পথ চলছি আর কবির কথা মনে পড়ছে। প্রথমে তাঁকে দেখতে গিয়েছিলাম ১৯৫৯ সালে, কলকাতায়। মানিকতলায় একটা ফ্ল্যাটে থাকতেন তখন। শেষ দেখি বাংলা একাডেমিতে, ১৯৭৪ সালে। তার জন্মদিনের অনুষ্ঠানে তাকে নিয়ে আসা হয়েছিল গাড়ি করে। তিনি কিছুতেই গাড়ি থেকে নামবেন না। একরকম টেনে-হিঁচড়ে তাঁকে গাড়ি থেকে নামিয়ে মঞ্চে তুলে দেওয়া হয়। আমার খুব খারাপ লেগেছিল। মনে হয়েছিল, নিজেদের খাতিরে তার ওপর অত্যাচার করছি। আমরা। সেদিনকার অনুষ্ঠানে আমি ছিলাম একজন বক্তা। কবির পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর সম্পর্কে কিছু বলা ছিল পরম সৌভাগ্যের বিষয়। আমি সেবারে নজরুলের গদ্যরচনার বিষয়ে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলাম। আমার মনে হয়েছিল, এসব রচনা যতটুকু সমাদর পাওয়ার যোগ্য, ততটুকু পায়নি।
বাংলা একাডেমিতে সেদিন যখন দ্বিতীয়বারের মতো ফিরে এলাম, তখন দেখি প্রেসিডেন্ট বিচারপতি সায়েম সেখানে উপস্থিত। তাঁর কথা থেকে মনে হলো, তিনি চাইছেন, বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে কবিকে সমাহিত করা হোক। তখনই প্রথম উপলব্ধি করলাম যে, কবিকে ঢাকায় সমাধিস্থ করার সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে কোনো এক পর্যায়ে–সে-বিষয়ে তাঁর পুত্রদের মতামত কেউ নিয়েছেন কি না, বোঝা গেল না। এটা তো সবারই জানা যে, চুরুলিয়ায় যেখানে প্রমীলাকে কবর দেওয়া হয়, তার পাশে কবির সমাধির জন্যে জায়গা রাখা ছিল। মনে হলো, এই মুহূর্তে কবির মৃতদেহের ওপরে তাঁর পরিবারের চেয়ে বাংলাদেশ সরকারের দাবি অধিক।
প্রেসিডেন্টের কথার জবাবে একাডেমির মহাপরিচালক ড. আশরাফ সিদ্দিকী বললেন, একাডেমির পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা-অনুযায়ী ওই প্রাঙ্গণে একটি ভবন নির্মাণের কথা রয়েছে। প্রেসিডেন্ট এক পর্যায়ে রুষ্ট হয়ে বললেন, আপনার পরিকল্পনা আমি ছিঁড়ে ফেলে দেবো। অনেকেই নজরুলের সমাধির স্থান সম্পর্কে সুপারিশ করতে থাকলেন প্রেসিডেন্টের কাছে। কেউ বললেন, রেসকোর্সে তিন নেতার সমাধির পাশে তার জায়গা হতে পারে। আমরা দু একজন বললাম, শহীদ মিনারের উলটো দিকের জায়গাটা বিবেচনা করা যেতে পারে। ড. রফিকুল ইসলাম ও মুস্তাফা জামান আব্বাসী–সম্ভবত সেইসঙ্গে জাদুঘরের ড. এনামুল হকও-খুব করে বলতে থাকলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। মসজিদের পাশে তাঁকে কবর দিতে এবং তাঁরা নজরুলের সেই গানটির কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন, মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফজলুল হালিম চৌধুরীকেও অনুরোধ করছিলেন এই দাবি জানাতে। উপাচার্য বললেন, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তেমন সিদ্ধান্ত হলে বিশ্ববিদ্যালয় সকল আনুষ্ঠানিকতা পালন করবে।
এমন অবস্থায় প্রেসিডেন্ট ফিরে গেলেন–সম্ভবত বঙ্গভবনে। সেখানে উপদেষ্টা-পরিষদের সভায় স্থির হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ-প্রাঙ্গণেই। কবির শেষ শয্যা রচিত হবে। যথারীতি সব ব্যবস্থা সম্পন্ন হলো। খবর পাওয়া গেল, কাজী সব্যসাচী অচিরেই ঢাকায় এসে পৌঁছোবেন। তাতে একটু চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হলো। রেসকোর্সে জানাজা পড়া হলো। শবাধার বহন করলেন প্রেসিডেন্ট এবং সশস্ত্র বাহিনীর তিন প্রধান। সেই সময়ে আকাশে একটি উড়োজাহাজ দেখা গেল। অনেকেই বললেন, ওই আসছে সব্যসাচী। ভিড়ের মধ্যে কেউ চেঁচিয়ে বললেন, তাড়াতাড়ি। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়–তিন বাহিনীর গার্ড অফ অনার। দিয়ে–কবিকে সমাধিস্থ করা হলো। সবকিছু শেষ হওয়ার পরেও আমরা কিছু লোক দাঁড়িয়ে রইলাম। কাজী সব্যসাচী এলেন–কবরের কাছে গেলেন, বিশেষ কাউকে উদ্দেশ্য না করে অস্ফুটস্বরে বললেন, আমার জন্যে একটু অপেক্ষা। করলেন না!’ তিনি চলে গেলেন, আমরাও যে-যার পথ ধরলাম।
বাড়ি ফিরলাম বেশ দেরিতে। শুনলাম, টেলিভিশন থেকে বারকয়েক ফোন এসেছে, রাতে কবির সম্পর্কে একটি অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করা হবে–আমি যেন অবশ্যই তাতে যোগ দিই। অবসন্ন দেহ ও মন নিয়ে টেলিভিশন-ভবনে যখন পৌঁছোলাম, তখন অনুষ্ঠান শুরু হতে কয়েক মিনিট বাকি। সকলে স্টুডিওতে একটা বড়ো টেবিল ঘিরে বসে আছেন : কাজী মোতাহার হোসেন, আবদুল কাদির, সুফিয়া কামাল, মঈনুদ্দীন, কবীর চৌধুরী, সিকান্দার আবু জাফর, আশরাফ সিদ্দিকী, মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, ফিরোজা বেগম, রফিকুল ইসলাম, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, শাহাবুদ্দীন আহমদ, মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ। হয়তো হাসান হাফিজুর রহমান ছিলেন, ছিলেন আরো কেউ কেউ। মুস্তাফা মনোয়ার আমাকে ঠেলে পাঠিয়ে দিলো তাদের মধ্যে এবং নিজেকেই জায়গা করে নিতে হলো। অনুষ্ঠানটি মর্মস্পর্শী হয়েছিল। তবে একটু ছন্দপতন হয় কাজী মোতাহার হোসেন যখন নিজের বক্তব্যের শেষে নজরুলের একটি গান গেয়ে শোনালেন, তখন।
এরপর সৈয়দ আহমদ হোসেন ও এনামুল হক মিলে উদ্যোগ নিয়েছিলেন নজরুলের জন্যে একটি নাগরিক শোকসভা অনুষ্ঠানের। আমি বাংলা বিভাগে পরীক্ষা নিচ্ছি। এরই মধ্যে আহমদ ঢুকল। তার হাতে শোকসভা আহ্বান করে লেখা পত্র–তাতে অনেকে সই দিয়েছেন এর মধ্যে। অধ্যাপক আহমদ শরীফ তখন বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান। আহমদ তার সামনে কাগজটা খুলে ধরলো। তিনি দু-একটি নাম দেখে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন : মস্কোওয়ালাদের সঙ্গে আমি সই দিই না।’ আহমদ বললো, ‘সার, এ তো নজরুলের জন্যে শোকসভার আহ্বান।’ আমিও তার সঙ্গে যোগ দিলাম। কিন্তু আহমদ শরীফ অবিচলিত। এসব লোকের সঙ্গে তিনি স্বাক্ষর দেবেন না। আহমদ ব্যর্থমনোরথ হয়ে ফিরে গেলো।
