প্রেসিডেন্ট একটি উপদেষ্টা-পরিষদ গঠন করলেন নভেম্বরের শেষে। এর সদস্য হলেন অধ্যাপক আবুল ফজল, কাজী আনোয়ারুল হক, ড. আবদুর রশীদ ও ড. মীর্জা নূরুল হুদা।
৫.
অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়ে চলে যাওয়ায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের সভাপতিরূপে আমাকেই নিযুক্ত করলেন উপাচার্য। এটি আমার প্রাপ্য ছিল না–কেননা, ওই পদ আমি ত্যাগ করেছি। আমার প্রতি স্নেহবশতই নিয়োগটি দিলেন আবুল ফজল। তবে তাঁর বিবেচনা ছিল এই যে, সৈয়দ আলী আহসান যাতে বিভাগের প্রধান হতে পারেন, সেজন্যেই সময়ের আগে আমি পদটি ছাড়ি। যতদিন আমার বিভাগীয় প্রধান থাকার কথা ছিল, অন্তত ততদিন আমাকে দায়িত্ব দিলে কাউকে বঞ্চিত করা হয়। না। এটা ঠিক আইনি সিদ্ধান্ত নয়, খানিকটা মানবিক সিদ্ধান্ত হতে পারে। বিভাগের সহকর্মীরা কেউ আপত্তি করলে তার মীমাংসা কী হতো, বলা দুষ্কর। তবে সকলেই এটা মেনে নিলেন, তাই কোনো সমস্যা হলো না।
এর আগে আমি দুটো নৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম–তার একটা রাখতে পারিনি। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্যে সকলকে ভূতাপেক্ষ দু বছরের জ্যেষ্ঠতা দেওয়ার সরকারি নিয়ম হয়েছিল। তার জন্য আবেদন করতে হতো। আমি ওই সুযোগ নেবো না মনে করে আবেদন করিনি। আমাদের সহকর্মী রণধীর বড়ুয়া তখন খুব কুণ্ঠিত হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তিনি আবেদন করবেন কি না। আমি বলেছিলাম, এটি আমার একান্তই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত–সকলের জন্য প্রযোজ্য নয়, তিনি অনায়াসে আবেদন করতে পারেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বকেয়া বেতনও দেওয়া হয়েছিল–যেসব শিক্ষক মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মে যোগ দেননি, তাঁদের সকলকে। আমি তার জন্যেও আবেদন করিনি এই ভেবে যে, এর মধ্যে অনেকটা সময়ে আমি বাংলাদেশ সরকারের বেতন নিয়েছি। পরে একসময়ে, অর্থসংকটের জন্যে, দরখাস্ত করে বকেয়া বেতন তুলে নিই। তবে জ্যেষ্ঠতা কখনোই দাবি করিনি। নীতিনিষ্ঠ হলে দ্বিতীয়বার বিভাগের সভাপতি হতাম না, কিন্তু উপাচার্য যখন দিলেন, তখন আপত্তি করলাম না।
এর অল্পদিন পর আচার্যের আহ্বান পেয়ে উপাচার্য আবুল ফজল ঢাকায় গেলেন, ফিরলেন প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা-পরিষদের সদস্য হয়ে। রেজিস্ট্রার জানালেন, উপাচার্য ফিরেছেন এবং আমাদের কয়েকজনকে ডেকে পাঠিয়েছেন। সাহিত্য-নিকেতনে। অধ্যাপক আবদুল করিম, রেজিস্ট্রার মুহম্মদ খলিলুর রহমান, আমি এবং আরো কেউ কেউ গেলাম, ড. মুহাম্মদ ইউনূস গিয়েছিলেন কি না মনে নেই। আমরা সবাই আবুল ফজলকে অভিনন্দন জানালাম। তিনি জানালেন, তাঁর স্থলাভিষিক্ত হবেন ড. করিম, তার নিয়োগপত্রও তিনি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন। আমরা অধ্যাপক করিমকেও অভিনন্দন জানালাম। আবুল ফজল বললেন, তিনি পরদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন এবং কয়েকটি জরুরি ফাইল সই করে তারপর কার্যভার হস্তান্তরিত করবেন। আমরা পরস্পর তাকাতাকি করলাম, শেষে আমিই বললাম, ‘সার, আপনি যেহেতু প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টার দায়িত্ব নিয়ে এসেছেন, সেহেতু আপনার পক্ষে আর বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ফাইল দেখা সমীচীন হবে না। তবে আপনি কোনো ইচ্ছা প্রকাশ করলে তা নিশ্চয় অপূর্ণ থাকবে না।’ তিনি আমার কথা সবটা বুঝলেন কি না জানিনা, বললেন, আমার কিছু কাজ করা বাকি রয়েছে–যেমন, মাহবুবউল্লাহ্র অ্যাড হক অ্যাপয়েন্টমেন্ট।’ তখন স্থির হলো, পরদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে পেছনের তারিখ দিয়ে তিনি কয়েকটি ফাইল সই করবেন।
২৮ নভেম্বর সকালে আবুল ফজল উপাচার্যের দায়িত্বভার অর্পণ করলেন আবদুল করিমকে। তখন পর্যন্ত আবদুল করিম কলা অনুষদের ডিনও ছিলেন। তাঁর মেয়াদের অবশিষ্ট অংশের জন্য কলা অনুষদের ডিনের দায়িত্ব আমি পেলাম।
এক সময়ে একান্তে আবুল ফজলকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, সামরিক শাসনের অধীনে তিনি রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা হতে সম্মত হলেন কেন? তিনি বলেছিলেন, বিচারপতি সায়েমের সনির্বন্ধ অনুরোধ তিনি এড়াতে পরেননি; তাছাড়া, উপদেষ্টার পদে থেকে এই দুঃসময়েও যদি ভালো কিছু করতে পারা যায়! এটি যে তিনি মন থেকে বিশ্বাস করেছিলেন, তাতে আমার সন্দেহ ছিল না।
বিশ্ববিদ্যালয়-পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে বিদায়-সংবর্ধনা জানানো হলো চট্টগ্রাম ক্লাবে এক অনুষ্ঠান করে। সেখানে আমিও কিছু বললাম–তাতে সেই সময়ের দুরূহতার ইঙ্গিত ছিল। বক্তৃতায় আবুল ফজল বললেন, এই সংকটকালে দেশের জন্যে কিছু করতে পারার আশায় তিনি এই গুরুদায়িত্ব নিয়েছেন, নইলে এই বয়সে বিদেশে গিয়ে থাকা তার অভিপ্রেত হতো না।
বেবী ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো, উপদেষ্টাকে কি খুব দেশের বাইরে থাকতে হবে?
বললাম, ‘উনি ঢাকায় থাকার কথা বোঝাতে চেয়েছেন।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন দায়িত্ব নিয়ে আমার চলা শুরু হলো।
এর মধ্যে লেখালিখির কাজ কিছু এগিয়েছে।
১৯৭২ সালের মার্চ মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের উদ্যোগে মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী ও আনোয়ার পাশা–শহীদ এই তিন শিক্ষক সম্পর্কে একটি বক্তৃতামালা আয়োজিত হয়। আয়োজকদের ইচ্ছায় সেখানে আমি ‘মুনীর চৌধুরীর সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে একটি প্রবন্ধ পড়ি। স্বাধীনতার পরে এটাই ছিল আমার প্রথম লেখা–ঢাকায় বসে লিখি। পরে চট্টগ্রামে এসে লিখি মুনীর চৌধুরীর জীবনী ও তাঁর সম্পর্কে আমার স্মৃতিকথা। মুনীর চৌধুরী নামে তা দৈনিক বাংলার রোববারের সাময়িকীতে তিন কিস্তিতে প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর ও ১৯৭৩ সালের জানুয়ারিতে। গ্রন্থাকারে এই প্রবন্ধ দুটি প্রকাশের প্রস্তাব ও পরিকল্পনা করে ভূঁইয়া ইকবাল ও মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর। জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী থেকে এটি প্রকাশের ইচ্ছা জ্ঞাপন করে মফিদুল হক। কিন্তু জাহাঙ্গীর যেহেতু আগেই কথাটা পেড়েছে, সুতরাং, তার দাবি, তার কথাই শিরোধার্য। ফলে, ‘থিয়েটার থেকে রামেন্দু মজুমদার এটি প্রকাশ করলো, আর পরিবেশনের ভার নিলো জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী। আমি বিলেত থেকে ফিরে পুনর্লিখন। করলাম। বইটি মুদ্রিত হলো বাংলা একাডেমি প্রেসে–আফজাল হোসেনের যত্নে। মুনীর অপটিমার ফন্ট ব্যবহার করে চমৎকার প্রচ্ছদ করে দিলেন। কাইয়ুম চৌধুরী। মুনীর চৌধুরী বের হলো ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বরে। বইটি উৎসর্গ করি লিলি চৌধুরীকে।
