দিনের বেলায় গেলাম জাপানি টি-সেরেমনিতে। অতি চমৎকার এক উদ্যান পুষ্পেপল্লবে সুশোভিত। ঝরনাধারা বয়ে চলেছে সমতলে। তার ওপর চৌকো পাথরের সারি। ইচ্ছে করলে তার ওপর দিয়ে লাফিয়ে বা হেঁটে যাওয়া যায়। একটু পরে অপেক্ষাকৃত অনলংকৃত প্যাভিলিয়ন। মস্ত বড়ো কিন্তু নিচু একটা টেবিলের চারদিকে একাধিক সারিতে জায়গা করে নেওয়া হলো। জাপানি পোশাকে সুসজ্জিত কয়েকজন মহিলাও আছেন টেবিলের চারপাশে। যথাসময়ে তাদের একজন চায়ের একটি কাপ নেড়ে-চেড়ে ভালো করে দেখে পার্শ্ববর্তিনীর হাতে দিলেন। তিনি আবার একইরকম করে দেখে শুনে দিলেন পরের জনের হাতে। এমনি করে কাপটি এসে থামলো প্রথমে যিনি হাতে নিয়েছিলেন তাঁর বাঁ-পাশের জনে। এভাবে চায়ের পেয়ালা সবার কাছে পৌঁছোবার পর সুদৃশ্য টি পট থেকে চা ঢালা এবং তা ধীরে ধীরে পান করা। সময়সাপেক্ষ, তবে দৃষ্টিনন্দন ব্যাপার। খাওয়ার চাইতে পরিবেশন-প্রণালি এবং সবার একসঙ্গে মিলিত হওয়ার ব্যাপারটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ইন্দোনেশীয় অর্থবিদ আমাকে একটি কথা বলেছিলেন, পরে তা আমি কোথাও কোথাও উদ্ধৃত করেছি। তিনি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, সে-সময়ে সিদ্ধান্ত হয় যে, শিক্ষার মাধ্যম ওলন্দাজ থেকে রাতারাতি পরিবর্তন করে বাহাসা ইন্দোনেশিয়া হবে। তাই হয়েছিল। তাদের শিক্ষকেরা অভ্যস্ত ছিলেন ওলন্দাজে পড়াতে। তাদের বেশ অসুবিধে হতো গোড়ার দিকে এবং দেখা যেতো, নতুন মাধ্যমে পড়াতে গিয়ে তাঁরা শতকরা নব্বই ভাগ ওলন্দাজ শব্দ ব্যবহার করছেন। কিন্তু ওইভাবে যে শুরু হলো প্রায় বিনা প্রস্তুতিতে, কালক্রমে সেটিই হয়ে গেল রীতি। পরবর্তী প্রজন্মের ওই অসুবিধে আর হয়নি।
৭.
টোকিও থেকে ফেরার পথটা নিয়েছিলাম ম্যানিলা ও হংকং হয়ে। অগ্রজপ্রতিম আবুল মাল আবদুল মুহিত তখন ম্যানিলায়, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক। তাঁর ও সাবিয়ার সঙ্গে কয়েকদিন কাটাতেই ম্যানিলা যাওয়া। ইউনেসকোর সভায় ফিলিপিনসের প্রতিনিধি হয়ে এসেছিলেন সেখানকার ন্যাশনাল লাইব্রেরির গ্রন্থাগারিক। তাঁকে দিয়ে মুহিত ভাইকে আমার ম্যানিলা পৌঁছোবার দিনক্ষণ জানালাম।
ম্যানিলায় মুহিতের বাড়িতে অভ্যর্থনা জানালো তাঁর দীর্ঘকালের সেবক কাদের। প্রথমেই বললো, ‘আপনি গিয়াস সাহেবের সঙ্গে আমাদের বাড়ি আসতেন না!’ আমাদের বন্ধু শহীদ গিয়াসউদ্দিন আহমদকে কাদের আমার চেয়েও বেশি মনে রেখেছে। তাতে যেমন ভালো লাগল, তেমনি গিয়াসের জন্যে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সাবিয়া গিয়াসের সাক্ষাৎ ছাত্রী।
মুহিত-দম্পতির যত্নে সময়টা খুব ভালো কাটল। ম্যানিলার যা দ্রষ্টব্য, তা দেখা হলো। এক ফাঁকে ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে গিয়ে গ্রন্থাগারিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এলাম। তাছাড়া দেখা হলো মমতাজ ইকবাল এবং আমিনুল ইসলামের সঙ্গে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগের চাকরি হারিয়ে আমিনুল ইসলাম যোগ দেন পাকিস্তান ইনসটিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট ইকনমিকসে। সেখান থেকে আসেন এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকে। আমিনুল ইসলাম এক সন্ধ্যায় রেস্টুরেন্টে আপ্যায়ন করলেন। তার সঙ্গে তাঁর স্ত্রী সুলতানা আরা ওরফে ইভা, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগ থেকেই আমার বছর দুই পরে এম এ পাশ করেন, সুতরাং তাঁর সঙ্গে বিলক্ষণ পরিচয় ছিল। আর ছিল তাদের শিশুকন্যা। অতিথি মুহিত ও আমি। প্রবাসী বাঙালিদের একটি অনুষ্ঠানে যেতে হলো বলে আমাদের সঙ্গে সাবিয়া যোগ দিতে পারেননি।
সাবিয়া জানতে চাইলেন আমার কেনাকাটির ফর্দ কী। যখন বললাম, বেবীর একমাত্র ফরমাশ মশারির কাপড়, তখন তিনি হেসে অস্থির। বেবী তাঁর সহপাঠী। সাবিয়া বললেন, এখানে এতজন এতকিছু কেনে, কাউকে মশারির কাপড় কিনতে দেখিনি। সেটা কেনা হলো। আরো টুকিটাকি এবং সাবিয়ার দেওয়া উপহারসমেত ম্যানিলাত্যাগ।
হংকং বিমানবন্দরে যখন নামলাম, মনে হলো, প্লেনটা সমুদ্রে গিয়ে পড়বে। সমুদ্র ভরাট করে জমি বাড়ানো হচ্ছে। শহরটা বড়ো হচ্ছে একটু একটু করে। বিমানবন্দর থেকে সেখানকার কর্মীদের সাহায্যে যোগাযোগ করে হোটেল অ্যামবাসাডরে জায়গা পাওয়া গেল। হংকংয়ে দেখার মতো জিনিস বেশি নেই, কেনার মতো জিনিস আছে প্রচুর। আমার সামর্থ্য ও প্রয়োজন দুইই সীমিত। আর-দশজন পর্যটকের সঙ্গে স্টার ফেরিতে কাওলুন যাতায়াত করি, হেঁটে হেঁটে একটু একটু করে শহর দেখি, দোকানপাটে চুঁ দিই। জিনিসপত্র শস্তা, তবে কোনটি আসল ব্র্যান্ড, কোনটি নকল, তা বোঝা কঠিন। একটা স্যামসোনাইট ব্রিফকেস কিনলাম–আসল-নকলের চিন্তা না করে, সেটি আর ব্যবহার না করলেও এখনো টিকে আছে। হংকংয়ের রাতের জীবনের সামান্য পরিচয় নিলাম–একটা টপলেস বারে বসে পান করে।
ব্যাংককে রাত্রিযাপন করলাম আগেরবারের মতোই এয়ারলাইনসের সৌজন্যে। সেখানে ট্যাকসি নিলেই তার ড্রাইভাররা নানারকম ছবি দেখায়, নানা জায়গায় নিয়ে যেতে চায়। তাদের এড়াতে কষ্ট করতে হয়। নিজের মতো সামান্য ঘোরাঘুরি করি, খাইদাই। এখানকার হোটেল অ্যামবাসাডরের ফুড কোর্টটি বেশ পছন্দ হলো। হাতে সময় কম, একটু ক্লান্তিও বোধ হয়। তারই মধ্যে অনুভব করি, শহরটা নতুন করে এবং আকর্ষণীয় করে গড়ে তোলার ক্লান্তিহীন প্রয়াস চলছে।
৮.
আগস্ট মাসে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছিলাম মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এ পরীক্ষার্থীদের মৌখিক পরীক্ষা নিতে। কিন্তু তার আগেই, ২৯ তারিখ সকালে। খবর পাওয়া গেল, কবি নজরুল ইসলাম মৃত্যুবরণ করেছেন। সঙ্গে সঙ্গে ছুটলাম পিজি হাসপাতালে। লোকে লোকারণ্য। ভিড় ঠেলে যখন ওপরে উঠলাম, তখন জানলাম, লাশ নিয়ে যাওয়া হয়েছে বাংলা একাডেমিতে। সেখানে গিয়ে শুনলাম, লাশ ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে। সেখানে যারা ছিলেন, তাঁরা বললেন, লাশ বাংলা একাডেমিতে। আসলে ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে লাশ নেওয়া হয়েছিল, তবে বেশ পরে।
