন নূরুল ইসলাম–এফএওতে একটা বড়ো পদে যোগ দেবেন, থাকবেন রোমে। ওদিকে মুশারফ হোসেনও চলে এসেছেন অক্সফোর্ডে।
