১৯৭১ সালে দিল্লিতে যে-দুই বিশিষ্ট ইতিহাসবিদের সঙ্গে পরিচয় ঘটে, তাঁরা দুজনেই তখন ইংল্যান্ডে। তপন রায়চৌধুরী আছেন অক্সফোর্ডে। তিনি নাফিল্ড কলেজে আলোচনাচক্রের আয়োজন করছেন ১৯৭৫ সালের গ্রীষ্মকালে। আমাকে আদেশ দিলেন একটি লিখিত প্রবন্ধ পড়তে। খেটেখুটে একটা লেখা দাঁড় করলাম, Towards a redefinition of identity: East Bengal, 1947-71 নামে। সেটা সেখানে পড়া হলো। সমাগম হয়েছিল বেশ ভালো। আমার প্রবন্ধটা দীর্ঘ হওয়ায় এবং সবটা পড়তে বাধা না পাওয়ায় পুরো সময়ই লেগে গেল। ফলে প্রশ্নোত্তর পর্বের আর অবকাশ রইলো না। একদিকে বেঁচে গেলাম, অন্যদিকে অন্যের দৃষ্টির আলোক থেকে বঞ্চিত হলাম। তবে যারা আমাকে মতামত জানাতে এলেন, তাঁরা সবাই ভালো বললেন। সেটা কতটা সৌজন্যবশত বলা, আর কতটা তাঁদের সত্য অনুভূতির প্রকাশ, বলতে পারবো না।
রণজিৎ গুহ অধ্যাপনা করছিলেন সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে। অক্সফোর্ড বনেদি, সাসেক্স নবীন-যুদ্ধোত্তর রেডব্রিক ইউনিভার্সিটিগুলির একটি। এর অবস্থান রবীন্দ্রনাথের প্রথম যৌবনের স্মৃতিধন্য ব্রাইটনে-বড় সুন্দর জায়গা। রণজিৎ গুহের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে তার ও তার স্ত্রীর আতিথ্য গ্রহণ করতে হলো। অধ্যাপক তখন সাবঅলটার্ন হিস্ট্রির তত্ত্ব ও সংগঠন নিয়ে ব্যস্ত। নীলদর্পণ নিয়ে সদ্য চমৎকার প্রবন্ধ লিখেছেন Journal of Peasant Studies নামে গবেষণা-পত্রিকায়। প্রবন্ধের একটি রিপ্রিন্ট আমাকে দিয়ে বললেন, তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ আফ্রিকান অ্যান্ড এশিয়ান স্টাডিজে দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সেমিনারে একটি প্রবন্ধ পড়তে হবে। তার ইচ্ছে, উনিশ-বিশ শতকের বাঙালি মুসলিম লেখকদের চিন্তাধারা সম্পর্কে আমি লিখি, তবে ইচ্ছে করলে অন্য বিষয়েও লিখতে পারি। তার প্রস্তাবিত বিষয়ে লেখা আমার পক্ষেও সহজ। The World of the Bengali Muslim Writers in the Nineteenth Century (1870-1920) নামে একটি প্রবন্ধ সেখানে পাঠ করলাম। সামান্য আলোচনা হলো। সভাভঙ্গের পরে পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট মার্কসবাদী তাত্ত্বিক ও কর্মী বিপ্লব দাশগুপ্ত ও তার স্ত্রী এগিয়ে এসে পরিচয় দিলেন। বিপ্লব দাশগুপ্ত বললেন, প্রবন্ধের নাম শুনে তার সন্দেহ হয়েছিল, লেখাটায় সাম্প্রদায়িকতার রেশ থাকতে পারে। তিনি তেমন মনে করেই তা শুনতে এসেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারলেন, তার আশঙ্কা অমূলক।
পরে রণজিৎদাকে আমাদের সংলাপের কথা বললাম। তিনি বেশ চটলেন। বললেন, এই হলো তোমাদের বামপন্থী বুদ্ধিজীবী। নাম শুনে, ভেতরে না ঢুকে, একটা ধারণা করে ফেললেন!
নীলদর্পণ নিয়ে লেখা তাঁর প্রবন্ধ সম্পর্কে আমার মতামত জানতে চেয়েছিলেন রণজিৎদা। বললাম মনে হচ্ছে, দীনবন্ধু মার্কসবাদ কেন জানলেন না, তা নিয়ে আপনি ক্ষুব্ধ।’ রণজিৎ গুহ বললেন, ‘বটেই তো। নীলদর্পণ লেখার আগেই কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো এবং মার্কসের অন্য লেখা বেরিয়ে গেছে। কলকাতায়ও তা পাওয়া যেত। উনি পড়েননি কেন?’ এটা বোধহয় কৌতুকের ছলে বলা। তবে ওই প্রবন্ধে তার একটা প্রতিপাদ্য ছিল এই যে, সংকটের সময়ে কোন পক্ষ নেবেন, মধ্যবিত্ত তা স্থির করতে পারে না, ফলে তার ধ্বংস হয়ে পড়ে অনিবার্য। এই কথা, নাটকের বসু-পরিবার এবং নাট্যকার সম্পর্কে সমানভাবে প্রযোজ্য।
পরে আমার ওই ইংরেজি বক্তৃতাদুটির বাংলা ভাষ্য প্রকাশ করেছিলাম স্বরূপের সন্ধানে (ঢাকা, ১৯৭৬) বইতে। মূল ইংরেজি লেখা আরো পরে সংকলিত হয় আমার Creativity, Reality and Identity (ঢাকা, ১৯৯৩) গ্রন্থে। তপন রায়চৌধুরী ও রণজিৎ গুহের উদযোগ ছাড়া এ-দুটি কখনো লেখা হতো না।
১১.
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় গণিত বিভাগের শিক্ষক গিয়াসউদ্দীন উচ্চশিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্যে ১৯৭০ সালে যুক্তরাজ্যে গিয়েছিলেন। তিনি ঠিক রাজনৈতিক লোক ছিলেন না, কিন্তু মনেপ্রাণে পাকিস্তানপন্থী ছিলেন। তাই মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি কাজ করেছিলেন পাকিস্তানের পক্ষে। ফলে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে আর দেশে ফেরেননি। কষ্টেসৃষ্টে বিলেতে প্রবাসজীবন যাপন করছিলেন। আর চট্টগ্রামে তার স্ত্রী চমন আরা পাঁচ ছেলেমেয়ে নিয়ে দিনাতিপাত করছিলেন আরো কষ্টে। ভদ্রমহিলা ছিলেন বেবীর সহপাঠিনী। তাঁর পরিবারের জন্য আমাদের অনেকেরই সহানুভূতি ছিল। আমি যখন লন্ডনে যাই, তখন সহকর্মীদের কেউ কেউ আমাকে অনুরোধ করেছিলেন, আমি যেন গিয়াসউদ্দীনকে দেশে ফিরে আসতে প্রণোদিত করি। তিনি যেহেতু বাংলাদেশের পক্ষে আনুগত্য স্বীকার করেননি, তাঁর পক্ষে। পাসপোর্ট সংগ্রহ করাও ছিল কঠিন। উপাচার্য আবুল ফজল স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আমাদের হাই কমিশনার সৈয়দ আবদুস সুলতানকে একটি আধা-দাপ্তরিক চিঠি লিখে আমার হাতে দিলেন। তাতে তিনি অনুরোধ জানিয়েছিলেন, গিয়াসউদ্দীনের স্বদেশ-প্রত্যাবর্তনে হাই কমিশনার যেন ব্যক্তিগত উদযোগ নেন। আমাকেও বলে দিলেন, সৈয়দ আবদুস সুলতানকে যেন আমিও ব্যক্তিগতভাবে সব বিষয়টা বুঝিয়ে বলি।
লন্ডনে আমি পৌঁছোবার কিছুকাল পরে গিয়াসউদ্দীনের সঙ্গে দেখা হলো। তারপর তিনি দিনক্ষণ ঠিক করে আমাদের বাসায় এলেন। তাঁর ভয়, দেশে ফিরলে তিনি গ্রেপ্তার হবেন এবং তাঁকে জেল খাটতে হবে। আমি তাকে বললাম যে, সাধারণ ক্ষমা ঘোষিত হওয়ায় সে-ভয় নেই; তাছাড়া, উপাচার্য স্বয়ং তাঁর প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন, তিনি যাতে পাসপোর্ট পেতে পারেন সেজন্যে উপাচার্য চিঠি দিয়েছেন হাই কমিশনারকে, এবং এমন একজন প্রভাবশালী উপাচার্যের সাহায্য পেলে অনেক বাধাবিপত্তি তিনি পার হতে পারবেন। এতে গিয়াসউদ্দীন আরো ভয় পেলেন। তার মনে হলো যে, পুরো ব্যাপারটাই হচ্ছে তাঁকে কোনোমতে দেশে নিয়ে ফেলার পরিকল্পনা। নইলে তার মতো একজন সহকারী অধ্যাপকের জন্যে উপাচার্যের এত উৎকণ্ঠা কেন! যদিও তিনি আমাকে বললেন, ‘ভেবে দেখি’, কিন্তু আমি বুঝে গেলাম যে, তিনি দেশে ফিরবেন না। পরিবারের বিষয়ে তিনি তেমন উদৃবিগ্ন ছিলেন না। তাঁর ভরসা মুখ্যত আল্লাহর উপরে এবং গৌণত শ্বশুরকুলের উপরে। অতএব তিনি যেমন ছিলেন, তেমনি রয়ে গেলেন–আমার সঙ্গেও আর কোনো যোগাযোগ রাখলেন না।
