বুঝলাম, তাদের যেমন দলে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, তেমনি দলে যোগ-না-দেওয়ার বিপদ সম্পর্কেও সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। অনেকেই তো সোৎসাহে যোগ দিচ্ছেন–যোগদানে অনিচ্ছুকদের সংখ্যা অল্প। আমাদের সহকর্মীদের অনেকে যোগ দিয়েছেন, অন্যেরা যাতে যোগ দেয়, তা নিশ্চিত করাও কেউ কেউ নিজের কর্তব্য বিবেচনা করছেন–এঁদের নিয়েই বিপদ। এই অবস্থায় বাইরে থেকে পরামর্শ দেওয়া সহজ নয়।
বাড়ির টেলিফোন কাজ করছে না। সুতরাং লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতেও পারছি না। সবাই মিলে একবার শ্বশুরবাড়ি ঘুরে এসেছি, এইমাত্র। অনেকদিন পর ফিরেছি, অসুস্থ বাপের সঙ্গেই নাহয় সময় কাটাই। কয়েকদিনের মধ্যেই তো চট্টগ্রামে চলে যাবো।
১৪ তারিখ এভাবে কাটলো। ১৫ তারিখ সকালে তখনো ঘুম থেকে উঠিনি। দরজায় করাঘাত করে আব্বা বললেন, ‘শেখ সাহেবকে মেরে ফেলেছে–রেডিওতে বলছে। সেই মুহূর্তের প্রতিক্রিয়া ভাষায় ব্যক্ত করা শক্ত। খুব বড়রকম শূন্যতা বোধ করেছিলাম, এটুকু শুধু বলতে পারি। পাকিস্তানিরা যা করতে সাহস করেনি, এ দেশে জাত কিছু লোক তা অনায়াসে করে ফেললো–ভাবতেও অবাক লাগে! খবরটা দেওয়ার সময়ে আব্বার কণ্ঠস্বরে দুঃখের আভাস ছিল না–তাতেও খুব ব্যথিত হয়েছিলাম।
বেতারের সামনে এসে বসলাম। মেজর ডালিমের উদ্ধত ঘোষণা শুনলাম। তারপর নতুন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমাদের ভাষণ। দেশে সামরিক আইন জারি হয়েছে–তিনি সর্বময় ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন। ভাষণ শেষ হলো ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ দিয়ে। অভ্যুত্থান যে পাকিস্তানপন্থীরা ঘটিয়েছে, এ যেন। তারই প্রকাশ্য ইঙ্গিত।
বঙ্গবন্ধু, আবদুর রব সেরনিয়াবাত ও শেখ ফজলুল হক মনির পরিবারের সবাই যে নিহত হয়েছেন, তা ধীরে ধীরে জানা গেল। প্রথম ধাক্কা সামলে নেওয়ার পরে আমার মনে হলো, কামাল হোসেনের পরিবার অরক্ষিত। বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটা রিকশা নিয়ে চললাম কাকরাইলে বড়োবুর কাছে। রাস্তায় লোকজন কম, কিন্তু যারা চলাচল করছে, তাদের দেখে মনে হচ্ছে না, এমন ভয়ংকর একটা ব্যাপার ঘটে গেছে। বড়োবুদের জিজ্ঞাসা করলাম, প্রয়োজন হলে কামালের পরিবারকে তাদের বাসায় এনে তোলা যাবে কি না। বড়োবু ও দুলাভাই নির্দ্বিধায় সম্মতি দিলেন। ওঁদের ওখান থেকে ফোন করে হামিদাকে বললাম, আমি আসছি। নিউ ইস্কাটন রোডে সরকারি কোনো সংস্থার অতিথি ভবনে কামালের সরকারি বাসস্থান। সেখানে পৌঁছে হামিদাকে বললাম, সরকারি বাড়িতে থাকা তাদের জন্যে নিরাপদ নয়। ঠাটারিবাজারে আমাদের বাড়িতে সুবিধের অভাব–কাকরাইলে আমার বোনের বাড়িতে বলে এসেছি, সেখানে তাঁদের নিয়ে যেতে চাই। নিরাপত্তার যে অভাব, তা অস্বীকার করলেন না হামিদা, কিন্তু তাঁদের সঙ্গে তাঁর শাশুড়ি আছেন–তাঁকে অন্য কোথাও যেতে রাজি করানো যাবে না।
কামালের মায়ের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বুঝতে পারলাম, পরিস্থিতির বাস্তবতা তাকে বোঝানো সম্ভবপর নয়।
এমন সময়ে কামালের মামাতো ভাই সৈয়দ আলী কবীর এলেন। তিনিও এসেছেন সকলকে নিয়ে যেতে। হামিদাকে বললেন দ্রুত গুছিয়ে নিতে; ফুফুকে বললেন, কোনো কথা নয়–একটা ব্যাগ বা স্যুটকেস গুছিয়ে নিন, কদিন আমার বাড়িতে থাকবেন। আমাকে বললেন, যদি আমার বাড়ি থেকে ওদের সরে যেতে হয় কোনো কারণে, তাহলে তোমাকে খবর দেবো। আমি সকলকে। রেখে চলে এলাম।
রাস্তা ধরে হাঁটছি আর রিকশার খোঁজ করছি। এমন সময়ে দেখি, সিভিল সার্ভিসের সদস্য এম এম রেজা আমাকে ডাকছেন তার রিকশায় উঠতে। উঠে পড়লাম। বললাম, নীলক্ষেতে যাবো, রাজ্জাক সারের বাসায়।
সেখানে যেতে যেতে অনেক কথা হলো দুজনে। ঘটনার আকস্মিকতা ও নির্মমতায় আমরা উভয়েই হতচকিত ও মর্মাহত। যে যা গুজব শুনেছি, তা। বিনিময় করলাম।
রাজ্জাক সাহেব আমাকে দেখে অবাক হলেন, জানতে চাইলেন কোত্থেকে আসছি। আমার জবাব শুনে বললেন, হামিদাদের কথা তারই আগে মনে। হওয়া উচিত ছিল। তাঁর ভ্রাতৃবধূ–আমাদের হেলু আপা–বললেন তাঁদের বাসায় ওঁদের নিয়ে আসতে। বললাম, আপাতত তার দরকার হচ্ছে না, পরে দেখা যাবে।
রাজ্জাক সাহেবের কাছে শুনলাম, আত্মীয়তার সূত্রে মেজর ডালিম গিয়েছিল তার ওখানে–ঘটনা ঘটিয়ে। তার সঙ্গে ছিল কর্নেল ফারুক। দেশের রাজনীতি অর্থনীতি বিষয়ে সারের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিল ফারুক। সার বলেছিলেন, পয়সা খরচ করে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে ছাত্রেরা তাঁর সঙ্গে এসব বিষয়ে। আলোচনা করে। তিনি শুধু শুধু একজনের সঙ্গে তা নিয়ে আলাপ করবেন কেন? তার যদি এতই জ্ঞানপিপাসা থাকে, নিউ মার্কেট থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতির নোটবই কিনে নিলে সে লাভবান হবে।
ডালিম ও ফারুক যে সারের বাসায় এসেছিল, তা নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের কোনো শিক্ষক–রাজ্জাক সাহেবেরই ছাত্র–কিছু অপপ্রচারণা চালিয়েছিল। হয়তো আরো কেউ কেউ বিভ্রান্ত হয়েছিলেন।
সারের বাসা থেকে বড়োবুকে ফোন করে জানালাম, তার বাড়িতে কেউ থাকতে যাচ্ছে না। বাড়ি ফিরতে বেশ দেরি হলো। এর মধ্যে সশস্ত্র বাহিনীর তিন প্রধান, বাংলাদেশ রাইফেলসের মহাপরিচালক, রক্ষীবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক, পুলিশের মহাপরিদর্শক বেতারযোগে নতুন সরকারের প্রতি আনুগত্য জ্ঞাপন করলেন–বলা উচিত, আনুগত্য জ্ঞাপন করতে বাধ্য হলেন। মন্ত্রিসভা গঠিত হলো : মোহাম্মদউল্লাহ উপ-রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত হলেন, আগের মন্ত্রিসভার মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা থেকে গেলেন, থাকলেন না সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, এ এইচ এম কামারুজ্জামান, আবদুস সামাদ আজাদ ও কোরবান আলী। বঙ্গবন্ধুর সময়ে চাকুরিচ্যুত নূরুল ইসলাম মঞ্জুর প্রতিমন্ত্রীর পদে প্রত্যাবর্তন করলেন। বেশির ভাগ মন্ত্রীকেও যে সেনাবাহিনীর সদস্যদের পাহারায় বঙ্গভবনে নেওয়া হয়েছিল, সে-খবরও পাওয়া গেল।
