এ-সম্পর্কে অবশ্য কিছুদিন পর এক ভিন্ন ধরনের গল্প বললেন আমার শিক্ষক আবদুল ওয়াজেদ খান চৌধুরী। খুলনা জেলা স্কুলে তিনি যখন প্রধান শিক্ষক, তখন আমি তার ছাত্র ছিলাম। আমাদের পারিবারিক যোগাযোগ ছিল, তা আরো বৃদ্ধি পেয়েছিল আমার বন্ধু মসিহুর রহমান তাঁর মেয়ে রেহানাকে বিয়ে করায়। তবে এই যোগাযোগের বাইরেই তিনি আমাকে খুব ভালোবাসতেন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তার ছেলে মোরশেদ চৌধুরীর কাছে যাচ্ছেন চিকিৎসা করাতে–মোরশেদ ওয়াশিংটন ডিসিতে আমাদের দূতাবাসে অর্থনৈতিক কাউনসেলর। তার গ্রুপের রক্ত দুষ্প্রাপ্য বলে নিজের রক্তও চার ব্যাগ নিয়ে যাচ্ছেন সঙ্গে। লন্ডনে যাত্রাবিরতি করতে হবে। ঢাকায় স্বজনেরা তাঁকে পরামর্শ। দিয়েছিল লন্ডনে আত্মীয়-বাড়িতে উঠতে। তিনি বলেন, এয়ারলাইনসের ব্যবস্থায় থাকবেন, আর যদি কারো বাড়ি উঠতে হয়, তাহলে আনিসের বাড়িতে উঠবেন। হিথরো বিমানবন্দরের কাছেই হোটেলে তাঁর থাকার ব্যবস্থা হয়েছে–এই হোটেলেই আমি একবার ছিলাম। হোটেল থেকে ফোন করেছেন আমাকে–আমি তখন বাড়ি নেই। ঘরে ফিরে যোগাযোগ করে ঠিক করলাম, পরদিন সকালেই আমি পৌঁছে যাবো ওঁর হোটেলে, তারপর উনি বিমানবন্দরে রওনা হলে ফিরবো।
গিয়ে দেখি, ঘরে বসে ব্রেকফাস্ট করেছেন তিনি তার থেকে কিছু খাবার জমিয়ে রেখেছেন আমার জন্যে। যত বলি, ‘আমি খেয়ে এসেছি, এখন খাবো না’, উনি সেকথা কানে নেন না। শেষে কিছু একটা মুখে দিয়ে খাবারের ট্রে দরজার বাইরে রেখে এলাম। ইত্যবসরে দরজা বন্ধ হয়ে গেল। তিনি খুলে দেবেন মনে করে একটু অপেক্ষা করলাম, শেষে দরজায় টোকা দিলাম। এখন তার গলা শুনতে পেলাম, ঘরের চাবি না নিয়ে বের হলে, এখন ঢুকবে কী করে!’ বললাম, ‘সার, আপনি খুলে দিন।’ তিনি বললেন, তাই তো, আমি তো ভিতরেই আছি। দরজা খুলে দিলেন।
আমার সঙ্গে নানা বিষয়ে কথা হলো। উনি একটা উপন্যাস লেখার পরিকল্পনা করেছেন, লেখা শেষ হলে আমাকে পাঠাবেন–আমি যেন ভূমিকা লিখে দিই। অবশ্য শরীরের যা অবস্থা–সেই সুযোগ পাবেন কি না কে জানে! তখন ওঁর বয়স ৭৪ বছর, শরীর ভালো থাকছে না। নিজের অসুস্থতা ও চিকিৎসা। নিয়ে কিছু কৌতুককর কথা বললেন।
দেশের অবস্থাও ভালো নয় তাঁর মতে। সেই প্রসঙ্গেই গল্পটা করলেন। ভিয়েতনামের মুক্তি-উপলক্ষে বিজয়-মিছিল বেরিয়েছে ঢাকার রাস্তায়। পাশ দিয়ে যেতে যেতে রিকশাওয়ালা জানতে চাইছে আরোহীর কাছে : ‘কী হইছে ভিয়েতনামে?’
: ‘ভিয়েতনাম স্বাধীন হয়েছে।’
: ‘স্বাধীন হইছে? তাইলেই সারছে।’
১৭.
কমনওয়েলথ দিবস-উপলক্ষে ব্রিটেনের রানি এক বা একাধিক দিনে গার্ডেন পার্টি দেন তার প্রাসাদে। সেখানে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর লন্ডন–বাসী। অথবা প্রবাসী কিছু নাগরিককে আমন্ত্রণ জানান। আমন্ত্রিতদের নাম সংগৃহীত হয় সেসব দেশের হাই কমিশন থেকে। এই সুবাদে সস্ত্রীক আমন্ত্রিত হলাম।
প্রথমে এলো সেন্ট জেমস প্যালেসে লর্ড চেম্বারলেনের দপ্তর থেকে টেলিফোন–নির্দিষ্ট দিনক্ষণে উপস্থিত থাকতে পারবো কি না। কারণ এই আমন্ত্রণগ্রহণ বা আমন্ত্রণগ্রহণে অপারগতাজ্ঞাপনের বিধি নেই। যেতে পারলেই আমন্ত্রণপত্র আসে–সেইসঙ্গে আসে কাপড়ে সাটার জন্যে আমন্ত্রিতদের নামলেখা ছোটো কার্ড। কোনো কারণে যেতে অপারগ হলে সেই ছোটো কার্ড সেন্ট জেমস প্যালেসে ফেরত পাঠিয়ে দিতে হয় লর্ড চেম্বারলেনের অফিসে।
আমন্ত্রণপত্র এলো। নির্দিষ্ট দিনে ফোন করে ট্যাকসি ডাকলাম, বললাম, মলে যাবো। ট্যাকসিতে ওঠার সময়ে ড্রাইভারের হাতে প্যালেসের স্টিকার দিয়ে বললাম, এটা লাগিয়ে নিন।
ড্রাইভার হাসলেন। বললেন, ট্যাকসি ডাকার সময়ে প্যালেসের কথা বলেন নি কেন?
বললাম, আপনারা ভাবতে পারতেন, কেউ মশকরা করছে, নাও আসতে পারতেন।
ড্রাইভারের হাসি আকর্ণ বিস্তৃত হলো। বললেন, আমিও কখনো বাকিংহাম প্যালেসের ভেতরে যাওয়ার সুযোগ পাইনি। আজ আপনাদের সুবাদে যাওয়া যাবে।
প্যালেসের চত্বরে গিয়ে ট্যাকসি ছাড়লাম। প্রাসাদের একতলা পেরিয়ে উদ্যানে পৌঁছোনো গেল। নানা দেশের লোকে ভরে গেছে জায়গাটা। কারো কারো সঙ্গে আলাপ শুরু করতেই রানি এসে পড়লেন, সঙ্গে প্রিন্স ফিলিপ।
একটু একটু বৃষ্টি আরম্ভ হলো। রানি নিজেই ছাতা খুললেন। আলাপ করলেন অনেকের সঙ্গে। প্রিন্স ফিলিপও কথাবার্তা বললেন।
বৃষ্টি ছাড়ল। চা-পান শেষ করে প্রত্যাবর্তন।
পুসিক্যাটের মতো রানির সঙ্গে দেখা করতে আমরা লন্ডনে যাইনি। দৈবাৎ দেখা হয়ে গেল।
১৮.
খুব সম্ভব নিমাই চট্টোপাধ্যায় আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন ডেভিড চেভিটের। সে ইতালীয় বংশোদ্ভূত, যদিও তার জন্ম লন্ডনে, বয়সে আমার কয়েক বছরের ছোটো। আবাল্য তার অনুরাগ ছিল চিত্রাঙ্কনে, কাজেই লন্ডনের বিখ্যাত স্লেড স্কুল অফ ফাইন আর্টে সে ভর্তি হয়েছিল। সেখান থেকে বেরিয়ে সে শিল্প ও শিল্পের ইতিহাস পড়িয়েছিল কয়েক বছর, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে এক্সট্রা-মুরাল ডিপার্টমেন্টে খণ্ডকাল শিক্ষকতাও করেছিল। এক সময়ে সে ঠিক করে যে, লেখালিখিতেই সে সার্বক্ষণিক মনোযোগ দেবে। আমার সঙ্গে যখন তার আলাপ, তখন তার এই অবস্থা।
স্লেডের ছাত্রাবস্থায় রবীন্দ্র-জন্মশতবার্ষিক উপলক্ষে লন্ডনে আয়োজিত রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলার প্রদর্শনী দেখে ডেভিড খুব অভিভূত হয়। তার মনে হয়, এই চিত্রকর এবং তাঁর শিল্পকর্ম ভালো করে বুঝতে হলে তাঁর সাহিত্যকর্ম পাঠ। করতে হবে এবং তা অনুবাদে নয়, মূল ভাষায়। সে বাংলা শিখতে লেগে গেল। এবং কিছুকাল পরে রবীন্দ্রনাথ এবং তিরিশের কবিদের কবিতা অনুবাদ করতে শুরু করে দিলো। এর মধ্যে তার মন ঘুরে গিয়েছে পুরোপুরি সাহিত্যের দিকে, কবিতা লিখতেও আরম্ভ করেছে। ভাষাশিক্ষায় ডেভিডের স্বাভাবিক পটুত্ব ছিল। আমার সঙ্গে পরিচয়কালে সে ইংরেজি, ইতালীয়, ফরাসি, স্প্যানিশ, সংস্কৃত, বাংলা, ফারসি, তুর্কি জানতো। তার স্ত্রী ফউজিয়া মালয়েশিয়ার মেয়ে বলে মালয় ভাষাও খানিকটা শিখেছিল, যদিও তা জানতো বলে সে স্বীকার করতো না। একাধিক ভাষার কবিতা সে অনুবাদ করেছিল, বিশেষ করে, অক্টেভিও পাজের কবিতা। বিলেতের খ্যাতনামা প্রকাশনা-সংস্থা জর্জ অ্যালেন অ্যান্ড আনউইন লিমিটেড তার সম্পাদিত একটি বই প্রকাশ করে : The Shell and the Rain (লন্ডন, ১৯৭৩), এর উপ-শিরোনাম ছিল Poems from New India-তাতে রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অমিয়। চক্রবর্তী, সমর সেন, নরেশ গুহ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, জ্যোতির্ময় দত্ত ও তারাপদ রায়ের কবিতার অনুবাদ ছিল নানাজনের করা, আর ছিল এ কে রামানুজন, নিসিম ইজিকিয়েল, আর পার্থসারথী, অরুণ কোসাটকার, তিলোত্তমা রাজন ও শনমুঘা সুব্বিয়ার মূলত ইংরেজি কবিতা, তামিল থেকে অনুবাদ দু-চারটি।
