হুসনা চাচির বোন লন্ডনে বাস করতেন সপরিবারে। তার কাছ থেকে একদিন খবর পাওয়া গেল যে, চাচি লন্ডনের এক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। কালবিলম্ব না করে বেবী ও আমি তাঁকে দেখতে গেলাম। পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে বেবী ও চাচির সে কী কান্না! বহুবছরে, বিশেষত, চাচার মৃত্যুর পর সেই আমাদের প্রথম সাক্ষাৎকার। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে বোনের বাসায় গেলেন চাচি। তারপর দুই বোন মিলে সারাটা দিন কাটাতে এলেন আমাদের বাসায়। আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশন থেকে আমি তাঁদের নিয়ে এলাম, আবার দিনশেষে সেখানেই বিদায় দিলাম! চাচির আচরণ থেকে কারো বোঝার উপায় ছিল না। যে, যে-স্বামীর সঙ্গে তিনি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন, তাঁরই ভ্রাতুস্পুত্রীর সঙ্গে তিনি সময় কাটাচ্ছেন।
বইপত্রে পড়েছি, হুসনা শেখ পরে হয়েছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টোর তৃতীয় স্ত্রী। এ-সম্পর্কে আমাদের প্রত্যক্ষ কোনো জ্ঞান নেই। তবে চাচির বড়ো মেয়ের বিয়েতে যোগ দিতে আমার শ্বশুর-শাশুড়ি যখন করাচি গিয়েছিলেন, চাচি তাদের বিমানবন্দরে নিতে এবং পৌঁছোতে এসেছিলেন–তখন তাঁরা যে-আমার শ্বশুরের অপ্রত্যাশিত অভ্যর্থনা পেয়েছিলেন, তাতে ধারণা হয়েছিল যে, সরকারের ওপরমহলে চাচির নিশ্চয় খুব প্রভাব আছে। আমার শুধু মনে হয়, ঘটনাটি সত্য হলে বলতে হবে, এই হতভাগ্য মহিলার দুই স্বামীই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে নিহত হয়েছিলেন। ভুট্টোর পতনের পরে চাচিকে অনেকদিন পাকিস্তান ছেড়ে থাকতে হয়েছিল, এ-কথা সত্যি।
চাচির সঙ্গে এখনো আমাদের একটা পরোক্ষ যোগ আছে। তার মেয়েদের সঙ্গে মাঝে মাঝে দেখাসাক্ষাৎ হয়েছে, পারস্পরিক খোঁজখবরই নেওয়া হয়েছে বেশি।
২২.
লন্ডনে আমাদের সামাজিক জীবন আবর্তিত হতো মূলত প্রবাসী আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের কেন্দ্র করে। সপ্তাহান্তে একটি দিন ঘরবাড়ি গোছানো এবং আরেকটি দিন বেশির ভাগ অন্যত্র খেতে গিয়ে, কখনো অতিথি সৎকার করে কেটে যেতো। আমার ভাগ্নে মামুন এবং ভাগ্নে-বউ মীরা ভিন্ন ভিন্ন জায়গার হাসপাতালে চিকিৎসা করতো। সময় পেলে তারা কখনো একসঙ্গে, প্রায়ই একা একজন, আমাদের কাছে চলে আসততা। একবার ছুটির দিনে বিনা এত্তেলায়। মীরা চলে এসেছে–তখন আমাদের খাওয়াদাওয়ার পালা শেষ। আমি এক দৌড়ে পাড়ার চীনা রেস্তোরাঁ থেকে খাবার নিয়ে এলাম তার জন্যে। পরিবেশন করতে গিয়ে শুনলাম, সে এসব খাবে না, কেননা চীনা খাবারে অভক্ষ্য থাকে। এতক্ষণ ধরে ঘরেও কিছু বানাবার চেষ্টা হয়নি বাইরের খাবারের ভরসায়। মীরার প্রত্যাখ্যানের পরে যথাসম্ভব দ্রুত কিছু তৈরি করা হলো বটে, কিন্তু সব। মিলিয়ে দেরি হয়ে গেল অনেক।
আরেকবার এরকম বিব্রত হয়েছিলাম মনসুর ভাইদের নিয়ে। মনসুর ভাই সম্পর্কে বেবীর নানা, কিন্তু তাঁকে আমরা ভাই ডাকি। তিনি এসেছেন দুই মেয়ে নিয়ে। তার শ্যালক হায়দার ও তার স্ত্রী হুসনা এবং ওদের ছোটো দুই মেয়ে রুনা-রুমাও আছে। খেতে খেতে মনসুর ভাই বললেন বেবীকে, ‘গরুর গোসতটা খুব ভালো কোত্থেকে এনেছ?’ বেবী বললো, ‘পাড়ার বুচারের কাছ থেকে।’ অমনি মনসুর ভাই খাওয়া বন্ধ করে দিলেন, হাত সরিয়ে নিলেন প্লেট থেকে। আমরা দুঃখপ্রকাশ করি, তার খাওয়ার যোগ্য এটা-ওটা এগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি, কিন্তু তিনি আর খেতে পারেন না, তার খাওয়ার রুচি চলে গেছে। আমরা বিব্রত হই, এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু তিরিশ বছর আগে লন্ডনে হালাল গোশত এত সুলভ ছিল না-খুঁজে-পেতে আনতে হতো ইহুদির দোকান থেকে। খাওয়াদাওয়ার বিষয়ে আমার সম্পর্কে মীরা হতাশ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু বেবীকে সে খুব জোর দিয়ে বলতো, রুচি-শুচির স্কুলে যেন বলে দেওয়া হয় খাওয়ার বিধিনিষেধ সম্পর্কে–দুপুরবেলায় ওরা তো স্কুল ডিনার খায়!
মনসুর ভাইয়ের বাড়িতে আমরা খেতে গেছি, আমার বন্ধু মোহাম্মদ আলীর বোন নার্গিস ও তার স্বামী শাহাদাঁতের আতিথ্যস্বীকার করেছি, গেছি রউফদের ঘরে। বেশি খাওয়া হতো হুসনা-হায়দার দম্পতির এবং আমার ছাত্রী মর্জিনা ও তার স্বামী শাহাবুদ্দীনের বাড়িতে। এদের প্রায় সকলের সঙ্গেই মামুনদের ভালো যোগাযোগ ছিল। মাঝে মাঝে আমাদের সঙ্গে মামুনরাও হতো তাদের অতিথি। মর্জিনাদের ওখানে গেলে চেষ্টা হতো খাওয়াদাওয়া সেরে তিন পরিবার মিলে কোনো পার্কে যাওয়ার। ছবি তোলার শখ ছিল শাহাবুদ্দীনের। তিনি অজস্র ছবি তুলতেন আমাদের–বিশেষ করে আনন্দের। মর্জিনার সন্তানদের তখনো জন্ম হয়নি–তাদের বাৎসল্যের সবটাই লাভ করেছিল আনন্দ। ছবি ছাড়া শাহাবুদ্দীনের যে-সংগ্রহ দেখে আমি খুব মুগ্ধ হয়েছিলাম, তা হলো ১৯৭১ সালের লন্ডনের ইংরেজি সংবাদপত্রের–কী না যত্ন করে তিনি তা রক্ষা করতেন! এতবার বাড়ি-বদলের পরেও এখনো সে-সংগ্রহ তিনি সযত্নে ধরে রেখেছেন।
হাসি-হাসি মুখ করে বেড়াতে আসততা টুলু-বেবীর ফুপাতো ভাই। ডাকনাম-ব্যবহারে তার ভারি আপত্তি, পরিচয় করিয়ে দিতে হবে কাজী কামালউদ্দীন বলে, অন্তত কামাল বলে। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে নয়, তার নিবন্ধে, সোনালী ব্যাংকের লন্ডন শাখায় দশ পাউন্ড দিয়ে একটা হিসাব খুলেছিলাম, তা কোনোদিন পরিচালনা করা হয়নি। মাঝে মাঝে মনে হয়, সুদসুদ্ধ ওই দশ পাউন্ড টুলুর থেকে আদায় করে নিই, কিন্তু সে–এবং পরে আমার শালাজ–যে-সার্ভিস দিয়েছে, তার চার্জ অনেক হবে ভেবে পিছিয়ে পড়ি।
