নবনীতা দেবসেন সে-সময়ে লন্ডনে এসেছিল। আবুল ফজলের চিঠিটা তাকে দেখালাম। সে বললো, ‘কী ভাগ্য তোমার! এমন ভাইস-চান্সেলরের সঙ্গে কাজ করো। আমাদের ভাইস-চান্সেলররা কোনো টিচারের জন্য এত ভাবনা-চিন্তা করে না, তাদের সে সময় নেই।’
সেমিনার-কনফারেন্স নিয়ে সারা দুনিয়া চষে বেড়ায় নবনীতা। অমনই কিছু একটা নিয়ে সে এসেছে এখানে। তার কাজের শেষে তুমুল আড্ডা হলো। সে আমার বাড়িতে এলো তার বন্ধু ডা. অমেয়া দেবাকে নিয়ে। অমেয়া লন্ডনে জেনারেল ফিজিশিয়ান–শুনেছিলাম, নবনীতার মতো অমেয়া নামটিও রবীন্দ্রনাথের দেওয়া, তবে তার ডাকনাম বুলুই অধিক ব্যবহৃত হতো। পরে তার সঙ্গে আমার প্রগাঢ় বন্ধুত্ব হয়।
সেদিন বুলুর গাড়িতে চড়ে আমরা তিনজন ইতস্তত ঘুরে বেড়ালাম, বইয়ের দোকানে ঢু দিলাম, ওয়েস্ট এন্ডের রেস্টুরেন্টে খেলাম। খেতে খেতে হঠাৎ নবনীতার খেয়াল হলো, সিনেমা দেখবে। সিনেমা দেখতে দেখতে পরদিনের করণীয় সম্পর্কে পরিকল্পনা করা গেল। এমনি করে সময়টা খুব ভালো কাটলো।
কলকাতায় ফেরার আগে একগাদা বই আমাকে দিয়ে নবনীতা বললো, তুমি এগুলো অমর্ত্যর অফিসে পৌঁছে দিয়ে বোলো আমাকে মেইল করে দিতে।
অমর্ত্য সেন তখন লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিকসে অধ্যাপনা করেন। আমার সঙ্গে তাঁর পরিচয় যৎসামান্য। যতটুকু বুঝতে পারলাম, বইপত্রের বিষয়ে নবনীতা তাঁকে কিছুই বলেনি, বলার প্রয়োজনও বোধ করছে না। আমি এগুলো বয়ে তার অফিসে নিয়ে যাবো–তারপর না দুজনেই বিব্রত হই!
আমার ইতস্তত ভাব দেখে নবনীতা অবাক হলো। তারপর সমাধান দিলো, ‘তোমার যদি কিন্তু কিন্তু লাগে তাহলে আজিজকে দিয়ে বোলো, সে যেন অমর্ত্যকে বলে এগুলো পাঠিয়ে দিতে।’
আজিজ মানে ড. আজিজুর রহমান খান–অমর্ত্য সেনের প্রিয় ছাত্র এবং এল এস ই-র শিক্ষক। আর দ্বিধা করা নিষ্ফল। বইগুলো রেখে দিলাম। পরে আজিজের অফিসে নিয়ে গিয়ে বিষয়টা ব্যাখ্যা করলাম। আজিজ মুদৃ হেসে বললেন, ‘বইগুলো থাক আমার কাছে, কিছু একটা করতে হবে।’ তিনি পরে তা কলকাতায় পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, তবে অমর্ত্যকে কিছু বলেছিলেন কি না সন্দেহ।
১৬.
সেই ১৯৭৫ সালে আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ দুটি ব্যাপার ঘটলো–বলা যেতে পারে, আমার চোখের সামনে, অর্থাৎ টেলিভিশনে আমি তা প্রত্যক্ষ করলাম।
একটি হলো ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা সাধারণ বাজারে যুক্তরাজ্যের যোগদান। এডওয়ার্ড হিথের প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়ে কাজটা প্রায় হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তারপর ক্ষমতায় এলেন হারল্ড উইলসন। এই প্রশ্নে দেশে, এমনকী, দুই বড়ো রাজনৈতিক দলের মধ্যেই মতান্তর ছিল। সুতরাং উইলসন গণভোটের আয়োজন করলেন। কোনো দলীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো না এই বিষয়ে, নিজের বিবেক অনুযায়ী প্রচারণার স্বাধীনতা সবাইকে দেওয়া হলো। আমরা দেখলাম, মন্ত্রিসভার কোনো সদস্য একপক্ষে, আরেকজন অন্যপক্ষে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। উইলসন নিজে কোনো পক্ষ নিলেন না। পরে যারা সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি গঠন করেছিলেন, লেবার পার্টির সেসব নেতা–রয় জেনকিনস, ডেভিড ওয়েন, শার্লি উইলিয়মস–ইউরোপে যোগদানের পক্ষে, সম্ভবত ইয়েন হিলিও সেইসঙ্গে, প্রচারণায় নামলেন। আবার মাইকেল ফুট তো প্রচণ্ডভাবে তার বিরোধিতা করলেন, তার সঙ্গে রইলেন টোনি বেন এবং জুনিয়র মিনিস্টার জুডিথ হার্ট। ইউরোপে যোগদানের পক্ষে কনজারভেটিক পার্টির নেতা এডওয়ার্ড হিথের বক্তৃতা যেমন ছিল খুব যুক্তিপূর্ণ ও পরিচ্ছন্ন, তেমনি তার বিরুদ্ধে প্রবল আবেগময় ভাষণ দিতেন ওই দলেরই পার্লামেন্ট-সদস্য ইনোক পাওয়েল। বর্ণবাদী বলে পাওয়েলকে পছন্দ করতাম না, কিন্তু তার ইউরোপ-বিরোধী বক্তৃতা ভালো লাগত। মাইকেল ফুটও খুব আবেগের সঙ্গে নিজের কথা বলতেন, তবে নিজের দলের মধ্যে ইউরোপের পক্ষে অত সমর্থন দেখে তিনি যে খানিকটা হতাশ হয়েছিলেন, সেটা বোঝা যেতো। টোনি বেন তো হারজিতের পরোয়া না করেই সংগ্রাম করে যেতেন। রয় জেনকিনসের ভাষণ আমার ভালো লাগত না, যেমন ভালো লাগত ইউরোপের সমর্থনে চিবিয়ে-চিবিয়ে বলা মার্গারেট থ্যাচারের বক্তৃতা।
গণভোটে ইউরোপে যোগদানের সিদ্ধান্তই নেওয়া হলো। সিদ্ধান্ত যাই হোক, পুরো ব্যাপারটা এমন সুরুচিসম্পন্ন হলো যে তার তারিফ না করে পারা যায় না। পরমতসহিষ্ণুতার এক অসাধারণ নিদর্শনের সাক্ষ্য হয়ে রইলাম। সোয়াসে ছাত্রদের কমনরুমেও উত্তেজিত আলোচনা হতে দেখেছি কিন্তু সবটাই যুক্তিতর্ক-অধ্যয়ন-চিন্তনের বিষয় ছিল, গায়ের জোরের নয়। ফলাফল মেনে নেওয়ার ব্যাপারেও সেই একই মনোভাবের প্রকাশ দেখলাম।
ওদিকে ভিয়েতনামের যুদ্ধ বাঞ্ছিত পরিণামের দিকে চলেছে। ১৯৭৩ সালে প্যারিস শান্তিচুক্তির পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সৈন্য প্রত্যাহার করতে শুরু করে, কিন্তু দক্ষিণ ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট থিউ একাই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। ১৯৭৫ সালের মার্চ মাসে তার সেনাবাহিনীর পরাজয় সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। অনর্থক যুদ্ধ চলে তারপরও। যুদ্ধের শেষ দেখতে দক্ষিণ ভিয়েতনামে জড়ো হন নানা দেশের সাংবাদিক, আলোকচিত্রী, চিত্রনির্মাতা। বিবিসি বা আইটি এনের যে-সংবাদপাঠককে আজ টেলিভিশনে দেখলাম, দু-দিন পর দেখি তিনি নমপেন বা হুয়া বা সায়গন থেকে সরাসরি খবর দিচ্ছেন। এপ্রিলের ৩০ তারিখে সায়গনের পতন হলো–থিউ পালিয়ে গেলেন তাইওয়ানে, আমি টেলিভিশন সেটের সামনে ঠাই বসে রইলাম। এগারো বছরের যুদ্ধের অবসান–সোজা কথা নয়। সব শেষ হওয়ার পরে মনে হলো, ঢাকায় থাকলে আরো না কত আনন্দ করতে পারতাম! ভিয়েতনামের পক্ষে বিজয়-মিছিলে নিশ্চয় শরিক হতাম।
