আমি এসব চিঠির সার-সংকলন করতাম ইংরেজিতে। চিঠির ওপরে ইংরেজিতে কিছু নোট রাখতেন ফ্যাক্টর বা তাঁর অধীন কোনো ইংরেজ কর্মচারী। সেগুলো কাজে লাগতো। একবার ferretted শব্দ দেখে খুব বিভ্রান্ত হয়েছিলাম। যখন নতুন-পুরোনো কোনো ইংরেজি অভিধানে তা খুঁজে পেলাম না, তখন বুঝতে পারলাম, ওটা ফেরত শব্দের সাহেবি রূপ। লাইব্রেরিতে বসে যা নোট করি, বাড়ি এসে সেসব গুছিয়ে পরিষ্কার করে লিখি। তারপর মাইকেল ও’কিফের হাতে দিই। লাইব্রেরির টাইপিস্টকে দিয়ে টাইপ করিয়ে সেগুলো সে। আমাকে দেয়। আমি আবার বাড়িতে বসে সংশোধন করি। তারপর চূড়ান্তভাবে টাইপ হয়। ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে মাইকেল ছিল আমার প্রধান সহায়। দুই উপপরিচালক মার্টিন ময়ার ও আর, ডেসমন্ড খোঁজখবর নিয়ে এবং অন্যভাবেও সাহায্য করেন। পুরোনো মানচিত্র থেকে আড়ংয়ের অবস্থানগুলো দেখিয়ে দেন। অ্যানড্র কুক।
লাইব্রেরির সলিম কুরেশি একদিন স্যান্ডউইচের দোকানে পরিচয় করিয়ে। দেন বেলুচিস্তান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক বাললাচের সঙ্গে। আমার পরিচয় দিতেই বালোচ প্রশ্ন করলেন, তোমরা শেখ মুজিবকে মারলে কেন? আমি এ-প্রশ্নের জন্যে তৈরি ছিলাম না। কী বা বলতে পারি তার উত্তরে। সলিম বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর নৃশংসতার প্রতিবাদ করায় বালোচকে জেল খাটতে হয়েছিল। এমন লোককে কি বলা যায় যে, তোমার মানবিক মূল্যবোধ বৃথা হয়েছে বাংলাদেশে। বালোচ গবেষণা করছিলেন জার্মানিতে। তার উপকরণ সংগ্রহ করতে গ্রীষ্মকালে এসেছেন লন্ডনে। পরে ১৯৭৯ সালে তাঁর সঙ্গে আমার আবার দেখা হয়েছিল, সেকথা যথাস্থানে।
সেই স্যান্ডউইচের আড্ডায়ই এক তরুণ ইংরেজ আমাকে বলেছিল, তার বাড়িতে মাদকের আসর বসে মাঝে মাঝে। আমি গেলে সে স্বাগত জানাবে। শুনে মোমেন বললেন, অভিজ্ঞতাসঞ্চয়ের জন্যে যেতে পারেন। আমি সাহস করিনি।
১৩.
বিবিসির বাংলা বিভাগ থেকে তখন কমল বোসের বিদায় নেওয়ার পালা। সেই কবে এসেছিলেন, তিনি যে একদিন থাকবেন না বিভাগে, কারো তা মনে হয়নি। তার বিদায়-উপলক্ষে বেশ কটি পার্টি হলো। আমি প্রায়ই উপস্থিত থাকলাম।
সিরাজুর রহমান এখন কমল বোসের জায়গাটি নিলেন–জন ক্ল্যাপহামের পরেই তার স্থান। তিনি আমাকে অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ডাকেন। ডাকেন দীপংকর ঘোষ, সৈয়দ শামসুল হক, শ্যামল লোধ। নূরুল ইসলাম আমাকে দিয়ে ছোটোদের জন্যে তিন মাসের কথিকা একসঙ্গে রেকর্ড করিয়ে নিলেন। তেরোটা কথিকা একসঙ্গে রেকর্ড করলাম–পানি না খেয়ে, স্টুডিওতে যে-মেয়েটি কাজ করে, সে নাকি একটু অবাক হয়েছিল তাতে।
সৈয়দ হক সবে পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় রচনা শেষ করেছেন। আমি তার পাণ্ডুলিপির প্রথম পাঠক। কিছু পরামর্শ দিই নাট্যকারকে। তিনি অনেকখানি গ্রহণ করেন।
বিবিসির অনুষ্ঠান করতে গিয়ে অনেকের সঙ্গে দেখা হয়, নিচের তলায় বিবিসি ক্লাবে আড্ডা হয় অনেকের সঙ্গে। মানসী বড়ুয়া ও সেই সূত্রে সরোজ বড়ুয়ার সঙ্গে স্থায়ী সম্পর্কের সূচনা হয়ে গেল। মানসী তার বাড়িতে একদিন খাওয়াবে আমাকে, আমি লন্ডন ছাড়ার আগে। কিন্তু হঠাৎ সে সড়ক-দুর্ঘটনায় আহত হলো ভয়ংকর। হাসপাতালে দেখতে গেলাম। মানসী কাঁদো-কাঁদো হয়ে বলে, আনিস ভাই, তোমাকে আমার খাওয়ানো হলো না।
আমি বলি, ‘এবার না হোক, আবার হবে।’
আমার কথা ঠিক হয়েছিল।
১৪.
আগেরবার যখন লন্ডনে ছিলাম, তখন নবনীতা দেবসেন তার বন্ধু ডা. অমেয়া দেবার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিল। নবনীতার মতো অমেয়া নামটিও, শুনেছিলাম, রবীন্দ্রনাথের দেওয়া। তবে নবনীতা দেব, আর অমেয়া দেবা। দেব না হয়ে দেবা কেন, তা কি ইংরেজি বানানের মর্যাদা রক্ষা করতে–কেউ কেউ পরে জানতে চেয়েছিলেন আমার কাছে। বলেছিলাম, ইংরেজি বানান নয়, সংস্কৃত উচ্চারণ রক্ষা করতে। বাংলায়ও সে-উচ্চারণ অটুট আছে ‘যেমন দেবা তেমনি দেবী’ এই প্রবাদবাক্যে। অমেয়ার ডাকনাম বুলু। বহুকাল ধরে সে লন্ডনে। জিপি অর্থাৎ জেনারেল প্র্যাকটিশনার।
এবারে গিয়ে ফোন করতেই বুলুর সাদর আহ্বান। সে থাকে পূর্ব লন্ডনে–আমরা যাকে পূর্ব লন্ডন বলে শনাক্ত করি, তার কিছুটা উত্তরে–এক চারতলা বাড়ির তিনতলার ফ্ল্যাটে। সাউথ উডফোর্ড আন্ডারগ্রাউন্ডে নেমে একটু হেঁটে যেতে হয়। সেখানে গিয়ে দেখা গেল আসবাব আর বইপত্রে ঠাসা ঘর। পরে জানা গেল বাংলা গান ও পাশ্চাত্য সংগীতের বিশাল সংগ্রহ তার। বুলু নিজে রান্না করেছিল। কিন্তু যা খেলাম, তার অনেকখানিই উদ্গিরণ করে দিলাম। ডাক্তারের বাড়ি, সুতরাং সঙ্গে সঙ্গে ওষুধও খেতে হলো। আমার লজ্জার মাত্রা তাতে একটু বাড়লো।
বুলু লন্ডনের ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদক। ইউরোপে কোনো সম্মেলনে অচিরে ব্রাহ্মধর্ম সম্পর্কে তার প্রবন্ধ পড়ার কথা। এই প্রসঙ্গে ব্রাহ্ম-আন্দোলন সম্পর্কে কিছু বাক্যবিনিময় হলো। আমি যতদূর জানতাম, তার প্রায় সবটাই বলা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাতে বুলুর ভুল ধারণা হলো যে, এ-বিষয়ে আমি অনেক জানি, যা প্রকাশ করেছি তা সামান্যমাত্র। সুতরাং তার দিক দিয়ে আলোচনার একটা তাগাদা রয়ে গেল। আবার যাওয়ার আমন্ত্রণটা আর লৌকিক শিষ্টাচারে সীমাবদ্ধ রইল না।
