আমি প্রলুব্ধ হলাম। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করলাম লন্ডন যাওয়া-আসার বিমানভাড়া চেয়ে। উপাচার্যের সুপারিশসহ সে-আবেদন হাতে হাতে নিয়ে গেলাম অধ্যাপক এম এ বারীর কাছে। তিনি খুব উৎসাহী হলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে বললেন, কমিশন থেকে এজন্যে অর্থ-মনজুরি সম্ভবপর, তবে আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে কিছু সময় লাগবে।
আবদুল মোমেন ততদিনে লিডসের পাট চুকিয়ে লন্ডনে চলে এসেছেন। সপরিবারে। তাঁকে লিখলাম মাথা গোঁজার একটা ঠাই ঠিক করে দিতে। তিনি পত্রপাঠ লিখলেন, তাঁদের সঙ্গে আমি অনায়াসে থাকতে পারি।
১৯৭৭ সালের ২৫ মার্চ সকালে হিথরো বিমানবন্দরে পৌঁছালাম। সেখান থেকে একটা ট্যাক্সি নিয়ে গেলাম লন্ডনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ল্যাম্বল স্ট্রিটে মোমেনের কাউন্সিল-ফ্ল্যাটে। তিনি ছিলেন না। রোজী হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানালেন, কৌতূহলের সঙ্গে রঙ্গন। মোমেন সর্বক্ষণের চেয়েও বেশি সময় কাজ করেন ক্যামডেন কাউনসিল ফর রেস রিলেশনসে। রোজী কাজ করেন। খণ্ডকাল। ছেলে স্কুলে যায়। প্রকৃতপক্ষে ছেলের ঘরই আমি অধিকার করলাম। সে গেল বাপ-মার ঘরে।
সপ্তাহের দিনগুলোয় সকালবেলায় নাশতা খেয়ে চলে যেতাম লাইব্রেরিতে। সেখান থেকে কোনোদিন বিবিসি হয়ে, কোনোদিন আর কোথাও গিয়ে, কোনোদিন সিনেমা-থিয়েটার দেখে রাতে ফিরতাম। ফিরে কখনো একা, কখনো একসঙ্গে, চা-কফি খেতাম। শনিবারে মোমেনদের সঙ্গে বাজারে যেতাম, আমিও টুকটাক কিছু কিনতাম এবং তাঁদের সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া সারতাম। রঙ্গনের সঙ্গে আমার একটা লেনদেনও চুকিয়ে ফেলতে হতো সেদিনে। সে বুদ্ধিমান, চঞ্চল ও কৌতুকপ্রবণ। তার চাঞ্চল্য নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আমি প্রস্তাব করলাম, তার সেবার জন্যে সে এক পেনি করে পাবে, আর আমার সঙ্গে দুষ্টুমি করলে তার এক পেনি জরিমানা হবে। যেমন, সকালে সে আমাকে চিঠি এনে দিলে তার হিসেবে এক পেনি জমা হবে, আবার পায়ে-পা দিয়ে আমাকে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করলে তার এক পেনি জরিমানা হবে। এই যোগ-বিয়োগের পরে যা তার প্রাপ্য হতো, সেটা তাকে দেওয়া হতো শনিবারে, বাজারে গিয়ে। তা দিয়ে সেখানেই সে কিছু কিনে নিতো। জরিমানা দিতে তার আপত্তি ছিল না, তবে সে খেয়াল রাখতো যাতে সপ্তাহান্তে তার হাতে কিছু জমা পড়ে। আয় বাড়াবার চেষ্টাও তার ছিল। যেদিন দুটো চিঠি আসততা, সেদিন সে জানতে চাইতো তার পাওনা এক পেনি হলো, না দুই পেনি। আমি বলতাম, এটা একবারের সেবা, অতএব এক পেনি। সে মেনে নিয়ে চলে যেতো। যে-সপ্তাহে সেবা বেশি হতো, সে-সপ্তাহে তার জরিমানা দেওয়ার প্রবৃত্তিও একটু বাড়তো।
আমি একবার আমার ছাত্রী নাসরীন ওরফে হেলেনের বাড়িতে এই ব্যবস্থার কথা বলেছিলাম। কদিন পরে সে বললো, সার, কী গল্প আপনি করে এলেন! এখন কোনো কাজ করতে বললে আমার মেয়ে বলে, এক পেনি দিতে হবে।’
মোমেনদের বাড়িতে আমি মহা-আনন্দে ছিলাম। তার একটা প্রধান কারণ, তারা আমাকে অতিথি জ্ঞান করতেন না। আমি নিজের মতো থাকতাম এবং আসা-যাওয়া করতাম।
একরাতে বাড়ি ফিরে আমি ইলেকট্রিক কেতলি চালু করে দিলাম। আমার মনে হয়েছিল, তাতে পানি আছে, আসলে ছিল না। ফলে সেটা নষ্ট হয়ে গেল এবং আমি খুব বিব্রত বোধ করলাম। একজনের নাম করে মোমেন বললেন, ‘আমি তাঁর ইলেকট্রিক কেটল এরকম নষ্ট করে ফেলেছিলাম। উনি বলেছিলেন, সারিয়ে আনলেই হবে।
আমি পরদিন মোমেনদের কেতলি সারিয়ে এনেছিলাম।
মোমেনের কাজ ছিল ক্যামডেন এলাকার শ্রমজীবী বাঙালিদের দেখাশোনা করা। তার সঙ্গে অমন এক-আধজনের বাড়িও গিয়েছি। বাড়ির লোকদের সঙ্গে তেমন কথাবার্তা হয়নি। মোমেনের কাছে লন্ডনের রেস্টুরেন্ট-কর্মী অনেক আসতেন। এঁরা লন্ডনের নানা এলাকায় থাকতেন ও কাজ করতেন। তাঁদের সঙ্গে আমারও ভালোই আলাপ হতো। কর্মীদের সমবায়ভিত্তিক মালিকানায় রেস্টুরেন্ট চালাবার সম্ভাবনা সম্পর্কে তারা আলাপ করতেন। তাঁদের সে-প্রয়াস পরে সফল হয়েছিল।
মোমেনের সহকর্মীদের কারো কারো সঙ্গে পরিচয় হয়। সামিন ছিলেন সালমান রুশদির বোন। জ্যান ড্রাইডেন দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গিনী। বর্ণবৈষম্যের দেশ ছেড়ে এসেছে, লন্ডনে কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে কাজ করে প্রায়শ্চিত্ত করছে অন্যের হয়ে। আশা করছে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব পাবে।
মোমেনের কাজ চিত্তাকর্ষক, সহকর্মীরাও আন্তরিক। তাই কাজে ডুবে থাকা তার পক্ষে সহজ। তিনি স্কোয়াটারদের পক্ষে, আমি দোমনা। গৃহহীনদের প্রতি আমার সহানুভূতি আছে, কিন্তু দল বেঁধে অন্যের সম্পত্তি দখল করা! তিনি। নিজের বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দেখান, আমি শুনি।
এমনি করে মোমেনের কাছ থেকে চিন্তা-উদ্রেককারী অনেককিছু শুনতে পাই।
১২.
ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে বসলাম চিঠিপত্রের খাতা নিয়ে। ঢাকা কুঠির অধীনে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও ত্রিপুরায় কোম্পানির আটটি আড়ং ছিল। এ আড়ং মেলা নয়, কোম্পানির ফরমাশমতো কাপড় বুনে তাঁতিরা এখানে জমা দিয়ে দাম বুঝে নিতো। ফরমাশ আসততা লন্ডন থেকে কলকাতায়, সেখান থেকে ঢাকা কুঠিতে, কুঠি থেকে আড়ংয়ে। আড়ংয়ের গোমস্তা দাদন দিয়ে কাপড় তৈরি করাতেন। কাপড় বিন্যস্ত হতে পাঁচ শ্রেণিতে। গোমস্তার মনঃপূত না হলে একশ্রেণির কাপড় হয়তো নেওয়া হতো তার নিচের শ্রেণিতে, নয়তো ফেরত দেওয়া হতো। তাঁতির পাওনা থেকে দাদনবাবদ দেওয়া টাকার হিসাব বাদ দিয়ে যদি তার কিছু প্রাপ্য হয়, পেতো। নইলে নতুন করে দাদন নিয়ে সে কোম্পানির কাছে বাঁধা পড়ে থাকতো। এক আড়ংয়ে একবার ঢাকা থেকে যে-পরিমাণ টাকা গিয়েছিল, টিক সেই পরিমাণ টাকাই আদায় হিসেবে ফিরে আসে। দাদন নেওয়া তাতি অন্য কারো কাছে কাপড় বেচতে পারতো না। সে মারা গেলে কোম্পানি তার ঘটিবাটি বেচে দাদনের টাকা আদায় করতো। গোমস্তারা যে পরিমাণ কাপড় আদায় করতে চাইতো, তা-অনেক সময়ে তাঁতি দিতে পারতো না। তখন সে পরিবার-পরিজন নিয়ে পালিয়ে যেতো, পেশা বদল করে অন্য কোথাও বসবাস করতো।
