পরে সচিবালয়ে একদিন অর্থমন্ত্রী ড. এ আর মল্লিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলাম। তিনি আমাকে তার বাড়িতে নিয়ে গেলেন। দুপুরের খাবার খেতে খেতে শোনালেন মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগদানের কাহিনি। মন্ত্রিত্ব নিয়ে আত্মগ্লানিতে ভুগছেন। দু হাত প্রসারিত করে বললেন, ‘মন্ত্রিত্ব যে করছি, মনে হয়, বঙ্গবন্ধুর রক্ত আমার হাতে লেগে রয়েছে।’ চোখে তার অশ্রু।
১৬ আগস্টে টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু সমাধিস্থ হন। হেলিকপ্টারযোগে লাশ নিয়ে গিয়ে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে দাফন করা হয়। কীভাবে কাফনের কাপড় সংগৃহীত হয়, কীভাবে কাপড়-ধোওয়া সাবান দিয়ে তাকে গোসল করানো হয়, যারা তার দাফন সম্পন্ন করেছিলেন, সেনাবাহিনীর সদস্যরা তাদের সঙ্গে কেমন দুর্ব্যবহার করেছিল, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মুখে তার বিবরণ শুনেছিলাম অনেকদিন পরে।
২.
আব্বার চিকিৎসার বিষয়ে একে একে কথা বললাম ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও ডা. নূরুল ইসলামের সঙ্গে–তাঁদেরকে আমার কৃতজ্ঞতাও জানালাম। ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ডা. ফজলুল হকও আব্বাকে দেখেছিলেন–তার সঙ্গে দেখা করতে গেলাম ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তিনি বললেন, ক্যানসারের চিকিৎসা করে হয়তো ছ মাস থেকে এক বছর আব্বাকে টিকিয়ে রাখা যেতে পারে, কিন্তু এই বয়সে কেমোথেরাপি দিলে তিনি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় কষ্ট পাবেন। তবে সিদ্ধান্ত আমাদের। আব্বাকে যিনি নিত্য দেখেন, ড. করিম, তার সঙ্গে আমাদের আগেই কথা হয়েছিল।
আব্বা এখন থাকছেন বিয়ের আগে আমি যে-ঘরটায় থাকতাম, সেখানে। তার পাশের ঘরে যেখানে তিনি বরাবর থেকে এসেছেন, তার মেঝেতে পাটি পেতে আমরা পাঁচ ভাইবোন বসলাম সিদ্ধান্ত নিতে। আখতার প্রথম থেকেই বলতে থাকল, আমরা যা সিদ্ধান্ত নিই, তার সঙ্গে সে একমত হবে, তার কিছু বলার নেই। আমি বললাম, এই অবস্থায় কেমোথেরাপি না দিয়ে প্যালিয়েটিভ দেওয়াই ভালো হবে। ছোটোবু আমার সঙ্গে একমত হলো। মেজোবু একটু চিন্তা করে বললো, ‘চিকিৎসা করতে গিয়ে আব্বার কষ্ট বাড়ুক, তা আমি চাই না।’ বড়োবু কিছুই বলতে পারছিল না। মেজোবু কেঁদে ফেলে তাকে বললো, ‘তুমি চুপ করে থাকলে হবে না। তোমার যা ইচ্ছে তা খুলে বলতে হবে।’ আরো কিছুক্ষণ সময় নিয়ে বড়োবু বললো, তোমরা যা বলছ, তাই হোক।’ এবারে তিন বোনই কাঁদতে লাগলো। খানিকক্ষণ পরে সবাই উঠে দাঁড়ালাম। মনে হলো, আমরা সব ভাইবোন মিলে আব্বাকে মৃত্যুদণ্ড দিলাম। আব্বাকে আমাদের সিদ্ধান্ত জানানো হলো–তিনি তা মেনে নিলেন। ডা. করিমকেও বললাম–তিনি তা অনুমোদন করলেন।
আব্বার কষ্ট ক্রমশ বাড়তে থাকল। তিনি একদিন আমাকে বললেন, আমার মনে হচ্ছে, আমার সমস্যা লাংসে, কিন্তু ডাক্তাররা বোধহয় সেটা ধরতে পারছে না। তারা এটা-ওটা করছে, কিন্তু রোগের চিকিৎসা করতে পারছে না।’
এ-কথা শুনে অশ্রু গোপন করা ছাড়া আমার আর কিছু করার ছিল না।
বেবীদের ঢাকায় রেখে আমাকে চট্টগ্রামে এসে কর্তব্যকর্মে যোগ দিতে হলো। উঠলাম আবু হেনা মোস্তফা কামালের বাসায়। দেখলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে রাজনৈতিক পরিস্থিতি-বদলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। ভারতবিরোধী ও পাকিস্তানি ভাবাপন্ন কথাবার্তা প্রকাশ্যে বলতে কেউ আর এখন দ্বিধা করছেন না–আওয়ামী লীগ, শেখ মুজিব ও তাজউদ্দীনের নিন্দাবাদ চলছে। আমি রুশ-ভারতের দালাল বলে অনেকের কাছে গণ্য হয়েছি, কেউ কেউ আমার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করছেন, কেউ কেউ বলছেন–আমি ভারত থেকে এসেছি, সেখানেই আমার ফিরে যাওয়া উচিত। স্বাধীনতালাভের পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের স্বার্থহানির আশঙ্কায় যারা আমার আনুকূল্য প্রার্থনা করেছিলেন, দেখলাম, আমার প্রতি তাদেরই রোষ অধিক। এঁদের মধ্যে এমনো একজন ছিলেন, যার কোনো ক্ষতি যাতে না হয়, ১৯৭২ সালে আমি তা দেখেছিলাম।
চট্টগ্রামে গিয়ে আমি ড. আউয়ালের কাছ থেকে বিভাগের দায়িত্ব বুঝে নিলাম। তারপর উপাচার্যকে বললাম, আমি বিভাগের সভাপতির পদ ত্যাগ করতে চাই যাতে সৈয়দ আলী আহসান সভাপতি হতে পারেন। আবুল ফজল, মনে হলো, খুশিই হলেন। সৈয়দ আলী আহসানকে বলায় তিনি বললেন, তার কোনো প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম যে, প্রশাসনিক দায়িত্বে এতকাল অভ্যস্ত থেকে কেবল বিভাগের অধ্যাপক হয়ে থাকা তার জন্যে অস্বস্তিকর। তিনি সভাপতির দায়িত্ব পেয়ে খুশিই হলেন। শুধু ড. ইউনূস আমাকে কিঞ্চিৎ ভর্ৎসনা করলেন। বললেন, আপনার বিভাগে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন আইনের স্পিরিট যাচাই করার একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল–ওখানেই সিনিয়র থাকতে জুনিয়র বিভাগের দায়িত্ব পালন করছিলেন। আপনি সেটা নষ্ট করে দিলেন।
চট্টগ্রামে আমি একনাগাড়ে থাকতেও পারছিলাম না। ছুটিছাটা থাকলে তো ঢাকায় চলেই আসি–আব্বার অবস্থার অবনতি হলে ঢাকা থেকে খবর যায়, আমি তদ্দণ্ডেই ঢাকা রওনা হই, এসব ক্ষেত্রে প্লেনেই। এমনো হয়েছে যে, ট্রেনে করে সকালে চট্টগ্রামে এসে পৌঁছেছি, বিকেলেই ঢাকা থেকে খবর গেল। আমি সন্ধ্যার ফ্লাইট ধরে ঢাকায় আবার ফিরে এসেছি।
শেষ কদিন খুব কষ্ট পেলেন আব্বা। হঠাৎ করে বুকের জ্বালা-যন্ত্রণায় শোওয়া-অবস্থা থেকে লাফ দিয়ে বিছানা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়তেন। কিংবা মেঝেতে শুয়ে পড়তেন। আমাদের মামা সৈয়দ সাখাওয়াত আলী রোজ এসে দোয়া-দরুদ পড়ে যেতেন কিছুক্ষণ। আব্বা আমাকে ডেকে বললেন, ‘দেখো, তোমার সাকা মামু যেন আমার জানাজা পড়ায়।
