আব্বার অবস্থা জেনে আমার চাচাতো ভাই আমিনুজ্জামান খুলনা থেকে চলে এলো। আমরা পাঁচ ভাইবোন আর আমিন আবার সেই পাশের ঘরে পাটিতে বসেছি। মেজোবু কাঁদতে কাঁদতে বলছে, ‘তোমরা সবাই মন থেকে আব্বাকে ছেড়ে দাও, তাহলে তার কষ্টের শেষ হবে। তারপর আমাদের একেকজনকে জিজ্ঞেস করে, ‘ছেড়েছ? কেউ হ্যাঁ বলে, কেউ চুপ করে থাকে। শেষে সে পড়ে বড়োবুকে নিয়ে : ‘তুমি ছাড়তে পারছ না বলে আব্বা যেতে পারছে না। ছেড়ে দাও, আব্বাকে ছেড়ে দাও।’ এক পর্যায়ে বড়োবু অস্ফুটস্বরে বলে, ‘দিলাম।
২৭ অক্টোবর ভোরে আব্বার শেষ নিশ্বাস পড়ল। খানিক পরেই আমাদের আলেম মামা সৈয়দ মজহার আলী–যিনি দীর্ঘকাল ঢাকা বেতারে কোরান তেলাওয়াত ও তরজমা পাঠ করতেন–এসে গেলেন কিছু না জেনেই।
বড়োবু হঠাৎ করেই তাকে জিজ্ঞাসা করলো, ‘লোকে যে বলে মরাবাড়িতে চার দিন চুলো জ্বালাতে নেই–এমন কোনো নিয়ম আছে?’
মামা বললেন, মানুষ শোকগ্রস্ত থাকে বলে রান্নাবান্নার ব্যবস্থা করে উঠতে পারে না–আত্মীয়-প্রতিবেশীরা খাবার পাঠায়। পারলে নিজেদেরই রান্নাবান্না করা ভালো। চুলো জ্বলল। আমরা চা খেলাম। আমি টেলিফোন নিয়ে বসলাম খবর দিতে। আহমদ এসে বেতারে খবর প্রচারের ব্যবস্থা করলো। নেয়ামাল এসে আব্বার মৃত্যুসংবাদ লিখতে বসলো। সে কিছু তথ্য চায়। আমি বললাম, ‘আমিই বরঞ্চ লিখি।’ লিখলাম, নেয়ামাল কপি করলো। আবুল হাসনাত, হায়াৎ মামুদ–এরা সব কাগজে খবর পৌঁছোনোর দায়িত্ব নিল। একদিন পর দৈনিক বাংলায় স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ আব্বা সম্পর্কে লিখেছিলেন ‘একজন সাহিত্যানুরাগী চিকিৎসক’ নামে একটি চমৎকার স্মৃতিকথা।
বায়তুল মোকাররমে বাদ জোহর জানাজা। নারিন্দার পীর নজরে ইমাম সাহেব জানিয়েছেন, উনি আসবেন জানাজায় শরিক হতে। তার শ্বশুর পীর আবদুস সালামের সময় থেকে ওই পরিবারের সঙ্গে আব্বার সৌহার্দ্য। প্রয়োজনে তারা আব্বার ওষুধ খান, আব্বা তাদের দোয়া চান। পীর সাহেব আসছেন জেনে সাকা মামুর সংকোচের শেষ নেই। তিনি পীর সাহেবের মুরিদ, পীর সাহেবকে কাতারবন্দি করে তিনি নামাজ পড়াবেন কী করে, পীর সাহেবকে কথাটা বলবেই বা কে?
আমিই বললাম। পীর সাহেব অতি সজ্জন, সৌজন্যপরায়ণ, মহানুভব। বললেন, এটা আপনার আব্বার ওয়াসিয়ত–তাই করতে হবে।’ তিনিই মামাকে ডেকে বললেন জানাজা পড়াতে।
আজিমপুর গোরস্থানে মায়ের কবরের পাশে আব্বা নিজের জন্যে জায়গা কিনে রেখেছিলেন। সেখানেই তাঁর মাটি হলো।
কুলখানির পরদিন রাতের ট্রেনে রওনা হয়ে ১ নভেম্বর সকালে চট্টগ্রামে। পৌঁছলাম। ততদিনে ক্যাম্পাসে আমার নামে বাড়ির বরাদ্দ পেয়ে গেছি।
স্টেশনে পরিচিত কে-একজন জানতে চাইলেন, ঢাকা থেকে কী খবর নিয়ে এসেছেন? ৩ তারিখে নাকি কু হচ্ছে?
পালটা প্রশ্ন করলাম, ‘অগ্রিম তারিখ জানিয়ে কু্য হয় নাকি?
৩.
বঙ্গবন্ধু-হত্যার পর থেকে প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক জীবনে কোনো না কোনো ঘটনা ঘটছে। বঙ্গবন্ধু-হত্যার পরদিনই নতুন সরকারকে সমর্থন জানিয়ে মওলানা ভাসানী বার্তা পাঠালেন। কয়েকদিনের মধ্যে সউদি আরব ও চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলো। সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী, কামারুজ্জামান, আবদুস সামাদ আজাদ, কোরবান আলী প্রমুখ। নেতা প্রথমে এবং জিল্লুর রহমান, তোফায়েল আহমেদ, আব্দুর রাজ্জাক প্রভৃতি পরে গ্রেপ্তার হলেন। জেনারেল এম এ জি ওসমানী রাষ্ট্রপতির প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা নিযুক্ত হলেন; জেনারেল কে এম সফিউল্লাহ ও এয়ার ভাইস-মার্শাল এ কে খন্দকার রাষ্ট্রদূত হলেন; মেজর-জেনারেল জিয়াউর রহমান হলেন সেনাবাহিনীর প্রধান। অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে বঙ্গভবনে সংসদ সদস্যদের সভা আহ্বান করলেন রাষ্ট্রপতি–সেখানে নাস্তানাবুদ হলেন তিনি। কাদের সিদ্দিকী অস্ত্র হাতে তুলে নিলেন বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের একদল মুজিব-হত্যার প্রতিবাদে, একদল মোশতাকের সমর্থনে মিছিল করলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রামী ছাত্রসমাজে’র নামে প্রচারপত্র বের হলো ‘শেখ মুজিবের দালাল শিক্ষকেরা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়’ শিরোনামে। দুর্নীতির দায়ে প্রথমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মযহারুল ইসলাম, পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আবদুল মতিন চৌধুরী গ্রেপ্তার হলেন।
বেতারে মযহারুল ইসলামের গ্রেপ্তারের খবর পেয়ে আমি গিয়েছিলাম সৈয়দ আলী আহসানের সঙ্গে দেখা করতে তিনি তখন আজিমপুর কলোনিতে ভাইয়ের বাসায় ছিলেন। দেখলাম, খবরটা উনি জানেন। আমি বললাম, ‘সার, মনে হয়, সরকার আপনাকে কিছু করতে চাইবে–আপনার সম্মত হওয়া উচিত হবে না।’ তিনি বললেন, ‘না, আমি আর কোনো দায়িত্ব নিতে যাচ্ছি না–অনেক হয়েছে। পরে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিযুক্ত হওয়ার পরে আবার দেখা করতে গিয়েছিলাম। তিনি বললেন, ‘মোশতাক কিছুতেই ছাড়ল না। বললাম, ‘আপনি দেখা না করতে গেলেই পারতেন।’ তিনি বললেন, ‘এমন করে খবর পাঠালো যে না-গিয়ে পারলাম না।’
গুজবেরও অন্ত নেই। যেমন, ভারতীয় হেলিকপ্টার আসছে–জেলখানা থেকে তাজউদ্দীনকে উদ্ধার করে তাকে ক্ষমতায় বসাবে। দায়িত্বশীল বলে পরিচিত সাংবাদিকেরাও অত্যন্ত দায়িত্বহীন সংবাদ পরিবেশন করেন। তাতে উত্তেজনা ও বিভ্রান্তি বাড়ে।
