আমাদের ভাগটা ঠিক জাতীয় রাজনীতিকেন্দ্রিক ছিল না, আবার একেবারে রাজনীতিবর্জিতও ছিল না। মোটের ওপর যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের, অন্তত ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক আদর্শের পক্ষের, তাঁরা একদিকে ছিলাম। আমাদের মধ্যে আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, জাসদ, সিপিবির সমর্থক ছিলেন, চীনপন্থী রাজনীতির সমর্থক ছিলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক নন-এমনও অনেকে ছিলেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে কী হওয়া উচিত, কী হওয়া উচিত নয়, এটাই ছিল তাৎক্ষণিক চিন্তার বিষয়। এই ভাগাভাগি তিক্ততার সৃষ্টি করেনি–অন্তত অনেকদিন পর্যন্ত। মোহাম্মদ আলীকে আমি অনেক সময়ে তাঁর বাড়ি থেকে কলাভবনে অথবা কলাভবন থেকে বাড়ি পৌঁছে দিতাম আমার গাড়িতে। কলা অনুষদের ডিনের নির্বাচনে যেদিন আমি তার কাছে হেরে যাই, সেদিনও তাকে অফিস থেকে বাড়ি পৌঁছে দিতে চেয়েছিলাম। বলা যায়, প্রতিযোগিতা-প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও সৌজন্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখার একটা চেষ্টা ছিল। তবে শেষরক্ষা করা যায়নি।
ক্যাম্পাসের বাইরে আমাকে অনেক সময় দিতে হতো। ঢাকায় নানাকাজে আসতে হতো, কদাচিৎ রাজশাহীতেও যেতাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে, তার চাইতে বেশি যাওয়া হতো কুমিল্লায় ‘অলক্তে’র নানা উপলক্ষে। তবে চট্টগ্রাম শহরে আসতাম বেশ ঘন ঘন। বন্ধুদের মধ্যে আবদুল আলী তো ছিলেনই, ১৯৭৩ সালে যুগ্ম কর কমিশনার হয়ে মোহাম্মদ আলী এলো–সে থাকলো টানা ছয় বছর। তার আগ্রাবাদের সরকারি বাসভবন বন্ধুদের আড্ডার একটা ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ালো। আমার ভাগ্নি সেলিমা ও ভাগ্নিজামাই আফজালের নাসিরাবাদের বাড়িতে যেতাম। হাবিবুল্লাহ খান ও সালমা খান-দম্পতি আপ্যায়ন করতে ভালোবাসতেন–তাঁদের বাড়িতে বড়ো বড়ো জমায়েত হতো। সেখানে দুই শিল্পী-দম্পতির সাক্ষাৎ পাওয়া যেতো-রাজিয়া শাহিদ ও শাহিদের এবং চমন আফরোজ কামাল ও শামসুল কামালের। কামালদের বাড়িতেও গেছি। আরেক কামাল-ডা. কামাল এ খানের–আমন্ত্রণও ছিল অপ্রতিরোধ্য।
চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক উদ্যোগের সঙ্গে আমার ছিল নাড়ির যোগ। রবীন্দ্র জয়ন্তী-নজরুল-জয়ন্তী, একুশে ফেব্রুয়ারি-নববর্ষ, স্বাধীনতা দিবস-বিজয় দিবস–এসব পালনের জন্য যত কমিটি হতো, তাতে আমি সক্রিয় থাকতাম। এই ধরনের অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা ও পরিবেশনে আবুল মোমেন ও কামাল এ খানের বড় ভূমিকা থাকতো। শামসুল হোসাইন ও মাহবুবুল হকও এসবের সঙ্গে জড়িত থাকতেন। মোমেনের সুচিন্তিত পরামর্শে আমি সবসময়ে উপকৃত হয়েছি।
চট্টগ্রামে যতদিন বাংলাদেশ পরিষদ টিকে ছিল, ততদিন তার অনুষ্ঠানেও যেতাম–মূলত তার পরিচালক ফখরুজ্জামান চৌধুরীর কারণে। তার সঙ্গে আমার প্রীতির সম্পর্ক ছিল, তবে আমার চেয়েও তার অন্তরঙ্গতা ছিল আবু হেনা মোস্তফা কামালের সঙ্গে। বাংলাদেশ পরিষদের বাইরেও আমরা তিনজন মিলিত হতাম। সময় করতে পারলে আমাদের সঙ্গে যোগ দিতেন মুর্তজা বশীর এবং চট্টগ্রামের ডেপুটি কমিশনার হাসনাত আবদুল হাই। চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক জীবনে হাসনাত আবদুল হাইয়ের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল এবং তার উদ্যোগেই সেখানে শিল্পকলা একাডেমী মিলনায়তনের প্রতিষ্ঠা সম্ভবপর হয়েছিল। মনে পড়ে, ফখরুজ্জামান চৌধুরী একবার স্কুটারযোগে শহর থেকে আমার বাড়িতে আসতে গিয়ে যাত্রার প্রায় শেষে এসে স্পিডব্রেকারে গাড়ির গতি শ্লথ না করায় মাথায় আঘাত পেয়েছিলেন। স্কুটার থেকে নেমে ড্রাইভারকে তিনি একটা চড় মেরেছিলেন এবং তার দরুন তাকে দশ টাকা দিয়েছিলেন ভাড়ার অতিরিক্ত। হাসনাত আবদুল হাই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে চট্টগ্রামের জেলা জজ নূরুল ইসলামের সঙ্গে আমার একটা বিরোধ মিটিয়ে দিয়েছিলেন। আমার মুনীর চৌধুরী বইয়ের কোনো মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে জজ সাহেব আমাকে উকিলের চিঠি পাঠিয়েছিলেন।
একবার ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে আসছিলাম বিমানে। সহযাত্রীদের মধ্যে। ছিলেন কবীর চৌধুরী এবং শামসুল কামাল। কুমিল্লা পার হতে হতে বিমানটি দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পড়ে প্রায় ওলট-পালট করতে থাকল। কোনো কোনো যাত্রীর আসনের সামনের ট্রেতে রাখা গ্লাস উড়ে গিয়ে কেবিনের মধ্যে লুটোপুটি খেতে লাগল। ক্রুদের পাংশু মুখ দেখে বিপদের মাত্রা অনুধাবন করতে পারছিলেন যাত্রীরা। শেষ পর্যন্ত আবার ওই দুর্যোগের মধ্য দিয়েই বিমান ফিরিয়ে ঢাকায় নিয়ে এলেন পাইলটেরা। পরে জেনেছিলাম, বিমানের রাডার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল এবং ককপিট থেকে কিছু দেখা যাচ্ছিল না। মহিলা এবং নাবালকদের আগে নামবার সুযোগ দিতে আসনে বসে রইলাম। আমার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ে ১৪-১৫ বছর বয়সের একটি মেয়ে আমার গায়েই বমি করে দিলো। তেজগাঁও বিমানবন্দরের টয়লেটে গিয়ে যতটা-পারা যায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়া গেল। কবীর ভাই যাত্রা বাতিল করে বাড়ি ফিরে গেলেন। শামসুল আলম ফোন করে তার অফিস (গ্ল্যাকসো) থেকে গাড়ি আনালেন। সেই গাড়িতে আমরা দুজন চট্টগ্রামে ফিরে এসেছিলাম–ফেনীতে তাঁর বাড়ি হয়ে।
১১.
লন্ডন থেকে ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরির পরিচালক জোন ল্যানকাস্টারের চিঠি পেলাম। লিখেছেন, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঢাকা কুঠির কাগজপত্রের যে হ্যান্ডলিস্ট আমি তৈরি করে দিয়েছিলাম, সেটা নিয়ে আলোচনা করে তাঁরা ওইসব কাগজপত্রের একটা পূর্ণাঙ্গ তালিকাপ্রণয়নের আবশ্যকতা অনুভব করেন। আমি সে-কাজটা করব কি না, তা জানতে যখন তারা আমার খোঁজ করেন, তখন শোনেন, আমি দেশে ফিরে এসেছি। ব্রিটিশ অ্যাকাডেমির ওরিয়েন্টাল ডকুমেন্টস্ কমিটির কাছ থেকে তারা আমার তিন মাসের ব্যয়নির্বাহের একটা ব্যবস্থা করেছেন। এখন আমি যদি কাজটা করতে সম্মত হই এবং যাতায়াতের ব্যবস্থা করতে পারি, তাহলে তাঁরা বাধিত হন।
