কাছাকাছি আরো দুটি জায়গায় খাওয়া চলতো। ইয়ং ভিক থিয়েটারে একটা কফিশপ ছিল। সেখানে খাবারের দাম একটু বেশি। ঘরে-তৈরি খাবারও সেখানে পাওয়া যেতো–সেসবের দাম আরেকটু বেশি, তবে তা খেতে সত্যিই ভালো। একটা গ্রিক রেস্টুরেন্ট ছিল–তার কেবাব-ইন-পিটা ছিল খুবই সুস্বাদু। সপ্তাহে একদিন হয়তো সেখানে খাওয়া যেতো, কেননা তার সবকিছুই ছিল মহার্ঘ, আর খাবার পরিবেশন করা হতো বলে মূল্যের অতিরিক্ত বকশিসও দিতে হতো। অনতিদূরে দুদিকে দুটি পাব ছিল–কিন্তু পাব-লাঞ্চ তখনো তেমন জুতসই ঠেকেনি, সোয়াসের কাছে এক পাবে তারাপদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে দিন। দুই খেয়েছি মাত্র–সেখানে তাই যাওয়া হতো না।
গ্রীষ্মবকাশের সময়ে দেশবিদেশের নানা গবেষক এসে জুটতেন ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে। তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ হওয়াটা ছিল উপরি পাওনার মতো। এমনি করেই সেবারে দেখা হয়ে গেল আমার পুরোনো বন্ধু, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের শিক্ষক, রোনাল্ড বি ইনডেনের সঙ্গে। সে ভালো বাংলা রপ্ত করেছিল এবং বাঙালিদের সঙ্গে সবসময়ে বাংলায় কথা বলতো। আমি সর্বদা টিউবে যাতায়াত করতাম, আর রন যতটা পারে টিউব এড়িয়ে চলতো। আমাকে বলতো, তুমি তো কেবল শেয়ালের গর্ত দিয়ে চলাফেরা। করো; লন্ডনের ওপরটা, তার আকাশটা, কখনো দেখেছ? আমাদের বাড়িতে এসে একবার সে জানতে চেয়েছিল, বেবীকে নিয়ে থিয়েটারে গেছি কি না। বেবী বলেছিল, বাচ্চাদের রেখে একসঙ্গে দুজনের যাওয়া অসুবিধে।’ রন বললো, ‘আপনি আনিসের সঙ্গে থিয়েটারে যাবেন–আমাকে একটু আগে জানাবেন, আমি এসে বাচ্চাদের দেখবো।’ এর উত্তরে বেবীকে হাসতে দেখে সে বললো, ‘ভাবছেন, ওদের রাখতে পারবো না? আমার এক ভাগ্নে আছে–মহা বদমাশ। সে পর্যন্ত আমার কাছে ঠিকমতো থাকে, আর আপনার ছেলেমেয়েরা তো দেখছি। খুবই লক্ষ্মী। ওদের আমি ঠিকই সামলাতে পারবো।’ রনকে আমরা খাটাইনি, তবে তার এমন করে স্বেচ্ছাসেবা দিতে চাওয়া আমাদের খুব ভালো লেগেছিল।
রন তখন তার দ্বিতীয় বই Kinship in Bengal নিয়ে কাজ করছিল। খসড়াটা আমাকে পড়তে দিয়ে মতামত চাইলো। বিশেষ করে বাঙালি মুসলমান সমাজে প্রচলিত আত্মীয়তাবাচক শব্দগুলি সংগ্রহ করলো আমার থেকে। বাঙালি আত্মীয়তাবাচক শব্দের বাহুল্য ও পার্থক্য নিয়ে যদিও সে অনেকসময়ে হাসাহাসি করতো-মামাতো বোনের স্বামীর ভাগ্নেকে কী বলে’-জাতীয় প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতো–তবু বেশ ধৈর্যসহকারে সে তার তালিকা তৈরি করেছিল।
রনের বিবেচনাশক্তি ও সৌজন্য–দুই ছিল অসাধারণ। একবার আমাদের বাসায় রাতে খেতে ডেকেছিলাম ব্রিটিশ কাউনসিলের যে-মহিলা আমাদের দেখশোনা করতেন, তাঁকে, অ্যাসোসিয়েশন অফ কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটির রেবেকা জেমস, আমার ব্রিটিশ বন্ধু ইয়েন মার্টিন ও রন ইনডেনকে। ক্যাথি রবার্টসকেও ডাকতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সে ও তার স্বামী সেই সপ্তাহান্তে লন্ডনের বাইরে যাওয়ার পরিকল্পনা করে বসে আছে। অনেককাল আগে ক্যাথিকে লাঞ্চ খাইয়েছিলাম রেস্টুরেন্টে–সেই কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সে বলে, ‘এই তো সেদিন খাওয়ালে। আমি বলি, ‘সে কি আর সেদিন! সে তো তোমার বিয়ের আগের ঘটনা। ওরা দাওয়াতে থাকতে পারলো না, রেবেকা জেমসও শেষ পর্যন্ত আসতে পারলেন না। বাকিরা এলেন।
তখনো আমার পানীয় নির্বাচনের জ্ঞান ও পরিবেশনের নৈপুণ্য–দুয়েরই অভাব ছিল। ওয়াইনের ব্যবস্থাই করিনি; শুল্কমুক্ত স্কচ ছিল আর পাড়ার দোকান থেকে কয়েক ক্যান বিয়ার এনে রেখেছিলাম, বড়ো বোতলে কোমল পানীয়। পানি খাওয়ার বড়ো গ্লাস ছিল কয়েকটা, তাতে বিয়ার দেওয়া চলতো। ছটা ওয়াইন গ্লাস ছিল–বি বি সি ক্লাবে প্রায়ই ওয়াইন গ্লাসে হুইস্কি দিতে দেখেছি, সেটা যে বিধেয় নয়, তা বুঝিনি। দেখা গেল, কেউই কোনো পানীয় নিচ্ছেন না। শেষ পর্যন্ত কেবল রনই ‘তুমি নাও’ বলে এক ক্যান বিয়ার ঢেলে নিলো। পরে মনে হয়েছিল, ব্যবস্থার অপ্রতুলতা টের পেয়ে পরে যদি আমি লজ্জিত হই, সেজন্যেই সে তা করেছিল।
আগে বলেছি, ইয়েন মার্টিন লেবার পার্টিতে সক্রিয় ছিল। ওই দলের মধ্যেই সে ছিল বাম মার্গের। ব্রিটিশ কাউনসিলের ভদ্রমহিলা কনজারভেটিভ পার্টির সমর্থক না হলেও তুলনায় রক্ষণশীল। ব্রিটেনের অর্থনীতির আলোচনা উঠে যাওয়ায় কথাটা বোঝা গেল। আমি ইচ্ছে করেই আবহাওয়াটা লঘু করতে চাইলাম। বললাম, সোয়াসের এক ছাত্র বলছিল, তার বাবার পাবলিক হাউজ খুব ভালো চলছে। ভদ্রমহিলা তখন ব্রিটেনের অর্থনীতি সম্পর্কে আমার। পর্যবেক্ষণ কী, তা জানতে চাইলেন। আমি বিপদে পড়ে গেলাম। বললাম, এত অল্প সময়ে এত সামান্য দেখে মতামত দেওয়া যায় না। আর একটা পাব ভালো চলছে বলে অর্থনীতিও মজবুত বলা চলে না। সবটা সামাল দিলোরন। সে ধীরে ধীরে পুরো আলোচনাটাই বিতর্কের বাইরে নিয়ে গেল।
তবে যেসব বিষয়ে রনের নিজস্ব চিন্তাভাবনা ছিল, সেসব বিষয়ে মতপ্রকাশে তার দ্বিধা ছিল না।
২১.
লন্ডনে বেবীর চাচির সঙ্গে সাক্ষাৎকার ছিল একটি স্মরণীয় ঘটনা। তবে সেটা বলার আগে চাচির পরিচয়টা ঠিকমতো তুলে ধরা দরকার।
বেবীর একমাত্র চাচা আবদুল আহাদ ছিলেন সলিসিটর, চট্টগ্রাম ও ঢাকায় অর ডিগন্যাম অ্যান্ড কোম্পানি নামের আইন ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। এদেশে শিল্পোদ্যাগের সঙ্গেও তিনি জড়িত ছিলেন এবং সেই সুবাদে পাকিস্তান চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইনডাস্ট্রিজের সভাপতি হয়েছিলেন, একাধিকবার পাকিস্তানের বাণিজ্য-প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বিদেশে। তিনি প্রথমে বিয়ে করেন হুসনা শেখকে। চাচির বাবা ছিলেন উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের লোক, চল্লিশের দশকে কলকাতার নিউ মার্কেটের সুপারিন্টেনডেন্ট ছিলেন। চাচা ও চাচির পরিচয় হয় কলকাতায়, পরে তারা বিয়ে করে ঢাকায় স্থায়ীভাবে বাস করতে থাকেন, এখানে তাঁদের দুই মেয়ের জন্ম হয়। বেবীর সব ভাইবোনকে চাচা-চাচি খুব ভালোবাসতেন, বিয়ের পরে আমিও তাদের অকুণ্ঠ ভালোবাসা পেয়েছি। চাচির সঙ্গে আমাদের একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। বাংলা শিখতে গিয়ে তিনি বর্ণমালায় হোঁচট খেতেন এবং আমার কাছে প্রতিকার চাইতেন। ষাটের দশকের শেষদিকে চাচা-চাচির বিবাহবিচ্ছেদ ঘটলে মেয়েদের নিয়ে চাচি চলে যান পশ্চিম পাকিস্তানে। চাচা দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন বাংলা কবিতার ইংরেজি অনুবাদক ও সাহিত্য-সমালোচক এবং Poems from East Bengal (করাচি, ১৯৫৪) গ্রন্থের সম্পাদক ইউসুফ জামাল বেগম ওরফে ড. ফয়জুননেসা ওরফে রোজী মুসাকে–তার প্রথম স্বামী মুহম্মদ হোসেন ছিলেন। পাকিস্তান সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। চাচার দ্বিতীয় বিয়ের পরও চাচি বলতে আমরা হুসনা শেখকেই বুঝতাম এবং নতুন চাচিকে উল্লেখ করতাম রোজী চাচি বলে। আইনব্যবসার সূত্রে সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে চাচার ঘনিষ্ঠতা ছিল, তার সূত্রে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গেও তার অন্তরঙ্গতা গড়ে ওঠে। এ কে এম আহসান ও সানাউল হকের মতো আমলা এবং শওকত ওসমান ও সিকান্দার আবু জাফরের মতো সাহিত্যিকের সঙ্গেও চাচার বন্ধুত্ব ছিল। পরে জেনেছি, আওয়ামী লীগকে তিনি নিয়মিত অর্থসাহায্য করতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেয়-এ সময়কার কোনো কথা তিনি নিকটজনের কাছেও প্রকাশ করেননি। তারপর আবার অফিস থেকে নিয়ে গিয়ে তাকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি করে রাখা হয় এবং, যতটুকু জানা যায়, সেখানেই তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
