শেষ পর্যন্ত ওয়েলসেই যাওয়া হলো। প্রথমে মার্থার টিডফিল্ডে এবং পরে উত্তরদিকে উপসাগরের পাড় ঘেঁষে বাঙ্গোর প্রভৃতি স্থানে। বাঙ্গোর আমাদের বেশ ভালো লেগেছিল–সতার-না-জানা মানুষ সমুদ্রের উপকূলে যতটা দাপাদাপি করতে পারে, আমরা সকলে তা করলাম।
বাঙ্গোরে এক বাঙালি রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে দেখা গেল, বেয়ারা আমাকে ঠিকই শনাক্ত করেছে। নিজের পরিচিতি বঙ্গদেশ ছাড়িয়ে বাঙ্গোর পর্যন্ত পৌঁছেছে জেনে আত্মশ্লাঘা জাগলো। তারপরই রহস্যভেদ। লন্ডনের বাংলা সাপ্তাহিক জনমরে সাম্প্রতিকতম সংখ্যার একটি সচিত্র প্রতিবেদনে আমি অন্তর্ভুক্ত। তা সত্ত্বেও কিংবা সে-কারণেই রেস্টুরেন্টে বেশ খাতির পাওয়া গেল।
লন্ডনে ফিরে এসে বিদায় নেওয়ার পালা। খাওয়া-দাওয়ার এক-আধটা আয়োজন নিজের বাড়িতেও করা হয়েছিল। তার একটিতে মিসেস জেমস আসতে পেরেছিলেন।
আমি চলে আসার আগে সোয়াসের ডাইরেক্টর প্রফেসর ফিলিপস একদিন মধ্যাহ্নভোজে আপ্যায়িত করেছিলেন। তিনি বাংলাদেশের ছাত্রদের পড়াশোনার কথা তুলেছিলেন এবং একজন সম্পর্কে হতাশা ও বিরক্তি জ্ঞাপন করেছিলেন। ব্যাপারটা আমার খুব স্বাভাবিক মনে হয়নি। তিনি কি চেয়েছিলেন সেই ছাত্রকে আমি তার মনোভাব জ্ঞাপন করি? কিন্তু তার সঙ্গে যে আমার তেমন ঘনিষ্ঠতা নেই, তা আমি তাঁকে জানিয়েছিলাম। আমি অবশ্য শেষ পর্যন্ত কাউকেই কিছু বলার চেষ্টা করিনি।
২৪.
আগস্টের ১২ তারিখে সরকারি সফরে ড. কামাল হোসেনের যুগোস্লাভিয়া যাওয়ার কথা। তিনি লন্ডনে এলেন আগের দিন এবং এত্তেলা পাঠালেন। ১২ আগস্ট আমিও সবাইকে নিয়ে দেশে ফিরে যাবো।
কামাল আমাকে খুব করে অনুরোধ করলেন আর-কিছুদিন লন্ডনে থেকে যেতে। কারণটা এই : অক্সফোর্ডের সেন্ট অ্যান্থনিজ কলেজে বাংলাদেশ স্টাডিজের একটা চেয়ার সৃষ্টি করার চেষ্টা চলছিল কিছুকাল ধরে–সেটা প্রায় চূড়ান্ত হয়ে এসেছে। কামালের খুব ইচ্ছা, ওই পদটা আমিই প্রথম লাভ করি, এবং তিনি মনে করেন, আমি লন্ডনে থেকে গেলে আমার মনোনয়ন পেতে অনেক সুবিধে হবে। আমি আব্বার অসুস্থতার কথা বললাম এবং আমার পক্ষে যে কোনো অবস্থাতেই আর প্রবাসে থেকে যাওয়া সম্ভবপর নয়, তা বোঝাবার চেষ্টা করলাম। কামাল একটু ক্ষুণ্ণ হলেন বটে, কিন্তু আমার কথা মেনে নিলেন।
তাঁর সঙ্গে দেশের অবস্থা সম্পর্কে বেশি কথা হলো না। তিনি মন্ত্রিসভার সদস্য হয়েও যে বেশি স্বস্তিতে নেই, তা বোঝা যাচ্ছিল। তাছাড়া, দুদিন পর তো নিজেই দেশে ফিরে স্বচক্ষে সব দেখতে পাবো, তাকে বিব্রত করে আর কী লাভ!
ক্লাইভ রোডের যে-বাড়িতে আমরা থাকতাম, আমরা লন্ডন ছেড়ে আসার আগে তা ভাড়া নিতে এলেন হাসিনুর রেজা চৌধুরী। তাঁর অনুজ জামিলুর রেজা চৌধুরী আমাদের ঘনিষ্ঠ, হাসিনুর রেজার শ্বশুর এম এ বারীর (এককালে পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়ে বোর্ড ও পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান) পরিবারের সঙ্গেও আমাদের পরিচয় দীর্ঘকালের। তিনি সঙ্গে নিয়ে এলেন এম এ লস্করকে। লস্কর সাহেবও আমার দীর্ঘকালের পরিচিত, এক সময়ে তিনি মতিঝিলের কো অপারেটিভ প্রেসের ম্যানেজার ছিলেন। শুনেছিলাম, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে চলে গিয়েছিলেন সউদি আরবে। সেখান থেকে এসেছিলেন ইংল্যান্ডে। বাড়িটা সম্ভবত তাঁরই দরকার ছিল। লস্কর সাহেব প্রথম সাক্ষাতে একটু বিব্রত হলেন, কিন্তু পুরোনো পরিচয়ের দাবিতে তা কাটিয়ে উঠতে বেশি সময় নিলেন না। বাড়িওয়ালা এলেন, সব ব্যবস্থা হয়ে গেল।
আমরা বাড়ি ছেড়ে এবং জাহাজে মালপত্র পাঠাবার ব্যবস্থা করে গিয়ে উঠলাম হায়দারের কাউনসিল-ফ্ল্যাটে, এক বিশাল বাড়ির ১৪ তলায়। কষ্ট যা হওয়ার তা হায়দার ও হুসনার হলো। আমরা কটা দিন আনন্দেই কাটালাম। আমাদের বিদায় দিতে মামুনও এলো লন্ডনে। তারপর দেশে ফেরার পালা।
হননের কাল
১.
১৯৭৫ সালের ১৩ আগস্ট পরিবারের সবাইকে নিয়ে দেশে ফিরে এলাম। বিমানবন্দরে আত্মীয়স্বজন অনেকেই গিয়েছিলেন আমাদের আনতে। সেই সঙ্গে, একটু অবাক হয়েই দেখলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের কয়েকজন শিক্ষক-মনসুর মুসা, আবুল কাসেম ফজলুল হক, মোহাম্মদ আবু জাফর, আহমদ কবির–উপস্থিত। এরা সকলেই আমার প্রাক্তন ছাত্র। জানলাম, এরা আমার সঙ্গে কিছু পরামর্শ করতে চায়। বিকেলে এদের বাড়িতে আসতে বললাম।
আমাদের সঙ্গে পুনর্মিলিত হতে পেরে আব্বা খুব খুশি হলেন। এপ্রিল মাস থেকে তিনি শয্যাশায়ী, ডাক্তারি করা আর সম্ভবপর হচ্ছে না। তাঁর শরীর ভেঙে পড়েনি, কিন্তু চোখেমুখে অসুস্থতার ছাপ স্পষ্ট। তিনি যে ক্যানসারে আক্রান্ত, তা তাঁকে জানানো হয়নি। বুকে কষ্ট অনুভব করেন, সে-কথাটিই বললেন।
বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মীরা এলো। বাকশালে যোগ দিতে তাদের ওপর চাপ দেওয়া হচ্ছে, তবে তারা যোগ দিতে চায় না। ওদিকে চাপও বাড়ছে, এ-অবস্থায় কী তাদের করা উচিত, সে-সম্পর্কে আমার পরামর্শ চায়। বললাম, বাকশালে আমি যোগ দেবো না। তাতে যদি আমার কিছু অসুবিধে হয়, তার জন্যে তোমাদের ভাবিকে প্রস্তুত থাকতে বলেছি। আশা করি বাকশালে যোগ না দিয়ে আমি থাকতে পারবো। দরকার হলে বঙ্গবন্ধুকে বলতে পারবো, দলে যোগ না দেওয়ার স্বাধীনতা আমাকে দিন–উনি সেই সুযোগটা আমাকে দেবেন বলে বিশ্বাস করি। তোমাদের সেই সুবিধে নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি-অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
