আর তিন মাস পর আব্বার ৭৮ বছর পূর্ণ হবে। আমি তাঁকে খুব-একটা অসুস্থ হতে দেখিনি। এবার এমনি রোগাক্রান্ত হলেন যে, তাঁর প্র্যাকটিস বন্ধ করে দিতে হলো, ষাট বছরের ধূমপানের নেশা ছাড়তে হলো!
২৬ এপ্রিল হিথরো বিমানবন্দরে টেলিফোনে ডা. নূরুল ইসলামকে ধরলাম। নিজের দেশের বিমানবন্দরে এভাবে কাউকে পাকড়াও করতে পারতাম কি না সন্দেহ। নূরুল ইসলাম কেবল বললেন, আপনার আব্বাকে দেখতে চাইলে আপনাকে অক্টোবরের মধ্যে ফিরে আসতে হবে। বললাম, আমি আগস্টেই ফিরবো। উনি বললেন, ‘সেই ভালো।’
ক্যানসারের চিকিৎসা করেন। তিনি আবার বিখ্যাত চিত্রাভিনেত্রী সুমিত্রা দেবীর বোন। তারাপদ বললেন, আপনার বাবার চিকিৎসা-সংক্রান্ত কাগজপত্র একবার এমাকে দেখাতে পারেন। ও কিছু পরামর্শ দিতে পারে, কিংবা পরামর্শ নেওয়ার জন্য অন্য ডাক্তারের কথা বলতে পারে আপনাকে।
বড়ো দুলাভাইকে লিখলাম, আব্বার এক্স-রে প্লেট এবং অন্যান্য কাগজপত্র কামাল হোসেনের দপ্তরে পৌঁছে দিতে। কামালকে লিখলাম, সেসব আমাকে পৌঁছোবার ব্যবস্থা করে দিতে। কামাল সবকিছু ব্যাগে পাঠালেন হাই কমিশনে। নূরুল মোমেনের ফোন পেয়ে সেগুলো নিয়ে এলাম। এমা মুখার্জি তখন লন্ডনের বাইরে কাজ করেন। ট্রেনে করে গেলাম তাঁর কাছে। তিনি মধ্যাহ্নভোজে আপ্যায়িত করলেন এবং কাগজপত্র সব দেখে বললেন, রোগটা অ্যাডভান্সড স্টেজে পৌঁছে গেছে, এখন কিছু করার সুযোগ নেই।
মেনেই নিতে হবে। এখন শুধু দিনক্ষণ গনা। শেষ দেখার অপেক্ষা মাত্র।
১৪.
রাজেশ্বরী দত্তের সঙ্গে আমার সম্পর্ক খুব ভালো, কিন্তু তারাপদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কী নিয়ে যেন বিরোধ আছে তাঁর। তারাপদ কখনো এ-বিষয়ে আমাকে কিছু বলেননি, কিন্তু রাজেশ্বরী একদিন জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার সঙ্গে তারাপদর বুঝি খুব ভাব!’ তাঁর প্রশ্ন শুনেই খটকা লাগলো, সুতরাং সতর্কতার। সঙ্গে জবাব দিলাম, না, ভাব বেশি নয়, তবে একই ক্ষেত্রের লোক তো, তাই একসঙ্গে ওঠাবসা আছে।’ রাজেশ্বরী বললেন, ‘তোমার চিঠিপত্র দেখি ওর দরজার বাইরে গেঁথে রাখে–অফিসে রাখে না।’ বললাম, এটা সেক্রেটারির কাজ। পাছে আমি এসে ওকে না পাই, বাইরে রাখা সুবিধে মনে করে।’ বোঝাই গেল, আমার উত্তরে উনি সন্তুষ্ট হলেন না।
তবু ওঁর বাড়িতে নিমন্ত্রণ করলেন। বিকেলবেলায় কাজ সেরে সোয়াস থেকে ওঁর গাড়িতে চেপে গেলাম ওঁর চমৎকার ফ্ল্যাটে। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের স্বকণ্ঠের আবৃত্তির টেপ চালিয়ে দিলেন। ওঁর জন্যে পানীয়ের একটা বোতল নিয়ে গিয়েছিলাম–সেটা খুললেন। খানিক পরে আমাকে নিয়ে গাড়ি চালিয়ে এক চীনা টেক অ্যাওয়ে থেকে খাবার কিনে আনলেন। ওঁর ঘরে বসে ভোজনপর্ব সারা হলো। খেতে খেতে গল্প। সুধীন্দ্রনাথ সম্পর্কে টুকিটাকি, নিজের জীবনের বেশ কিছু কথা। জানতে চাইলেন, বাংলাদেশে সুধীন্দ্রনাথ। সম্পর্কে আগ্রহ কেমন, কেউ লিখেছে নাকি কিছু তার বিষয়ে। বাংলায় এম এ ক্লাসে তাঁর কবিতা পাঠ্য শুনে খুব খুশি হলেন। আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘কালো সূর্যের নিচে ব্যুৎসব’ প্রবন্ধটির উল্লেখ করতেই হেসে বললেন, ‘এ তো সুধীনের লেখার মতোই কঠিন মনে হচ্ছে।’
রাজেশ্বরী তাঁর জীবনের পাঞ্জাব-পর্বের কিছু গল্প বললেন, আমি আরো একটু জানতে চাইলাম। তারপর বললেন শান্তিনিকেতন-পর্বের কথা, থেমে গেলেন সুধীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচয়ের কথায় এসে। শুনতে ভালো লাগছিল। বললাম, ‘আপনি স্মৃতিকথা লেখেন না কেন? অকপটে উত্তর দিলেন, আমি তো লিখতে পারি না। তাছাড়া কার আগ্রহ হবে এসব কথায়?’ বললাম, আপনার ভক্ত অনেক আছেন। আর আপনার জীবনকথা তো খুব কৌতূহলোদ্দীপক। কেমন করে পাঞ্জাব থেকে বাংলায় এসে আপনি রবীন্দ্র-সংগীতের একজন প্রধান শিল্পী হয়ে গেলেন, এটা জানতে অনেকেরই আগ্রহ হবে। আপনি রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্য, সুধীন্দ্রনাথের সহধর্মিণী, কতবছর ইউরোপ-আমেরিকা করলেন–এসব বিষয়েও আপনার বলার অনেক থাকবে। উনি স্বীকার করলেন সে-কথা, তবু বললেন, ‘আমাকে দিয়ে লেখা হবে না। বললাম, আপনি যদি মুখে বলে যান, আমি লিখে নিতে পারি, পরে আপনি অনুমোদন করলে তা ছাপা যেতে পারে। উনি আমার হাতে মৃদু চাপ দিলেন, বললেন, তুমি আমার গান শুনতে চেয়েছিলে-।’ টেপ ছেড়ে দিলেন, কথা বন্ধ হলো। একসময়ে বিদায় নিলাম, তার আগে ওঁর ফ্ল্যাটটা ঘুরে দেখালেন।
এর কদিন পরে তারাপদ মুখোপাধ্যায়ের অফিসকক্ষে গেছি। উনি খুব খুশি হয়ে বললেন, ভালো হয়েছে, আপনি এসেছেন। নিমাই আসছে, একসঙ্গে লাঞ্চ করা যাবে।’ নিমাই মানে নিমাই চট্টোপাধ্যায়। ১৯৫৬ সালে শান্তিনিকেতনে যে সাহিত্যমেলা হয়েছিল, তার প্রধান সংগঠক–তাতে কাজী মোতাহার হোসেন, মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন, শামসুর রাহমান ও কায়সুল হক যোগ দিয়েছিলেন। অন্নদাশঙ্কর রায়ের নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট লেখকেরা সম্মেলনের গৌরব বৃদ্ধি করেছিলেন। নিমাই চট্টোপাধ্যায় বহুকাল ধরে লন্ডন-প্রবাসী। ১৯৬৯ সালে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক যখন লন্ডনে ছিলেন, তখন নিমাইয়ের সঙ্গে পরিচিত হয়ে উনি খুব প্রীত হন। ফলে, তার পাঁচ বছর পর নিমাইয়ের সঙ্গে যখন আমার পরিচয় হলো, তখন আমরা উভয়েই উভয়ের সম্পর্কে কিছু জানি। নিমাই মাঝে মাঝে বি বি সি বাংলা বিভাগে সংস্কৃতি-বিষয়ে অনুষ্ঠান করতে আসতেন। সেই সূত্রেই যোগাযোগটা হলো। ব্রাইটনে নিমাইয়ের একটা বাড়ি ছিল–ফলে সেখানেও তাকে মাঝে মাঝে যেতে হতো। ফলে রণজিৎ গুহের সান্নিধ্যেও তাঁকে পেয়েছিলাম একাধিকবার। নিমাইয়ের বাড়িতেও গেছি–তার স্ত্রী জয়া চমৎকার সঙ্গী।
