নাগরিক শোকসভার আহ্বানে আমার স্বাক্ষর থাকলেও সভায় আমি উপস্থিত থাকতে পারিনি। আমাকে চট্টগ্রামে ফিরে যেতে হয়েছিল। সভা হয়েছিল ইনজিনিয়ার্স ইনসটিটিউটে। বেশ বড়ো ও ভালো অনুষ্ঠান–দলমতনির্বিশেষে কবির প্রতি শ্রদ্ধানিবেদন।
৯.
গত এক বছরে দেশে অনেক কিছু ঘটে গেছে। সামরিক আইনের ঘোষণার দ্বারা সংবিধান সংশোধন করে দেশের নাগরিকদের বাঙালি না বলে বাংলাদেশি আখ্যায়িত করা হয়েছে; দালাল আদেশ বাতিল হয়েছে; রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানা ব্যক্তিগত খাতে ছেড়ে দেওয়া শুরু হয়েছে–মওলানা ভাসানী এই নীতি সমর্থন করেছেন। বিমানবাহিনী-প্রধান এম জি তাওয়াব পদত্যাগ করে জার্মানিতে ফিরে গেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি সেখানেই ছিলেন, একবার কলকাতায় এসে বাংলাদেশ সরকারের কাছে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু বিনিময়ে তিনি কী পাবেন, তা জানতে চেয়ে হতাশ হয়ে জার্মানিতেই প্রত্যাবর্তন করেন। এই ঘটনার কথা আমি তাজউদ্দীন আহমদের কাছে জেনেছি। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর এয়ার ভাইস-মার্শাল এ কে খোন্দকারকে সরিয়ে তাওয়াবকে বিমানবাহিনী-প্রধান করা হয়। যে-সাত মাস তিনি ওই পদে ছিলেন, সে-সময়ে তিনি পাকিস্তানপন্থী ও জামাতপন্থীরূপেই নিজের ভাবমূর্তি তুলে ধরেছিলেন। সিরাতুননবী-উপলক্ষে ঢাকায় বিশাল সমাবেশ ঘটিয়েছিলেন, সমাবেশে যোগদানকারীদের দুপুরে ভালোরকম খাইয়েছিলেন পঞ্চাশ পয়সায়, সউদি আরব ও লিবিয়ার রাষ্ট্রদূতদের দুপাশে বসিয়ে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সরকারকে গালমন্দ করেছিলেন প্রচুর, এবং ধর্মীয় পরিচয়কে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। সন্দেহ নেই যে, বাংলাদেশকে তিনি ইসলামি প্রজাতন্ত্র বানাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তার সহকর্মীরা বোধহয় সেই মুহূর্তে অতদূর যেতে প্রস্তুত ছিলেন না। তাই কোথাও সংঘাত লেগে থাকবে এবং তার ফলে তাওয়াবকে বিদায় নিতে হয়। এদিকে সামরিক ট্রাইব্যুনালে কর্নেল তাহেরের প্রাণদণ্ডাদেশ হয়, তার প্রাণরক্ষার যে-আবেদন করেন তাঁর পরিবারের সদস্যেরা, অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে রাষ্ট্রপতি তা প্রত্যাখ্যান করেন, এবং পঙ্গু ব্যক্তিকে ফাঁসি না দেওয়ার প্রচলিত নিয়ম অগ্রাহ্য করে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পুরস্কৃত করা হয় কূটনৈতিক নিয়োগ দিয়ে–ব্যতিক্রম শুধু কর্নেল ফারুক ও কর্নেল রশীদ। তার একটা কারণ হয়তো এই যে, লন্ডনে তাঁরা এই মর্মে বিবৃতি দেন যে, বঙ্গবন্ধু-হত্যার পরিকল্পনার সঙ্গে খন্দকার মোশতাক ও মেজর-জেনারেল জিয়াউর রহমানের সংস্রব ছিল।
বঙ্গবন্ধু-হত্যার পরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদ থেকে অধ্যাপক আবদুল মতিন চৌধুরীকে অপসারণ করা হয়। মাস ছয়েকের মধ্যে সিনেট উপাচার্য-নিয়োগের জন্যে যে-নতুন প্যানেল নির্বাচিত করে, তাতে আবার আবদুল মতিন চৌধুরীর নাম থাকে। সেইসঙ্গে নির্বাচিত হন অধ্যাপক কবীর চৌধুরী ও অধ্যাপক ফজলুল হালিম চৌধুরী। উপাচার্য নিযুক্ত হন ফজলুল হালিম চৌধুরী। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক গণতন্ত্রমনা শিক্ষক–যাঁরা আইয়ুবের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন, তাঁরাও–সরকারের কাছে বাকশালপন্থী নির্বাচিত সিনেট ভেঙে দেওয়ার আবেদন জানান।
এ-সময়ে একদিন চট্টগ্রাম শহর থেকে ক্যাম্পাসে বাসায় ফিরে শুনি যে, আমার কাছে একজন অতিথি এসেছিলেন এবং তিনি আমাকে না পেয়ে আলমগীর সিরাজুদ্দীনের বাসায় অপেক্ষা করছেন। ফোন করে জানলাম, তিনি অধ্যাপক আসহাবউদ্দীন আহমদ। আসহাবউদ্দীন সাহেবকে আমি চিনি ১৯৫২ সালে কুমিল্লায় অনুষ্ঠিত সাংস্কৃতিক সম্মেলনের সময় থেকে। তিনি লায়লা নূরকে দিয়ে আমার একটি ছোটগল্পের ইংরেজি অনুবাদ করিয়ে তাঁর সম্পাদিত Teacher পত্রিকায় ছেপেছিলেন। তাঁকে সসম্মানে আমার বাসায় আসতে অনুরোধ করলাম। তিনি এলেন। জানতে চাইলেন, আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করি কি না। আমার উত্তর শুনে জিজ্ঞাসা করলেন, তাহলে ময়মনসিংহ-সীমান্তে ভারত যে-হামলা করছে, আমি তার প্রতিবাদে বিবৃতি দিতে প্রস্তুত কি না। আমি বললাম, এটা সত্যিকার হামলা হলে আমি বিবৃতিতে স্বাক্ষর করতাম, কিন্তু হামলার বিষয়টা অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের জন্যে সরকারি প্রচার বলে সন্দেহ করার কারণ আছে। তিনি আমার কথা মানলেন না। এবারে আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করেন কি না। তিনি বললেন, অবশ্যই করেন। আমি জানতে চাইলাম, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পাঁচ বছর পরেও তাহলে তাদের পার্টির নামে পূর্ব পাকিস্তান ব্যবহৃত হচ্ছে কেন? এ-প্রশ্নের জন্যে অধ্যাপক তৈরি ছিলেন না, কিন্তু উত্তর দিতে তার দেরি হয়নি। তিনি বললেন, পার্টি-কংগ্রেস ছাড়া পার্টির নাম বদল করা যায় না, আর কংগ্রেস ডাকার অনুকূল পরিস্থিতি এতদিন ছিল না। এখন পরিস্থিতি অনুকূল হয়েছে, কংগ্রেস করে তারা পার্টির নাম বদল করবেন।
১০.
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এক টিলার ওপর নির্মিত কোনো ঠিকাদারের তত্ত্বাবধায়কের কোঠা পরিত্যক্ত হওয়ায় সেখানে ক্লাব স্থাপন করা হলো। তার আগে বিকেলবেলায় আমরা কয়েকজন পালাক্রমে একেকজনের বাড়িতে কনট্রাক্ট ব্রিজ খেলে বেড়াতাম। এখন এক ছাদের নিচে তাস, দাবা, ক্যারম খেলার এবং সেই সঙ্গে চা-পানের ব্যবস্থা হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচন নিয়ে আমরা যারা এ-দলে ও-দলে বিভক্ত ছিলাম, তারাও একসঙ্গে ওঠাবসার একটা সহজ সুযোগ পেয়ে গেলাম।
