আর-দশজন পর্যটকের মতো লন্ডনের যা দর্শনীয়, তার যতটা পারা যায়, সপরিবারে দেখা হয়েছিল ধীরে ধীরে। বরাবরের মতো কেনাকাটা যা করার বেবীই করেছে। আমি নিজের জিনিসপত্র কিছু কিনেছি, আর দরজি দিয়ে একটা কালো স্যুট বানিয়েছি। বেবী আর আমি হারডসের দোকান দেখতে গিয়েছিলাম একসঙ্গে–আমি কিনেছিলাম একটা টাই, আর সে একটা তোয়ালে। এই ছিল বিলাসিতার সীমা। সিনেমা-থিয়েটারে একসঙ্গে গেছি, তবে খুব বেশি নয়, আমি একাই গেছি বেশি। বাঙালিদের কিছু অনুষ্ঠানে আমরা একসঙ্গে গেছি। কমনওয়েলথ ইনস্টিটিউটে সেবার বাংলা নববর্ষ উদ্যাপিত হয়েছিল সাড়ম্বরে। সেখানে সপরিবারে যাওয়ার সুযোগ ঘটেছিল। বইয়ের দোকানে নিজে যথেষ্ট গেছি–লন্ডনে তো বটেই, অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজেও, এর মধ্যে কেমব্রিজের বইয়ের দোকানই আমাকে আকর্ষণ করেছে অধিক। লন্ডনের পুরোনো বইয়ের দোকান বরঞ্চ হতাশই করেছে। ফয়েলসে ততদিনে পুরোনো বইয়ের জায়গা নিতে শুরু করে দিয়েছে নতুন বই।
সপরিবারে আসা-যাওয়ার পথে একবার বিপদেই পড়েছিলাম। টিউবে সবাই উঠতে-না-উঠতেই গাড়ির দরজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। অনতিতরুণ দুই শ্বেতাঙ্গ নিজেদের সর্বশরীর ও সর্বশক্তি দিয়ে দরজা আগলে থাকায় কনডাক্টর-গার্ড আবার দরজা খুলতে বাধ্য হয়েছিলেন এবং সেই সুযোগে যারা গাড়িতে উঠতে পারিনি, তারা উঠে পড়েছিলাম। আমাদের উদ্ধারকারীদের ধন্যবাদ দিতে একজন তিন সন্তানের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছিল, ‘তোমার দু-হাত ভরা ছিল।’ আরেকজন বলেছিল, এরকম ঘটলে ঘাবড়ে যেও না। যারা গাড়িতে উঠে পড়েছ, তারা পরের স্টেশনের প্ল্যাটফরমে নেমে অপেক্ষা কোরো। যারা উঠতে পারোনি, তারা পরের গাড়িতে গিয়ে সেখানে ওদের সঙ্গে মিলিত হোয়য়া।
কাজের সূত্রে পরিচয় বাড়ছিল এক-আধজনের সঙ্গে। তার মধ্যে একজন ছিল আমাদের আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনের কৃষ্ণাঙ্গ টিকিট-চেকার। আমি ত্রৈমাসিক টিকিট কিনতাম। তখন যাত্রার সময়ে টিকিট দেখাবার কোনো আবশ্যকতা ছিল না–ফেরার পথে স্টেশন থেকে বেরোবার মুহূর্তে দেখাতে হতো। অল্পকালের মধ্যেই বিশেষ করে সেই চেকারের সঙ্গে ভালো চেনা হয়ে গেল। ফলে, অনেক সময়ে তাকে টিকিট না দেখিয়ে কেবল অভিবাদন করেই বেরিয়ে আসতাম। একদিন সে আমায় ডেকে বললো, দেখো, আমি জানি, তোমার কোয়ার্টার্লি টিকেট আছে। কিন্তু সবাই তো জানে না। তুমি যখন ‘গুড ইভনিং’ বলে বেরিয়ে যাও, তখন কেউ ভাবতে পারে, তোমাকে ব্যক্তিগতভাবে খাতির করে আমি তোমার টিকেট চেক করছি না। এটুকু বলতেই আমি শশব্যস্ত হয়ে বললাম, এখন থেকে আর এই ভুল হবে না। সে হেসে বললো, আমি বুঝি, কথাটা তোমার মনে ওঠেনি। কিছু মনে কোরো না কিন্তু।
আমাদের বাড়িতে যে দুধ সরবরাহ করতো, আনন্দ তাকে মিকম্যান ভাই বলে ডাকতো। সে-ও খুব মজা পেতো এই ডাকে, ভাই কথাটার অর্থ তাকে ব্যাখ্যা করে দেওয়া হয়েছিল। সে এলেই আনন্দ ছুটে যেতো এবং ব্যস্ততা সত্ত্বেও সে আনন্দের জন্যে দু-মিনিট সময় ব্যয় করতো। তার সঙ্গে আনন্দের। ছবি তোলা হলে সাগ্রহে সে ছবির এক কপি চেয়ে নিয়েছিল।
প্রতি মাসে দু-তিন তারিখের মধ্যে দৈনিক পত্রিকার বিল শোধ করতাম বাড়ির কাছে নিউজস্ট্যান্ডে গিয়ে। এর মালিক ছোটোখাটো দেখতে, বয়স্ক মানুষ, ককনি হওয়াই সম্ভবপর। বিল-পরিশোধের অবকাশে তার সঙ্গে কুশল-বিনিময় হতো, সামান্য দু-একটি কথা। যেদিন শেষ বিল দিতে যাই, সেদিন দেখি, বুড়োর চোখ ছলছল করছে। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি নিশ্চয় দেশে ফিরে যেতে পেরে খুশি হবে, তাই না? আচ্ছা, বাংলাদেশ কি অনেকদূর? প্লেনে যেতে কতো ঘণ্টা লাগে? আমার সঙ্গে দোকান থেকে বেরিয়ে তিনি কয়েক কদম হাঁটলেন। তারপর আকাশের দিকে একবার তাকিয়ে, আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘গড ব্লেস ইউ।’ তারপর চকিতে ফিরে গেলেন।
এখানে আরো একজনের কথা বলতে হয়।
মিস এলিজাবেথ ক্লার্কসন ছিলেন সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক। তিনি কিছুকাল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছিলেন। সে-সময়ে একদিন ঈশ্বরদী বিমানবন্দর থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মাইক্রোবাসে যেতে তার সঙ্গে আমার আলাপ হয়। সেই সূত্র ধরে চট্টগ্রামে বেড়াতে এসে তিনি আমাদের অতিথি হন। ভদ্রমহিলার বয়স হয়েছে, কিন্তু খুবই রসিক তিনি। রাজশাহীর কোনো সহকর্মীর রহস্যময় আচরণ ও কথাবার্তার গল্প করে তিনি আমাদেরকে খুব হাসিয়েছিলেন। তিনি যখন চট্টগ্রামে আসেন, তখন আমাদের বিলাতযাত্রা একরকম স্থির হয়ে গেছে। তিনি জানালেন। যে, আমরা ইংল্যান্ডে যেতে যেতে তিনিও সেখানে ফিরে যাবেন এবং সনির্বন্ধ অনুরোধ করে গেলেন, আমরা যেন অবশ্যই সপরিবারে সোয়ানসিতে বেড়াতে যাই–সেখানে থাকার ব্যবস্থা উনি করে দেবেন।
লন্ডনে যাওয়ার পর আমরা টেলিফোনে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করি আর তিনি প্রায়ই টেলিফোন করে তার আমন্ত্রণের পুনরাবৃত্তি করেন। শেষ পর্যন্ত আমরা সোয়ানসিতে যেতে পারিনি। এলিজাবেথ ক্লার্কসন যখন নিশ্চিত হন যে, আমরা যেতে পারছি না, তখন তিনি এক ছুটির দিনে লন্ডনে আসেন শুধু আমাদের সঙ্গে দেখা করতে। আমাদের বাসায় চা খেয়ে তিনি আবার ফেরার পথ ধরেন। তার এই সহৃদয়তা যে আমাদের খুব স্পর্শ করেছিল, তা বলা বাহুল্য।
২৩.
মামুনের সঙ্গে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, দেশে ফেরার আগে তার গাড়ির সঙ্গে ট্রেলার লাগিয়ে আমরা দুই পরিবার একবার প্যারিস দেখে আসবো। সেরকম প্রস্তুতিও নেওয়া হলো খানিকটা। কিন্তু বাদ সাধলো মীরা। সে ওই অবকাশে নাদিরাদের বাড়ি যাবে মার্থার টিডফিল্ডে-ইচ্ছে করলে আমরা ওয়েলসে খানিকটা ঘুরে নিতে পারি। আমরা হতাশ হলাম–বিশেষ করে, বেবী, এবং রুচিও খানিকটা–সে স্কুলে ফরাসি ভাষার প্রাথমিক পাঠ নিচ্ছিল, ফলে প্যারিস সম্পর্কে তার একটা আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল। লন্ডনে নেমেই তো আমরা একবার ওয়েলসে এসেছি–আবার সেখানে কেন?
