এখন মফিদুলের দাবি, তার প্রকাশনীকে একটি বই দিতে হবে। অক্সফোর্ড ও সাসেক্সে যে-প্রবন্ধ দুটি পড়েছিলাম, তার বাংলা ভাষ্য করে দিলে সে খুশি হয়। সেই কাজ শুরু করেছিলাম ঢাকায়, আব্বার অসুস্থতার সময়েই, এখন। চট্টগ্রামে এসে শেষ করলাম। মফিদুলকে জানালাম, এইসঙ্গে আগের লেখা দুটি প্রবন্ধ যোগ করবো। ১৯৬৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম। বিভাগের এক আলোচনা-সভায় ড. আবদুল মজিদ খানের আমন্ত্রণে একটি প্রবন্ধ পড়েছিলাম। সেটি পুনর্লিখন করে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য : সমাজের কিছু চিত্র’ নামে যোগ করলাম। আর দিলাম বিলেত যাওয়ার আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা সমিতিতে পঠিত চর্যাগীতির সমাজচিত্র প্রবন্ধটি–এটি অবশ্য আমার সম্পাদিত পাণ্ডুলিপি পত্রিকায় (চতুর্থ খণ্ড, ১৯৭৫) প্রকাশ করি, অন্যগুলো মুদ্রিত হয়নি। বইয়ের পরিকল্পনাকালে বিজ্ঞাপন দেবে বলে মফিদুল নাম চেয়ে বসলো। বললাম, সমাজ ও সাহিত্য দিয়ে দাও। আবুল হাসনাত সম্পাদিত গণসাহিত্য পত্রিকায় এই নামেই বিজ্ঞাপন বেরিয়েছিল। পরে মফিদুল বললো, নামটা বড়ো গতানুগতিক হয়ে গেল। আমারও তাই মনে হলো। ততদিনে অকসফোর্ডে-পড়া প্রবন্ধটির বাংলা ভাষ্যের নাম দিয়েছি ‘স্বরূপের সন্ধানে’। মফিদুলকে বললাম, বইয়েরও এই নাম দিলে কেমন হয়? সে লুফে নিলো। স্বরূপের সন্ধানে বের হলো ১৯৭৬ সালের সেপ্টেম্বরে। এটি উৎসর্গ করি অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাককে।
এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে গেছে। সেকথা এখানে বলা দরকার।
১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে একদিন আবু হেনা মোস্তফা কামাল আমাকে বললেন, তিনি বিবিসি বাংলা বিভাগে যোগ দেওয়ার আহ্বান পেয়েছেন এবং সেটি গ্রহণ করতে ইচ্ছুক। আমি জানতাম, লন্ডনে থাকতে তিনি বিবিসি-র বাংলা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতেন এবং রাজশাহীতে প্রত্যাবর্তনের পরে তাঁর সেখানে চাকরি নিয়ে যাওয়ার কথা একবার উঠেছিল। তখন সেটা ঘটেনি, সুযোগটি এখন আবার দেখা দিয়েছে। আমি সে-হিসেবেই বিষয়টা দেখলাম। এবং বললাম, এতে তার আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য ঘটবে, ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষারও হয়তো সুবিধে হবে, কিন্তু আমার তো মনে হয়, শিক্ষকতাই তার যথার্থ ক্ষেত্র, সেটা ছেড়ে যাওয়া কি উচিত হবে? উত্তরে আবু হেনা বললেন, শিক্ষকতায় তাঁকে রাখার ব্যাপারে আমি তো কিছু করছি না। আমি অবাক হলাম বললে কম বলা হয়। ১৯৭৩ সালে আমিই উদ্যযাগী হয়ে তাঁকে চট্টগ্রামে নিয়ে আমি। ভূঁইয়া ইকবাল যখন তাঁর প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থ শিল্পীর রূপান্তর (ঢাকা, ১৯৭৫) প্রকাশের উদযোগ নেয়, তখন আমি যথেষ্ট উৎসাহ দিয়েছিলাম–বইয়ের ভূমিকায় তার ইঙ্গিত তিনি নিজেই দিয়েছিলেন। তাহলে আমার ত্রুটি কোথায়? পরে বুঝলাম, সৈয়দ আলী আহসান রাজশাহীতে চলে যাওয়ায় অধ্যাপকের যে-পদটি অস্থায়ীভাবে শূন্য হয়েছে, গত তিন মাসে তা পূরণ করার কোনো প্রয়াসই আমি নিইনি, অথচ তিনি ওই পদের প্রত্যাশী। পদটি বিজ্ঞাপিত হলে হয়তো তিনিই সেটি লাভ করবেন, কিন্তু সেক্ষেত্রে তাঁর আগে থেকে বিভাগে সহযোগী অধ্যাপকরূপে কর্মরত দুই শিক্ষক মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল ও মাহমুদ শাহ্ কোরেশী-মর্মাহত হবেন, সেকথাও না ভেবে পারা যাচ্ছে না। এসব বিবেচনা, আবু হেনার ধারণায়, অযৌক্তিক। তিনি আমার বাড়ি আসা বন্ধ করে দিলেন। এবং একদিন রেজিস্ট্রারের অফিসে বসে আবিষ্কার করলাম যে, তিনি আমার সঙ্গে বাক্যালাপও বন্ধ করেছেন। তারপর দেখলাম, আনন্দের–তার বয়স তখনো চার বছর হয়নি–’না-চাচা না-চাচা’ ডাকেও সাড়া দিচ্ছেন না। মনটা বিষণ্ণতা ও তিক্ততায় ভরে গেল।
তখনকার পরিস্থিতিতে বিভাগে অধ্যাপক-পদের সংখ্যাবৃদ্ধির কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। সুতরাং, হয় এ-পদ শূন্য রাখতে হবে, নইলে একাধিক জনকে অসন্তুষ্ট করে তা পূর্ণ করতে হবে। আমি শেষের বিকল্পই বেছে নিলাম। উপাচার্যকে বলতে গেলাম, অধ্যাপকের অস্থায়ী পদ বিজ্ঞাপিত করার অনুরোধ জানিয়ে আমি আনুষ্ঠানিক পত্র দিতে যাচ্ছি। তিনি জানতে চাইলেন, এর ফলে বিভাগে কী প্রতিক্রিয়া হবে এবং কীভাবে আমি তা সামলাবো, তা ভেবে দেখেছি কি না। বললাম, ‘ভেবে দেখেছি, কাজটা সহজ হবে না; কিন্তু আজ হোক কাল। হোক, এ-ঝুঁকি আমাকে নিতে হবে।’
পদ বিজ্ঞাপিত হলো। আবু হেনা নির্বাচিত হলেন। অপর দুই সহকর্মী ক্ষুব্ধ। হলেন। সৈয়দ আলী আহসানও আমার উপর বিরক্ত হলেন। তিনি মনে করলেন, বিজ্ঞতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে আমি বিষয়টি মোকাবেলা করতে পারিনি।
পরে আবু হেনার কাছ থেকে এই চিঠিটা আমি পাই।
এস-ই/১১ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস
২৫শে অগস্ট, ১৯৭৬
আনিস সাহেব,
গত কয়েকদিন ধরেই ভাবছিলাম আপনার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবো। কিন্তু অনুষদের নির্বাচন এবং অন্যান্য কাজকর্মের জন্যে আপনি এতই ব্যস্ত ছিলেন যে আমার পক্ষে সময়টা অনুকূল মনে হয়নি। নির্বাচনের ফল বেরুনোর পরে মনটা এত খারাপ হয়ে গেলো যে এ-সব ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ, ভেবেছিলাম, আর আপনার কাছে তুলবোই না। কিন্তু এখন দেখছি সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। ২৮ তারিখে সিন্ডিকেটের মিটিং। হ্যাঁ, আমি বিবিসিতে যাওয়ার সিদ্ধান্তই নিয়েছি। এই সিদ্ধান্ত কেন নিলাম, তা বলতে গেলে চিঠিতে কুলোবে না। সংক্ষেপে মানসিক-শারীরিক-আর্থিক, নানাবিধ কারণেই।
