এটি যে ভারতীয় কবিতার প্রতিনিধিত্বমূলক সংকলন নয়, এই ঘোষণা দিয়েই বইটি শুরু হয়েছিল। সর্বতোভাবেই এটি ডেভিডের পড়া এবং ভালো লাগা কবিতার একটা নির্বাচিত সংগ্রহ। একথা বলতে সাহসের দরকার হয়, কেননা সে কে এমন যার ভালো-লাগার কবিতা পাঠযোগ্য বিবেচনা করবে পাঠক? ডেভিডের সে-সাহস ছিল। নিজের অনুবাদ সে এই সংকলনভুক্ত করেনি, কিন্তু দীর্ঘ একটি ভূমিকা লিখেছিল প্রধানত রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গৌণত আধুনিক বাংলা কবিতা-বিষয়েই, এবং এই ভূমিকাকে সে এই সংকলনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে ঘোষণা করেছিল।
বইটি আমাকে উপহার দিয়ে ডেভিড মন্তব্য চেয়েছিল। আমার মনে প্রশ্ন ছিল–’নিউ ইন্ডিয়া সম্পর্কে, কবিতার নির্বাচন সম্পর্কে, বাংলা বইপত্রের মূল নাম না দিয়ে তার ইংরেজি অনুবাদ দেওয়া সম্পর্কে (যেমন, সবুজ পত্র না লিখে গ্রিন লিফ লেখা), কাজী নজরুল ইসলামের নামের প্রতিবর্ণীকরণ সম্পর্কে। ততদিনে আমাদের পরিচয় কিছু এগিয়েছে, যে-রাতে ফউজিয়াকে হাসপাতালে সেবিকার দায়িত্বপালন করতে হতো না, তেমন সময়ে তার রান্নার সুস্বাদ গ্রহণ করেছি। ডেভিড আমার দু-একটা আপত্তি গ্রাহ্য করেছে, প্রশংসাকে সৌজন্য বলে বিবেচনা করেছে, এবং প্রবলভাবে আত্মপক্ষ সমর্থন করেছে। একেবারে গল্পে-গল্পে ডেভিড যখন সংস্কৃতের সঙ্গে ফারসির, ফারসির সঙ্গে তুর্কির, ফরাসির সঙ্গে ইংরেজির এবং ইংরেজির সঙ্গে বাংলা কবিতার তুলনা করতো, তখন তা আমি মুগ্ধ হয়েই শুনেছি। পরে যে তার সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেললাম, সে-ক্ষতি আমারই।
১৯.
স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ থেকে সে-বছর বোল্টন ছুটি নিয়েছেন, সুতরাং বাংলার ছাত্র মানেই তখন তারাপদ মুখোপাধ্যায়ের ছাত্র। সংখ্যায় দুজন, উভয়েই ইংরেজ। তরুণীটি বাংলা শিখছে প্রাথমিক পর্যায়ে, তারাপদর কথায় মনে হলো, বেচারি হিমশিম খাচ্ছে বেশ। তরুণ সুদর্শন, দীর্ঘদেহী, আত্মপ্রত্যয়ী। নাম উইলিয়াম রাদিচে, পিএইচ ডি করছে মধুসূদনের মেঘনাদবধ কাব্য নিয়ে–অনুবাদ ও টীকাভাষ্য। অনুবাদ শুনে বোধহয় আমার ভ্রু কুঞ্চিত হয়েছিল, তারাপদ বললেন, ছেলেটি কবিও, তার মাও সাহিত্যচর্চা করেন, মায়ের দিক থেকে বোধহয় ইতালীয় বংশোদ্ভূত। রাদিচের সঙ্গে আমার দু-তিনবার দেখা হয়েছিল। স্বল্পক্ষণের আলাপেই প্রীত হয়েছিলাম। পরবর্তীকালে কবি হিসেবে, রবীন্দ্রনাথের গদ্যপদ্যের অনুবাদক হিসেবে, সাহিত্যসমালোচক হিসেবে তিনি যে এত সফল হবেন, তা তখন বোঝা যায়নি। তারাপদ দুঃখ করেছিলেন এই বলে যে, এমন ভালো ছেলেরও চাকরি-বাকরির কোনো ভবিষ্যৎ নেই ইংল্যান্ডে। ঘটনাপ্রবাহে তার আশঙ্কা মিথ্যে প্রমাণিত হয়েছে। এখন তারাপদ নেই, বোল্টন নেই, রাদিচেই বাংলার ধ্বজা ধরে আছেন সোয়াসে এবং সারা যুক্তরাজ্যেই। জগতের বিদ্বজ্জনসভায় তিনি সর্বত্র সমাদৃত।
প্রফেসর রাইট একবার আমাকে নৈশভোজে নিয়ে গেলেন এক রেস্টুরেন্টে। বিভাগের আরো কয়েকজন শিক্ষক ছিলেন সেখানে, কিন্তু বাংলার তারাপদ মুখোপাধ্যায় বা হিন্দির এস এম পাণ্ডে ছিলেন না। উপস্থিত শিক্ষকদের মধ্যে উর্দুর রাসেলের কথা বিশেষভাবে মনে আছে। তার চেয়েও বেশি মনে আছে নিজের এক ব্যর্থতার কথা। সোয়াস থেকে রেস্টুরেন্টে হেঁটে যাওয়ার পথে রাইট আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন ‘সৌরেন্দ্র’ বলে কি কোনো শব্দ আছে, নাকি তা ‘সুরেন্দ্র’র বিকার? যখন বললাম, ও-দুটো পৃথক শব্দ, তখন তিনি তার অর্থ ও ব্যুৎপত্তি জানতে চাইলেন। সৌরের সোজা ইংরেজি ‘সোলার কথাটা কিছুতেই আর মনে এলো না। আমি বলি বিশ্বজগৎ, সূর্যসম্পর্কিত, ইত্যাদি ইত্যাদি। রেস্টুরেন্টে বসে রাইট তাঁর সহকর্মীদের একজনকে জানালেন, প্রফেসর আনিসুজ্জামান বলছেন, সৌরেন্দ্র একটি পৃথক শব্দ। তিনি হুমড়ি খেয়ে পড়লেন, তাই নাকি? কী অর্থ তার? ব্যুৎপত্তি কী? আমি একইরকম উত্তর করি। বুঝতে পারি, বিষয়টা নিয়ে আগে কোনো আলোচনা হয়েছে, কিন্তু অভিধান না দেখে এতক্ষণ পরে আমাকে সাক্ষী মানা কেন? রাতের খাওয়াটাই নষ্ট হয়ে গেল। বিল দেওয়ার সময়ে বুঝলাম, ভোজটি সমবায়ী উদ্যাগের ফল, কিন্তু আমি যখন নিজের ভাগ দিতে চাইলাম, রাইট শশব্যস্ত হয়ে বললেন, না, না, তুমি আমাদের অতিথি। বিদায় নিয়ে মন খারাপ করেই ফিরতি পথে রওনা হলাম। টিউব ছাড়ার সময়ে ধাক্কা দেওয়ামাত্রই ভিতর থেকে কে যেন বলে উঠল ‘সসালার’। কিন্তু গল্পগুচ্ছের পোস্টমাস্টারের মতো ততক্ষণে আমারও নৌকার পালে বাতাস লেগেছে। পরদিন তারাপদর কাছে খেদের সঙ্গে সবটা বললাম, উনি পাত্তাই দিলেন না।
২০.
রাজেশ্বরী দত্তের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝির পরে পারতপক্ষে সোয়াসে আর দুপুরে খেতাম না। তাছাড়া কাজ করছি ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে। তার উলটো দিকের ফুটপাতেই স্যান্ডউইচের এক দোকান। যে-দম্পতি সেটা চালান, তারা খুব সম্ভব ইতালীয় বংশোদ্ভূত। ওই দোকানে বসে খাওয়া যায়–তবে বসার জায়গা অল্প এবং দুপুরে বেজায় ভিড়। অনেকে খাবার কিনে লাইব্রেরির দোতলার একটা ঘরে–লাউঞ্জ বা কমনরুম যাই বলি না কেন, সেখানে–চলে আসতেন। ওই কক্ষে তখনো ধূমপান করা চলতো, পরে সে সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। যারা সঙ্গে করে খাবার নিয়ে আসতেন বাড়ি থেকে, তারাই এই ঘরটা বিশেষ করে ব্যবহার করতেন। বেলা তিনটের দিকে স্যান্ডউইচের দোকানটায় আরেক দফা আসা হতো–চা-কফি খেতে। আড্ডা দেওয়ার জন্যে এ-সময়টা ছিল প্রশস্ত। সেই আড্ডায় কিন্তু লেখাপড়াসংক্রান্ত অনেক প্রশ্নের মীমাংসা হয়ে যেতো।
