সেই দুপুরে খোশমেজাজে আমরা তিনজনেই সোয়াসের সিনিয়র কমনরুমে চললাম লাঞ্চ খেতে। প্রথমে তারাপদ, তারপর নিমাই, শেষে আমি। এক হাতে দরজা খুলেই বন্ধ করে দিলেন তারাপদ, বললেন-রেজো। রেজো মানে যে রাজেশ্বরী দত্ত, সেটা আমি যেন কীভাবে বুঝে গেলাম, কিন্তু তাতে পালাবার কী কারণ আছে, তা বুঝিনি। তবে এটা বুঝলাম যে, তারাপদ ও নিমাই বিদারণ রেখার একদিকে এবং রাজেশ্বরী অন্যদিকে এবং সেই রেখাঁটি অনতিক্রম্য। সোয়াস থেকে বেরিয়ে আমরা সিনেট হাউজে গিয়ে খেলাম।
বেশ কয়েকদিন পরে রাজেশ্বরী দত্তের আহ্বান এলো, তার ফ্ল্যাটে সন্ধ্যা কাটাবার জন্যে। আমি এককথায় রাজি। আগেরবারের মতো শেষ বিকেলে সোয়াস থেকে যাত্রা। ফ্ল্যাটে ঢুকে কোট ইত্যাদি যথাস্থানে রেখে ওঁর বসার ঘরে প্রবেশ করলাম। উনি কাউচে না বসে কার্পেটে আসন নিলেন। আমি জ্যাকেটটা কাউচে রেখে ওঁর মুখোমুখি বসলাম। রাজেশ্বরী একটা মাইল্ড ব্র্যান্ডের সিগারেট খেতেন–তার একটা ধরিয়ে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, সেদিন তোমরা অমন করলে কেন?
প্রশ্নটা আমার বুকে সজোর ধাক্কা দিলো। সেদিন এবং অমন কী, আমি বুঝে ফেলেছি। তবু, আশা করেছি, উনি টের পাননি। জানতে চাইলাম, কী, কবে? রাজেশ্বরী বললেন, ‘সেদিন লাঞ্চের সময়ে, আমাকে দেখে তুমি, তারাপদ, নিমাই দরজা থেকে ফিরে এলে। তার গলা ধরে এলো, চোখে উদ্গত অশ্রু। তিনি বললেন, ‘ওরা যাহোক, তোমাকে আমি অন্যরকম ভেবেছিলাম, এখন দেখছি, তুমিও ওই দলে–কিন্তু কেন, আমার সঙ্গে এমন করবে কেন?
আমি তার হাঁটুর ওপরে একটা হাত রাখলাম, কিছু বলতে পারলাম না।
একটু পরে বলতে গেলাম, আপনি আমাকে ভুল বুঝেছেন।
রাজেশ্বরী আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, না, আমি ভুল বুঝিনি। আসলে তোমরা আমাকে অ্যাকসেপ্ট করো না–বোধহয় আমি অবাঙালি বলে।
বললাম, আপনি বাঙালি না অবাঙালি, এ-প্রশ্ন কারো মাথায় ঢুকবে না।
উনি বলে চললেন, ‘হ্যাঁ, সেজন্যই তুমি আমাকে মেমোয়ার্স লেখার কথা বলছিলে, আমার পাঞ্জাবি ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে প্রশ্ন করছিলে। আমি তখন বুঝিনি, এখন স্পষ্টই বুঝছি–তোমরা আমাকে অন্য কিছু প্রতিপন্ন করার জন্য ব্যস্ত। পুরু চশমার ভেতর দিয়ে অশ্রু দেখতে পাচ্ছি।
জীবনে কখনো এত বিব্রত হইনি। ওঁকে কথা বলতে দিলাম; ওঁর হাঁটুর ওপরে যেমন হাত রেখেছিলাম, সেটা তেমনি রইলো। তাতে মিনতি ছিল।
খানিক পরে জানতে চাইলাম, ‘খাবার আনতে যাবেন না?
করুণ হাসি হেসে বললেন, ‘চলো।’
সেই টেক-অ্যাওয়ে চীনা রেস্তোরাঁ। এবারে খাবারের দামটা আমি দিলাম। রাজেশ্বরী বাধা দিলেন না। ম্লান হাসি হাসলেন।
ওঁর ফ্ল্যাটে এসে খাওয়া-দাওয়া সারলাম। বেশি কথা হলো না। বিদায় নিয়ে ফিরলাম। যখন উনি দরজা খুলে দিলেন, তখনো মনে হলো ওঁর দৃষ্টি স্বাভাবিক হয়নি। সারা পথ আমার মনের মধ্যে কাঁটা বিঁধতে লাগলো। কেন জানি না, সোয়াসে আর ওঁর অফিসঘরে ঢুকিনি। ওঁর বাড়ির কেয়ারটেকারের কাছে শুধু একদিন ওঁর পছন্দের পানীয় রেখে এসেছিলাম। উনি পেয়েছিলেন নিশ্চয়ই, কিন্তু প্রাপ্তিস্বীকার করেননি।
রাজেশ্বরী দত্তের সঙ্গে আর আমার দেখা হয়নি। এর পরের বার কলকাতায় এসে তিনি মারা যান। কী একটা সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিলেন বলে শুনেছি।
তার আগে আমিই ক্ষতবিক্ষত হয়েছি দুর্ঘটনায়–যে-দুর্ঘটনার ওপরে আমার হাত ছিল না।
১৫.
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আবুল ফজলের লেখা চিঠি পেলাম :
পরম প্রীতিভাজন।
আনিস, তোমার বন্ধু আর আত্মীয়দের কাছ থেকে তোমার খবর পেয়ে ও নিয়ে থাকি। সেদিন ঢাকায় আহমদ হোসেনের সঙ্গে দেখা হলো, জানালেন সম্প্রতি তিনি তোমার চিঠি পেয়েছেন এবং তুমি ভালো আছো।
ইতিমধ্যে তুমি বোধ করি খবর পেয়েছ সৈয়দ আলী আহসান সাহেব আমাদের বাংলা বিভাগে তার সাবেক পদে যোগ দিয়েছেন। জাহাগীর নগরে তিনি কিছু স্বার্থ আর বিদ্বেষবাদী রাজনীতির শিকার হয়েছিলেন। তার শরীরও অনেকদিন ধরে ভালো যাচ্ছে না। তাকে শান্তি আর নিরাপত্তা দেওয়া আমি আমার নৈতিক কর্তব্য বলেই মনে করেছি। তাই সর্বান্তকরণে আমি তাঁর আগমন আর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানকে স্বাগত জানিয়েছি। তার জন্য আমি সঙ্গে সঙ্গেই রশীদুল হক সাহেবের বাড়িটিও বরাদ্দ করে দিয়েছি।
যেদিন তিনি কাজে যোগ দিয়েছেন সেদিন থেকে, অধ্যাপকের (Professor) দ্বিতীয় যে পদটি রয়েছে তাতে তোমাকে নিয়োগ করেছি। আমার বিশ্বাস এতে তোমার পদ, মাইনে এবং সিনিয়রিটির কিছুমাত্র ক্ষতি হবে না। আমাদের এ সিদ্ধান্তের প্রতি তোমার সমর্থন আছে। জানতে পারলে আমি নিশ্চিন্ত বোধ করবো। তোমার নিজের যদি কোন দ্বিধা বা এ সম্পর্কে পরামর্শ থাকে তা অসংকোচে আমাকে জানাবে।
তোমার প্রতি আমার স্নেহ আর ঔৎসুক্য এ বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে নয়। আশা করি সর্বাংগীণ কুশলে আছো। তোমার স্ত্রী আর ছেলেমেয়েদের প্রতি আমার আন্তরিক স্নেহ।
শুভার্থী
আবুল ফজল
১৯৭২ সালে সৈয়দ আলী আহসানের ছুটিজনিত শূন্যপদে আমি অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগলাভ করেছিলাম। তারপরে বাংলা বিভাগে দ্বিতীয় একটি অধ্যাপক-পদসৃষ্টির উদযোগ নিয়েছিলেন উপাচার্য, তবে আমি লন্ডনে রওনা হওয়া অবধি সে-উদযোগ ফলপ্রসূ হয়নি। ওই পদটি যে সৃষ্ট হয়েছে, তা আমার জানা ছিল না। উপাচার্যের এই চিঠি পেয়ে তাই আমি যেমন স্বস্তি পেয়েছিলাম, তেমনি তার প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞ বোধ করেছিলাম।
