৩ নভেম্বর সকাল থেকে ঢাকা বেতারে অনুষ্ঠান প্রচারিত হচ্ছিল না। তা থেকেও অনেক গুজবের জন্ম হয়। রাতে বেতারের এক ঘোষণায় বলা হয়, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিহত চারজন রাজনৈতিক নেতার হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে তদন্ত করার জন্যে রাষ্ট্রপতি একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। বিচারপতি আহসানউদ্দীন চৌধুরী এর সভাপতি, বিচারপতি কে এম সোবহান ও বিচারপতি সৈয়দ মুহম্মদ হোসেন সদস্য। নিহত নেতা কারা, বেতারে তা বলা হয়নি। আমি বেবীকে বললাম, আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এঁরা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামান।
সেদিন সকালে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে এক অভ্যুত্থান ঘটে–শোনা যায়, তার লক্ষ্য ছিল বঙ্গভবন থেকে খুনি সামরিক কর্মকর্তাদের বহিষ্কৃত করা। মেজর-জেনারেল জিয়া বন্দি হন, খালেদ মোশাররফ ঘোষিত হন সেনাবাহিনী-প্রধান বলে। ৪ তারিখে বঙ্গবন্ধু-হত্যার প্রতিবাদে যে-মিছিল হয়। ঢাকা শহরে, তাতে যোগ দেন রাশেদ মোশাররফ ও তাঁদের মা। তাতে খালেদ মোশাররফ চিহ্নিত হন আওয়ামী লীগের সমর্থক ও ভারতপন্থী বলে। খালেদ চাপ দেন মোশতাককে। ফলে খুনি সামরিক কর্মকর্তারা দেশ ছেড়ে ব্যাংককে চলে যেতে বাধ্য হয়। ৫ তারিখে প্রধান বিচারপতি আবুসাদাত মোহাম্মদ সায়েমের কাছে ক্ষমতা অর্পণ করেন মোশতাক। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়ে সংসদ বাতিল করেন বিচারপতি সায়েম, তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্বও গ্রহণ করেন। ৭ তারিখে সিপাহী বিপ্লব’ বলে পরিচিত আরেক অভ্যুত্থানে খালেদ এবং আরো কয়েকজন সেনা-কর্মকর্তা নিহত হন, মুক্ত হন। জিয়া। পরে নৌবাহিনী-প্রধান ও বিমানবাহিনী প্রধানের মতো তিনি নিজেও উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের পদবি গ্রহণ করেন, কিন্তু ক্ষমতার চাবিকাঠি তার হাতে রয়ে যায়।
৪.
অল্পকালের মধ্যে জানা গেল যে, ৭ নভেম্বরের সিপাহি বিপ্লব-সংগঠনে কাজ করেছে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা নামে একটি সদ্যগঠিত সংগঠন এবং তার পেছনে কাজ করেছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের নেতারা, বিশেষ করে কর্নেল তাহের। তাই আশ্চর্য নয় যে, বিপ্লবের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করেন মেজর এম এ জলিল ও আ স ম আবদুর রবের মতো নেতারা। জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করতেও কর্নেল তাহেরের ভূমিকা ছিল প্রধান। মুক্তিলাভ করেই জিয়া নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক বলে ঘোষণা করেছিলেন বেতারে–সে-ঘোষণা আমি শুনিনি, তবে অনেকেই শুনেছিলেন। পরে রাষ্ট্রপতি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করলে সেনাবাহিনী-প্রধানরূপে জিয়া উপ-প্রধান সামরিক প্রশাসকের পদ গ্রহণ করেন, কিন্তু তার ওই প্রথম ঘোষণাটি তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার ঘোষিত লক্ষ্য জওয়ানদের উন্নততর জীবনযাত্রার ব্যবস্থা করা এবং তার দাবিনামার মধ্যে ছিল সেনা-কর্মকর্তা ও জওয়ানদের পার্থক্য লোপ করা, তাদের জন্য একইরকম বেতন-স্কেল, বাসস্থান ও অন্যান্য সুবিধা প্রবর্তন করা, এবং ব্যাটম্যানের পদ লুপ্ত করা। জওয়ানদের রোষবশত ৭-৮ তারিখে তাদের হাতে কেবল অফিসার হওয়ার কারণে অনেকে নিহত হন–আমাদের এক পরিচিত মহিলা-চিকিৎসকও তার মধ্যে একজন। তার অবহেলায় কোনো এক জওয়ানের স্ত্রীর মৃত্যু হয়–এই ছিল অভিযোগ। এহেন বিপ্লবী সৈনিকদের দাবি কোনো সরকারের পক্ষে কতটা। পূরণ করা সম্ভবপর, কে বলবে!
কয়েকদিনের মধ্যেই কর্নেল তাহের, মেজর জলিল, আ স ম আবদুর রব এবং তাদের মতাবলম্বী আরো কয়েকজন গ্রেপ্তার হলেন। শোনা গেল, তাঁদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতা এবং সরকার উৎখাত করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে মামলা হবে। এরই প্রতিক্রিয়ায় পরদিন কর্নেল তাহেরের দুই ভাইসহ জাসদের বেশ কয়েকজন কর্মী ভারতীয় হাই কমিশনার সমর সেনকে অপহরণের চেষ্টা করেন। হাই কমিশনে কর্তব্যরত পুলিশদের গুলিতে কয়েকজন হতাহত হন–এঁদের অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা। গুলিতে সমর সেনও সামান্য আঘাত পান। ১৯৭১এর ডিসেম্বরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে এই সমর সেনই ভুট্টোর সঙ্গে তর্কযুদ্ধে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন। সমর সেনের অপহরণচেষ্টার সঙ্গে জড়িত আহত ব্যক্তিরা গ্রেপ্তার হন।
সে-সময়ে এটাও পরিষ্কার হয় যে, যেসব সাবেক ও কর্মরত সামরিক কর্মকর্তার নেতৃত্বে ১৫ আগস্টের রক্তপাত ঘটে, জেলখানার অভ্যন্তরে ৩ নভেম্বরের হত্যাকাণ্ড তাঁরাই ঘটিয়েছেন। সেই রাতে তাঁদের কয়েকজনকে ব্যাংককে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, অনেকে পরিবার নিয়েই চলে যান। ব্যাংককে তাঁরা সাংবাদিকদের জানান যে, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রে তারা রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন। ৭ নভেম্বরের পরে শোনা যাচ্ছিল, তারা দেশে ফিরে আসছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান বা থাইল্যান্ডে আশ্রয় না পেয়ে তারা চলে গেছেন লিবিয়ায়। সেদেশে তাদের আশ্রয়লাভের পশ্চাতে পাকিস্তানের হাত ছিল বলে শোনা যায়। পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক দ্রুত গড়ে উঠছে–উভয় দেশে রাষ্ট্রদূত-বিনিময় হয়েছে। এককালের আওয়ামী লীগ-নেতা, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, ১৯৭০এর জাতীয় পরিষদ-সদস্য, ১৯৭১এ পাকিস্তানের সহযোগী জহিরউদ্দীন সেদেশে আমাদের প্রথম রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে রাষ্ট্রপতি সায়েম তাঁর বিশেষ সহকারী নিযুক্ত করেছেন বিচারপতি সাত্তারকে–যিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন পরিচালনা করেছিলেন সাফল্যের সঙ্গে। উভয়েই একসঙ্গে বিচারপতি থাকা ছাড়াও এক সময়ে শেরে বাংলার কনিষ্ঠ আইনজীবী ছিলেন–তাঁদের বন্ধুত্ব পাকিস্তানপূর্ব যুগের। রাষ্ট্রপতি আর বিচারপতি একসঙ্গে শুনতে ভালো লাগে না বলে এখন প্রেসিডেন্ট বিচারপতি সায়েম বলা হচ্ছে।
