পরে, ১৯৭৬ সালের দিকে, গিয়াসউদ্দীন দেশে ফিরে আসেন এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মে যোগ দেন। শুনেছিলাম, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছেন, এই দাবিতে তিনি দু বছরের অ্যান্টি-ডেটেড সিনিয়রিটি দাবি করেছিলেন। প্রমাণস্বরূপ নাকি মুক্তিযুদ্ধের জন্যে সংগৃহীত বিলেতের কোনো তহবিলে দু পাউন্ড চাঁদা দেওয়ার একটা রসিদের ফটোকপি দাখিল করেছিলেন। তবে এটা আমার শোনাকথা মাত্র।
১২.
দেশে রাষ্ট্রপতি-পদ্ধতির মন্ত্রিসভা গঠিত হয়ে গেছে জানুয়ারিতে। মন্ত্রীদের নামের ঘোষিত তালিকায় কামাল হোসেনের নাম ছিল, কিন্তু তিনি তখন অক্সফোর্ডে। দেশে গিয়ে মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার জন্যে তার কাছে তাগাদা আসতে থাকল। বঙ্গবন্ধুও ব্যক্তিগত পত্র দিলেন। কামাল এসব চিঠির জবাবে ইংরেজিতে খসড়া তৈরি করে রাখেন, আমি অক্সফোর্ডে গেলে তার বাংলা করে দিই, তিনি তা কপি করে পাঠিয়ে দেন স্বাক্ষর দিয়ে। কামাল অক্সফোর্ডে তাঁর। দায়িত্বের কথা বলেন, মন্ত্রিত্ব থেকে আপাতত অব্যাহতি চান, রাজনীতিতে পুনরায় যোগ দেওয়ার জন্যে সময় প্রার্থনা করেন। আমরা দেশের পরিস্থিতি আলোচনা করি, হামিদা মৃদু হেসে বলেন, কনশেন্স-টকের সময় এক ঘণ্টা–তারপর সবার সঙ্গে বসে সময় কাটাতে হবে।
কামালের কাছে একবার গিয়ে জানতে পারলাম, জার্মানির কোনো এক পত্রিকায় ঢাকায় দেওয়া ফজলুল হক মনির সাক্ষাঙ্কার প্রকাশিত হয়েছে। তাতে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে কামালের সম্পর্কে কিছু মন্তব্য আছে। তিনি যে জাতীয় কর্তব্য পালন না করে বিদেশে বসে বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা করছেন, তা নিয়ে কটাক্ষ আছে, কিন্তু সবচেয়ে মারাত্মক কথা, বাংলাদেশের প্রতি কামালের আনুগত্যে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। সেইসঙ্গে একথাও বলা হয়েছে যে, ১৯৭১ সালে বাকশালের তিন সম্পাদকের একজন–এমনিতেই প্রতাপশালী, তার ওপরে আনুষ্ঠানিক পদ অলংকৃত করে রয়েছে।
স্বভাবতই কামাল খুব ব্যথিত হলেন। কেন তিনি এই আকস্মিক আক্রমণের লক্ষ্য হলেন, এ-প্রশ্ন নিশ্চয় তাঁর মনে উঠে থাকবে। কিন্তু তার চেয়ে প্রবল হলো এই জিজ্ঞাসা যে, এই আক্রমণ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু আদৌ ওয়াকিবহাল কি না। এই প্রকাশিত সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর কী করা উচিত, এ-প্রশ্নও দেখা দিলো। শেষ অবধি তিনি স্থির করলেন, ওই সাক্ষাৎকার সম্পর্কে তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবেন না, তবে বঙ্গবন্ধুকে তার ক্ষোভের কথা জানাবেন।
অক্সফোর্ড থেকে ফিরে আসার পরদিন সকালে বি বি সি-তে গিয়েছি। জন ক্ল্যাপহাম আমাকে ডেকে নিয়ে বললেন, আজকের অনুষ্ঠানের কোনো কাজ আপনাকে করতে হবে না, আমার হাতে একটা স্পেশাল রিপোর্ট আছে–এটির বাংলা অনুবাদ করে দিতে হবে। কাগজটা হাতে নিয়ে দেখি, কামাল সম্পর্কে সেই জার্মান পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টের বি বি সি-র নিজস্ব ইংরেজি অনুবাদ। আমি বাংলা ভাষ্য তৈরি করে দিলাম–পরে সেটা কী কাজে লাগানো হয়েছিল, তা আমার জানা নেই। তবে খুব সম্ভব, বিষয়টি নিয়ে কামালের মন্তব্য চাওয়া হয়েছিল, তার জন্যে অবশ্য বাংলা অনুবাদের প্রয়োজন ছিল না।
কামাল অবশেষে স্থির করলেন, মার্চ মাসের মধ্যভাগে একাই দেশে ফিরবেন এবং বঙ্গবন্ধুর কাছে মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চাইবেন। হামিদা এবং আমি দুজনেই বললাম, দেশে ফিরে এলে তাকে শপথ নিয়ে মন্ত্রিত্ব করতে হবে–কেননা, এতকাল ধরে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব তারই জন্যে রেখে দেওয়া আছে। কামাল আশা প্রকাশ করলেন যে, বঙ্গবন্ধুকে বুঝিয়ে তিনি আবার অক্সফোর্ডে ফিরে আসতে পারবেন, তবে তার এ-কথায় আস্থার জোর পাওয়া গেল না।
কামাল ঢাকায় ফিরলেন এবং অচিরেই মন্ত্রিত্বের শপথ নিলেন। তাঁর অক্সফোর্ডে প্রত্যাবর্তন আপাতত অনিশ্চিত হয়ে রইল। সারা-দীনা সেখানে স্কুলে যাচ্ছে, হামিদা সংসার চালাচ্ছেন। একবার সারাকে ডাক্তার দেখাবার প্রয়োজন হলো। হামিদা নিজেই ডাক্তারের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে লন্ডনে নিয়ে এলেন তাকে। প্যাডিংটন স্টেশন থেকে তাদের নিয়ে আমি এলাম হার্লি স্ট্রিটে। সেখানে বসে থাকতে থাকতে দেখি, এ কে এম আবদুর রউফ এসেছেন একই ডাক্তারের কাছে। কাজ সারা হয়ে গেলে, হামিদার আপত্তি সত্ত্বেও, রউফ আমাদের সকলকে পৌঁছে দিলেন গোলডার্স গ্রিনে, কামালের একমাত্র বোন আহমদীর বাড়িতে। সেখানে কামালের মা-ও তখন থাকছেন। আমরা কীভাবে সেখানে পৌঁছলাম, তিনি তা জানতে চাইলেন। রউফকে দেখিয়ে বললাম, এঁর গাড়িতে। তিনি খুশি হলেন না। বললেন, তোমার বন্ধু কেমন মিনিস্টার–একটা গাড়িও পায় না। বউ-বাচ্চা টিউবে করে ঘোরে। আমি মা–কোথাও যেতে হলে অন্যের ভরসায় থাকতে হয়!’ আমি হেসে বললাম, কামাল বেশি শক্ত মন্ত্রী নয়।’ আরেকবার ও-বাড়িতেই গেছি কী এক উপলক্ষে। কামাল তখন আমেরিকায়। তার মা বললেন, তোমার বন্ধু বিলেত-আমেরিকা এ-পাড়া ও-পাড়া বানিয়ে ফেললো। কখন কোথায় থাকে, আমিই তার হদিস পাই না!’
কামাল ঢাকায়–এমন অবস্থায় হামিদার পক্ষেও সন্তানদের নিয়ে বেশিদিন অক্সফোর্ডে থাকা সম্ভবপর হলো না। ওঁরাও ফিরে গেলেন দেশে।
১৩.
প্রায় এই সময়েই খবর পেলাম, আব্বা অসুস্থ এবং শয্যাশায়ী। বন্ধু সৈয়দ আহমদ হোসেন দৌড়ঝাঁপ করে ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী এবং ডা. নূরুল ইসলামকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে এসেছিল। পৃথক পৃথকভাবে উভয়ের একই সিদ্ধান্ত–ফুসফুসের ক্যানসার এবং সেটা অনেকখানি পরিণত। ডা. নূরুল ইসলাম আরো জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর সহযাত্রী হয়ে তিনিও কমনওয়েলথ সম্মেলনে যাচ্ছেন কিংসটনে; যখন তাঁরা হিথরো বিমানবন্দরে যাত্রাবিরতি করবেন, তখন যদি আমি ভিআইপি লাউঞ্জে ফোন করে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পারি, তাহলে নিজমুখেই আব্বার অবস্থা আমাকে জানাবেন।
