মধ্য-এশিয়ার প্রতিনিধি হয়ে এসেছেন ইতিহাসবিদ বোবোজান গফুরভ। দু বছর আগে প্যারিসে ওরিয়েন্টালিস্ট কংগ্রেসে তিনি ছিলেন, কিন্তু সেবারে আলাপ হয়নি। বাংলাদেশ থেকে গেছি শুনে তিনি জানতে চাইলেন, কেমন আছি এবং আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই মুচকি হেসে বললেন, ইউনিফর্ম পরলে প্রত্যেক সামরিক কর্মকর্তা নিজেকে আলেকজান্ডার মনে করে। বাংলাদেশে সামরিক শাসনের বয়স তখন ছ মাস পেরিয়েছে। সম্মেলনে যে দুজনের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়েছিল, তাদের একজন ইন্দোনেশীয় অর্থনীতিবিদ-বয়সে আমার চেয়ে সামান্য বড়ো, আরেকজন মালয়েশীয় স্থপতি-কুয়ালামপুরের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য অনুষদের ডিন–বয়সে আমার ছোটো। তাঁদের দুজনেরই নাম ভুলে গেছি। মনে আছে নারায়ণ মেননকে–একদা অল ইন্ডিয়া রেডিওর বড়োকর্তা, সংগীতবিশেষজ্ঞ, তখন বোম্বাইতে অবসরজীবন যাপন করছিলেন। তাঁর স্ত্রী রেখাও সুপরিচিত সংগীতশিল্পী–তিনি অবশ্য টোকিওতে আসেননি। মেনন আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, যখনই বোম্বাই দিয়ে আসা-যাওয়া করি, তাঁর বাড়িতে যেন অতিথি হই। আরেকজনের কথাও উল্লেখযোগ্য। তিনি এসেছিলেন আফগানিস্তান থেকে–সরকারি কর্মকর্তা, তখন আছেন বহিঃপ্রচার বিভাগের শীর্ষদেশে, কিন্তু গবেষণার সঙ্গে দূরতম সম্পর্ক নেই। নিতান্ত ভালোমানুষ, খোলাখুলিই বললেন, তোমাদের মতো অ্যাকাডেমিকদের মধ্যে আমি ডাঙায় তোলা মাছ–খেই পাচ্ছি না কিছুতে, কী যে বলব, ঠাহর করতে পারি না। বললাম, কিছু যে বলতেই হবে, এমন কথা নেই। বলার কথা থাকলে বলবেন, নইলে অন্যের কথা শুনবেন কিংবা শোনার ভান করবেন। তিনি খুব একটা স্বস্তির হাসি হাসলেন। আফগানিস্তানের পরবর্তী রাজনৈতিক ডামাডোলের সময়ে আরো অনেকের মতো এই সরল মানুষটিকেও প্রাণ দিতে হলো কি না, এ প্রশ্ন আমার মনে পরে অনেকবার দেখা দিয়েছিল, তবে তার উত্তর পাইনি।
অধিবেশনে যোগ দিয়ে বুঝলাম, ঠাণ্ডা লড়াইয়ের জের এখানেও চলছে–গফুরভ সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকায়, আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জায়গায় থাইল্যান্ডের প্রতিনিধি। একটি খসড়ায় থাই প্রতিনিধির দেওয়া দুটি বাক্যের প্রবল বিরোধিতা করলেন গফুরভ। মীমাংসায় আসা যাচ্ছে না। আমার পাশেই ছিলেন ইন্দোনেশীয় অর্থনীতিবিদ। তাঁকে বললাম, গফুরভের কথাটা পাদটীকায় দিলে কেমন হয়? তিনি বললেন, ভালোই হয়, প্রস্তাব করে দেখুন। আমি প্রস্তাব করলাম এবং সঙ্গে সঙ্গে বিপুল সমর্থন পেয়ে গেলাম। কিন্তু ব্যাপারটার শেষ ওখানে হলো না। বিকেলের অধিবেশনে থাই প্রতিনিধি বললেন, মূল খসড়ায় তার প্রস্তাবিত বাক্য তিনি প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন এবং আশা করছেন যে, পাদটীকাও সেই সঙ্গে প্রত্যাহৃত হবে। কিন্তু গফুরভ তাঁর কথা ফিরিয়ে নেবেন না। আবার অচলাবস্থা। ইউনেসকোর এশীয় আঞ্চলিক দপ্তরের পরিচালক, জাপানি ভদ্রলোক, আমাকে আহ্বান জানালেন মতামত দিতে। আমি বললাম, দুটো বিরোধী মতকে জায়গা দেওয়ার জন্যে আমি পাদটীকার প্রস্তাবটি দিয়েছিলাম। কিন্তু প্রতিজ্ঞা না থাকলে তার টীকার সার্থকতা থাকে না। যেহেতু মূল কথাগুলি প্রত্যাহার করা হয়েছে, সেহেতু টীকার আর প্রয়োজন নেই। এবারো বড়োরকম সমর্থন পেলাম, কিন্তু গফুরভ খুব বিষণ্ণ হলেন। বিরতির সময়ে বললেন, আমার মনের পরিবর্তনে তিনি খুব। আহত হয়েছেন।
পরদিন আবার এক বিতর্কের যখন অবসান হচ্ছিল না, এশীয় আঞ্চলিক দপ্তরের পরিচালক নিজের আসন ছেড়ে আমার আর ইন্দোনেশীয়ের আসনের পেছনে এসে দাঁড়িয়ে মৃদুস্বরে বললেন, তোমরা একটা সমাধান বের করো–এক্ষুনি। কিন্তু সেবার আর আমাদের কথায় কাজ হয়নি।
আমাদের প্রতিনিধি-সভা যদিও ইউনেসকোর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়, এর স্থানীয় আয়োজক ছিল টোকিওর সেন্টার ফর ইস্ট এশিয়ান কালচারাল স্টাডিজ। এই কেন্দ্রে গিয়ে দেখলাম, আমাদের প্রত্যেককে এক বছরের জন্যে বিনা চাঁদায়। সদস্য করে নেওয়া হয়েছে। এক বৎসরের মধ্যে টোকিওয় এলে কেন্দ্রের। অতিথিশালায় সুলভে থাকতে পারবো। পুরো বছর ধরে তাদের কাছ থেকে অনেক কাগজপত্র পেয়েছিলাম।
সেই সন্ধ্যায় আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো এক জাপানি রেস্তোরাঁয়। ঢুকতেই সুন্দরী হোস্টেস আমার জুতো খুলতে উদ্যত হলো। আমি বাধা না দিয়ে পারলাম না। আমন্ত্রকদের একজন এগিয়ে এসে বললেন, এটাই এখানকার। দস্তুর–আপত্তি করলে তা রূঢ়তা বলে বিবেচিত হবে। অতি যত্নে মেয়েটি জুতো খুলে নিয়ে দরজা টেনে ধরলো। আমরা ভোজনকক্ষে প্রবেশ করলাম। নিচু চেয়ার-টেবিল। টেবিলের মাঝখানটা বৃত্তাকারে কাটা। তার নিচে স্টোভের মতো কিছু একটা রাখা। সেটায় আগুন ধরানো হলো। একটা বড়ো পাত্রে সাদা সিরকাজাতীয় জলীয় পদার্থ এনে তার ওপর রাখা হলো। ছোটো ছোটো পেয়ালায় সস ঢেলে প্রত্যেকের সামনে দেওয়া হলো। তারপর ট্রেতে আনা হলো কাঁচা তরিতরকারি এবং গোমাংস। যার যার ইচ্ছেমতো বড়ো পাত্রে সেসব সিদ্ধ করে নিয়ে ছোটো পেয়ালার সস মাখিয়ে খেতে হয়। অতি উপাদেয়। যে গোমাংস সরবরাহ করা হলো, তা অতি বনেদি–কোবে বিফ বলে পরিচিত। গরুকে বিয়ার খাইয়ে যথাযথ পুষ্ট করার পর তা জবাই করা হয়। সে-গোশতের স্বাদই আলাদা। আমি এবং কাবুলি পাশাপাশি বসে খুব খেলাম।
