আপনার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ঋণ স্বীকার করতে হবে কোনোদিন ভাবিনি। ১৯৭৩ সালে কী অবস্থায় আপনি আমাকে রাজশাহী থেকে এখানে নিয়ে এসেছিলেন–সেটা কি ভুলে যাওয়া সম্ভব? আমি গত কয়েক মাস আপনার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করিনি–তার জন্যে নিজে কতোটুকু পীড়িত হয়েছি তা নিজেই জানি। হয়তো আমি এখান থেকে কিছুদিন দূরে থাকলে এইসব কষ্টকর স্মৃতি আস্তে আস্তে ম্লান হয়ে যাবে। আপনি কাল ঢাকা যাচ্ছেন। সেখানে ভাবিকে বলবেন যে আমি সত্যি সত্যি অকৃতজ্ঞ নই। তিনি যে ১৯৭৩ সালের তিনটি মাস আমাকে সহোদরের মতো যত্ন করেছিলেন–তা আমি কোনোদিন ভুলবো না–কারণ আমার জীবনে এরকম সমাদর-মমতা খুব কম পেয়েছি। আমি সবচেয়ে কষ্ট পেয়েছিলাম যখন দিনের পর দিন আপনাদের ওখানে যেতাম না বলে, আনন্দকে দেখতে পাইনি। ওর সঙ্গে আমার পুরনো সম্পর্কটা আর বাঁচিয়ে তোলা হলোই না।
এসব কথা সাক্ষাতে বলতে পারতাম না বলেই চিঠি লিখলাম। এই বৃদ্ধ বয়সেও, মনে হচ্ছে, বেশ ভাবপ্রবণই হয়ে পড়েছি। ক্ষমা করবেন।
আবু হেনা মোস্তফা কামাল।
চিঠিটা যে মর্মস্পর্শী, সেকথা অনস্বীকার্য, তবে তখন আমার উদবেগ হলো এই ভেবে যে, এতকিছুর পর যদি তিনি বিবিসিতে চলে যান, তাহলে সবদিক থেকে আমি বিব্রত হবো। তিনি অবশ্য বিবিসি-তে আর যাননি, অধ্যাপক পদ গ্রহণ করে আপাতত চট্টগ্রামে রয়ে যান। সৈয়দ আলী আহসান পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপকের দুটি নতুন পদ সৃষ্টি করে আউয়ালকে বাংলা বিভাগে এবং কোরেশীকে ইনসটিটিউট অফ বাংলাদেশ স্টাডিজে নিয়ে যান।
আবু হেনার চিঠিতে অনুষদের যে-নির্বাচন সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে, সে-বিষয়ে কিছু বলি। আবদুল করিম উপাচার্য নিযুক্ত হওয়ায় আমি কলা। অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন হই, তা আগে উল্লেখ করেছি। কর্তৃপক্ষ ডিন নির্বাচনের তারিখ এমনভাবে দিলেন যাতে মোহাম্মদ আলী বিলেত থেকে ফিরে তাতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। আমি যে নির্বাচনে প্রার্থী হবো, তা ছিল অবধারিত। মোহাম্মদ আলী কাজে যোগ দিয়েই মনোনয়নপত্র দাখিল করলেন, সৌজন্যের খাতিরেও আমাকে কিছু বললেন না। তাঁর স্ত্রী খালেদা হানুম আমাদের বিভাগে শিক্ষক–তিনিও তাঁর সঙ্গে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে যোগদানপত্র দিলেন–সেটা আমি সই করে রেজিস্ট্রারের দপ্তরে পাঠাবার আগেই ভোটার-তালিকায় তার নাম মুদ্রিত হয়ে গেল। রেজিস্ট্রারকে ফোন করে জানতে চাইলাম, এটা কীভাবে সম্ভবপর হলো? তিনি লজ্জিত হয়ে সনির্বন্ধ অনুরোধ করলেন, আমি যেন যোগদানপত্রটা তখনই তাঁর দপ্তরে পাঠিয়ে দিই। বললাম, ‘ভয় পাবেন না-ওটা আটকে রেখে আমি আপনাকে বিপদে ফেলবো না। নির্বাচনে এখন আমাদের বিভাগ থেকে আরো দুজনকে সঙ্গে পেলেন মোহাম্মদ আলী। আমি হেরে গেলাম।
রাতে আমি যখন শুয়ে পড়েছি, তখন গেট টপকে আমাদের সহকর্মী রশীদ আল ফারুকী আমার বাসায় এলো। বললো, নির্বাচনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সে মামলা করতে চায়। আমি তাকে নিষেধ করলাম।
৬.
১৯৭৬ সালের মার্চ মাসে টোকিওতে ইউনেসকো আয়োজন করলো এশিয়ার সাংস্কৃতিক গবেষণা-প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতিনিধি-সভা। উদ্দেশ্য : ইউনেসকোর সদর দপ্তরে কিছু গবেষণা-প্রস্তাব পাঠানো। শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ে রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা অধ্যাপক আবুল ফজল এতে যোগ দিতে মনোনয়ন দিলেন আমাকে। উদ্যোক্তারা দাবি করলেন বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক গবেষণার সমকালীন অবস্থা সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ; আমি তা উপস্থাপন করতে সম্মতি জানালাম। তাঁরা লিখলেন, টিকিট পাঠাচ্ছেন, কিন্তু সে-টিকিট আর সময়মতো এসে পৌঁছোলো না। প্রবন্ধটাও আর শেষ করতে হবে না ভেবে যখন সান্ত্বনালাভের চেষ্টা করছি, তখন ঢাকা থেকে কোনো ট্রাভেল এজেন্সির টেলিফোন : চট্টগ্রামে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হওয়ায় তারা সময়মতো জানাতে পারেননি যে, আমাকে টিকিট দেওয়ার ফরমাশ তারা পেয়ে গেছেন। আমি বললাম, এখন আর জেনে লাভ কী? তাঁরা জানালেন, আমি অবিলম্বে ঢাকায় পৌঁছোলে সপ্তাহব্যাপী সম্মেলনের মাঝামাঝি ধরতে পারব। আমি বেশি আগ্রহ না দেখানোয় তারা পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন : আমি না গেলে তারা দোষের ভাগী হবেন ইত্যাদি। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা, সেখানে একরাত থেকে ব্যাংককে। ব্যাংককে রাত্রিযাপন করে টোকিওতে যখন পৌঁছোলাম, তখন ১৩ তারিখের অনেক রাত। যিনি বিমানবন্দরে নিতে এসেছিলেন, তাকে আমার বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করায় যথোচিত দুঃখপ্রকাশ করলেন। হোটেলে পৌঁছে দিয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে আমার লেখাটি চাইলেন : যদিও ওটা উপস্থাপনের সময় চলে গেছে, কিন্তু তা বিলি করতে তো হবে। আমার মাথায় বজ্রাঘাত : কী করে বলি যে, সেটা লেখা হয়নি। বললাম, কাল সকালে দেবো–এত রাতে নিয়ে আর কী করবেন! তিনিও ওস্তাদ। বললেন, সকালে নিতে এলে যদি আপনার ঘুমের ব্যাঘাত হয়, তাই এখনি নিয়ে রাখতে চাইছিলাম, ওটার ফটোকপি করতে হবে তো! বললাম, তার চেয়ে কিছু বেশি করতে হবে–আমার হাতের লেখা থেকে টাইপ করতে হবে, অবশ্য আপনাদের টাইপিস্ট যদি আমার লেখা পড়তে পারে! ভদ্রলোক এবারে রণে ভঙ্গ দিলেন : সকাল সাতটায় এলে কি বেশি আগে হয়ে যাবে? বললাম, আদৌ নয়। নৈশভোজের পর্ব প্লেনেই সেরে এসেছিলাম। নোটটা সঙ্গে এনেছিলাম আর গ্রন্থপঞ্জি। এক কাপ কফি খেয়ে বসে গেলাম লিখতে। হোটেলের যে-স্টেশনারি ঘরে ছিল, তাতেই লিখতে আরম্ভ করলাম। রিসেপশন থেকে কিছু বাড়তি কাগজ নিয়ে এলাম। ঘুম পাচ্ছে, কিন্তু বিছানার দিকে তাকাচ্ছি না। লেখা শেষ করতে ভোর হয়ে গেল। তারপর গোসল শেষ করে সকালের নাশতার জন্যে যখন তৈরি হয়েছি, তখন কান্ডারি এলেন লেখা নিতে। আমার চুল যদি বুঝেও থাকেন, তা জানতে দিলেন না। বললেন, টাইপ হয়ে গেলে একবার দেখিয়ে নেবো। ইলেকট্রিক টাইপরাইটারে সুন্দর মুদ্রণ হলো, দেশীয় নাম ও গ্রন্থনামও নির্ভুল। প্রায় তিন পৃষ্ঠার প্রবন্ধ, দেড় পৃষ্ঠার গ্রন্থপঞ্জি। সকালের অধিবেশনে যোগ দিতে গিয়ে দেখি, লেখাটি বিলির জন্যে প্রস্তুত। পরে টের পেলাম, সময়ের অভাবজনিত সংক্ষিপ্ততা আমার লেখনীর সংযম বলে গণ্য হয়ে প্রশংসাযোগ্য হয়েছে। একেই বলে লীলাখেলা!
