আমার মামাতো বোন হালিমার ছেলে সাদেক আমাদের সঙ্গে থাকতে এলে সবাই খুব আনন্দ পেতো। একটা ব্রিটিশ বৃত্তি নিয়ে সে স্কুলে পড়তো সে-দেশে। ছুটির সময়ে সে আপেল তুলতে যেতো কিছু রোজগার করতে। তারই মধ্যে সময় বাঁচিয়ে সে চলে আসততা আমাদের কাছে এবং এসে কতো না সাহায্য করতো বেবীর কাজে। সকালে-বিকেলে বাচ্চাদের স্কুলে নেওয়া এবং সেখান থেকে আনা, তাদের সঙ্গে সময় দেওয়া, রান্নাঘরে বেবীকে সহায়তা করা–এসব তো ছিলই। রাতে খেয়েদেয়ে বাসনকোশন হাঁড়িকুড়ি ভিজিয়ে রাখা থাকতো–সকালে আমাদের ঘুম থেকে ওঠার আগেই দেখা যেতো, সাদেক সব নিজের হাতে ধুয়ে পরিষ্কার করে রেখেছে। তার স্বভাব এমনই মিষ্টি যে, সে কাছে থাকলেই ভালো লাগতো। সে ছিল আপনের চেয়ে অধিক।
কিছুকাল পর মামুন একদিন বললো, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের প্রাক্তন সহকর্মী ডা. মাসুদুর রহমানের বাসস্থানের খুব দরকার হয়ে পড়েছে হঠাই। দোতলার ছোটো ঘরটা মাসুদ ও স্নিগ্ধাকে দিলে ভালো হয়। মাসুদ যখন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে প্যাথলজি বিভাগে কর্মরত ছিলেন, তখন এক গভীর রাতে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল অফিসার ডা. কে এম আখতারুজ্জামান তাঁকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে গেছিলেন ল্যাবরেটরিতে রুচির রক্তপরীক্ষার জন্যে এবং সে-পরীক্ষার ফলাফল তিনি তাৎক্ষণিকভাবে মুখে মুখে জানিয়েছিলেন–লিখে দেওয়ারও সময় পাননি, তাতেই নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল যে রুচি অ্যাপেনডিসাইটিসে আক্রান্ত। তাকে তদ্দণ্ডেই হাসপাতালে ভর্তি করে পরদিন সকালে তার অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল। স্নিগ্ধাও ডাক্তার–দিনাজপুরের বামপন্থী নেতা, তেভাগা-আন্দোলনের মহানায়ক, বরদা চক্রবর্তীর কন্যা। আমরা প্রথমে ধরে নিয়েছিলাম, তাঁরা অতিথি হিসেবে কয়েকদিন থেকে অন্যত্র বাসস্থান খুঁজে নেবেন। পরে ওই একটি ঘরেই তারা অনেকদিন রয়ে গেলেন বাড়িভাড়া ভাগ করে নিয়ে এবং যথেষ্ট বিবেচনাশক্তির পরিচয় দিয়ে।
লন্ডনের বাইরে একাধিকবার যাওয়া হয়েছিল লিডসে–আবদুল মোমেন ও ওসমান জামালদের টানে। সেখানে অন্য বন্ধুদের সমাগম হতো–তার কথা কিছু কিছু আগে বলেছি। কামাল হোসেনদের কারণে অক্সফোর্ডে বেশ ঘন ঘনই যাওয়া হতো। সেখানে কামাল হোসেন, তপন রায়চৌধুরী এবং তাঁর অধীনে গবেষণারত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের সহকর্মী রফিউদ্দীন আহমদকে আমি আখ্যা দিয়েছিলাম বরিশালের ত্রিভুজ বলে। অচিরেই ড. নূরুল ইসলাম অক্সফোর্ডে এসে যোগ দেওয়ায় পরিচিতের গণ্ডি একটু বাড়লো। ইতিহাসের তরুণ গবেষক গওহর রিজভির সঙ্গে আমার হৃদ্যতা গড়ে উঠেছিল, তাছাড়া আইন-অধ্যয়নরত আরেক তরুণ তওফিক নওয়াজ ছিলেন এবং, সময়ের ভুল না হলে, আবুল হাসান চৌধুরী ওরফে কায়সারও।
অকস্ফোর্ডের কথায় একটা ঐতিহাসিক ঘটনার উল্লেখ না করলেই নয়। আমরা যখন লন্ডনে তখন বেনজির ভুট্টো অক্সফোর্ড ইউনিয়নের সেক্রেটারি। তার উদ্যোগে, পাকিস্তান সরকারের সক্রিয় প্রয়াসে, এবং পাকিস্তানের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন বিদ্বজ্জন ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সমর্থনে জুলফিকার আলী ভুট্টোকে অক্সফোর্ডের সম্মানসূচক ডিলিট দেওয়ার প্রস্তাব উত্থাপিত হলো। ভুট্টো অক্সফোর্ডের প্রাক্তন ছাত্র–এখন একটি দেশের প্রেসিডেন্ট, সুতরাং এ মর্যাদা তাঁর প্রাপ্য, এ যুক্তি এক পক্ষের। প্রফেসর গমব্রিকের নেতৃত্বে অক্সফোর্ডের অধ্যাপকদের এক বড়ো অংশ এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করলেন–১৯৭১ সালে তাঁর গণতন্ত্রবিরোধী আচরণের এবং বাংলাদেশের গণহত্যায় তার ভূমিকার কারণে। তাঁরা সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়ে নিজেদের বক্তব্য উপস্থাপন করেছিলেন। কামাল হোসেন এবং তপন রায়চৌধুরী ভুট্টোবিরোধী আন্দোলনে যথেষ্ট শক্তি ও সময় ব্যয় করেছিলেন। পাকিস্তানি শিবির থেকে এমনও বলা হয়েছিল যে, ভুট্টোবিরোধী প্রচারণা চালাতেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অক্সফোর্ডে এসে অ্যাকাডেমিক সাজ পরেছেন। শেষ পর্যন্ত ভোটাভুটিতে ভুট্টোকে ডিগ্রি দেওয়ার প্রস্তাব নাকচ হয়ে গেল।
আগের কথায় ফিরে যাই। আমাদের সামাজিক মেলামেশার কথা বলছিলাম। সপরিবারে আমাদের আরেকটি যাওয়ার জায়গা ছিল কেন্ট–অর্থনীতিবিদ আজিজুর রহমান খান সেখানে থাকতেন, আর থাকতো। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনের বন্ধু ওবায়েদ জায়গীরদার। ওবায়েদের বাড়িতে একবার দেখা হয়ে গিয়েছিল সার আজিজুল হকের পুত্র ক্যাপ্টেন আহসানুল হকের সঙ্গে। তিনি আমার শ্বশুরকে জানতেন বলে বেবীর সঙ্গে অনেক গল্প করেছিলেন এবং রুচির সঙ্গেও আলাপে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন।
আমার বিলেত-যাত্রার আগে রশিদ চৌধুরী একদিন তার দুটি ট্যাপেস্ট্রি মুড়ে নিয়ে এসে আমার হাতে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘সপরিবারে বিদেশ-বিভুয়ে যাচ্ছেন–টাকা-পয়সার দরকার হবে। কিছু মনে করবেন না, এ-ট্যাপেস্ট্রি দুটি ওবায়েদকে দেবেন, ও বিক্রি করে আপনাকে টাকা পৌঁছে দেবে।’ রশিদের এই বদান্যতায় আমি এত অভিভূত হয়েছিলাম যে, অনুভূত কুণ্ঠাও প্রকাশ করতে পারিনি। লন্ডনে যাওয়ার পরে ওবায়েদ জায়গীরদার একদিন আমার বাড়ি থেকে ট্যাপেস্ট্রিগুলো নিয়ে গিয়েছিল এবং বেশ কিছুকাল পরে বাড়ি এসে ১০০ পাউন্ড দিয়ে গিয়েছিল। পরে মূল্যের পরিমাণ শুনে রশিদ বলেছিলেন, তিনি আরেকটু বেশি অর্থাগম প্রত্যাশা করেছিলেন; আমি তাকে জানিয়েছিলাম, ওবায়েদ বলেছিল, ছবি বিক্রির বাজার এখন ভালো নয়। বেশি হোক, কম হোক, অর্থটা যে কাজে এসেছিল, তা বলা বাহুল্য এবং সব ব্যাপারটার পেছনে রশিদের যে ভাবনাটুকু কাজ করেছিল, তার দাম ছবির নগদ মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি।
