বাড়ি ফেরার পথে সেইদিনই টিউবে আমার ব্রিফকেস ফেলে এলাম। আমার যত টোকা, যত ফটোকপি, ঠিকানা ও টেলিফোন-নম্বরের বই, চেকবই, এটাসেটা–সবই তার মধ্যে। কী করে যে ব্রিফকেস ছাড়া গাড়ি থেকে নামলাম, সেটা ভেবে অবাক হই এবং নিজেকে ধিক্কার দিই। যখন টের পেলাম, তখনো অবশ্য ট্রেনটা দেখা যাচ্ছিল, কিন্তু আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশনে বলে কোনো লাভ হলো না। পরদিন যথারীতি লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ডের লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ডে ফরম পূরণ করে হারানোর খবর জানালাম। কিমাশ্চর্যতঃপরম! আমাদের ডাক এলেই ওপর থেকে শব্দ পেয়ে আনন্দ এক দৌড়ে নিচে চলে যেতো চিঠিপত্র আনতে। একদিন সে একতলা থেকেই চেঁচাতে আরম্ভ করলো, তোমার ব্যাগ পাওয়া গেছে।’ খোলা ডাকে যে-চিঠি এসেছিল, তাতে ছড়ি-ছাতা-ব্যাগের ছবি ছিল, তা দেখেই সে অনুমান করে নিয়েছে। সেই চিঠি নিয়ে যখন লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ডের জায়গায় পৌঁছোলাম, ব্রিফকেস সমর্পণ করে বয়স্ক অ্যাটেনডেন্ট সন্দেহ প্রকাশ করলেন, আমার তালিকার সব জিনিস তাতে আছে কি না। আসলে সবই ছিল, কিছুই খোয়া যায়নি। ১৯১২ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন বিলেতে যান, তখন সেখানে পৌঁছে ইংরেজি গীতাঞ্জলির পাণ্ডুলিপিসমেত একটা পোর্টম্যানটো ব্যাগ ব্রিটিশ রেলে ফেলে এসেছিলেন রথীন্দ্রনাথ–সেটিও লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড থেকে পাওয়া গিয়েছিল।
ব্রিফকেস ফেরত পাওয়ার আগেই কাজ শুরু করে দিয়েছি ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে। ১৯৬৫ সালে সেখানে যখন কিছুদিন পড়াশোনা করেছিলাম, তখন। লাইব্রেরিটা ছিল হোয়াইটহলের কাছে। এখন তা উঠে এসেছে ব্ল্যাকফ্রায়ার্সে। ওয়াটারলু স্টেশনে নেমে–সেটা আমার বাসস্থানের অপেক্ষাকৃত সন্নিকটে–ওল্ড ভিক-ইয়ং ভিক পেরিয়ে সেখানে পৌঁছোতে হয়, বেশি হাঁটতে হয় না। এখানকার পরিবেশ ব্রিটিশ মিউজিয়ম লাইব্রেরির মতো নৈর্ব্যক্তিক নয়। পৃথিবীর নানান দেশ থেকে নানান বিষয়ে গবেষকেরা ছোটেন মিউজিয়ম লাইব্রেরিতে। পরস্পরের আগ্রহের ক্ষেত্রের ভিন্নতাহেতু একজনের সঙ্গে আরেকজনের বন্ধুতা হয় না সহজে। ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরির বেশির ভাগ পাঠক গবেষণা করেন। ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা নিয়ে–চীন বা ইরান, ইরাক বা মিশর নিয়ে কাজ করেন, এমন গবেষকও আছেন, তবে তাদের সংখ্যা কম। অনেকে একই দেশ থেকে বা একই প্রতিষ্ঠান থেকে পূর্বপরিচয় নিয়ে আসেন, গবেষণার ক্ষেত্র সম্পর্কে পারস্পরিক কৌতূহলের কারণে অনেকের মধ্যে নতুন বন্ধুত্ব হয়। লাইব্রেরির কর্মকর্তা ও গবেষকদের মধ্যেও সৌহার্দ্য গড়ে ওঠে অল্পকালে। আমি তো ঢাকা-চট্টগ্রাম-রাজশাহীর অনেককে পেলাম, কলকাতা-দিল্লি-কলম্বোরও কাউকে কাউকে। দু-চারজন ইংরেজ পণ্ডিতের সাক্ষাৎ পাওয়া গেল এবং লাইব্রেরির কর্মকর্তাদের কারো কারো সঙ্গেও ভাব হয়ে গেল।
প্রতিভা বিশ্বাস ছিলেন উত্তর ভারতীয় আধুনিক ভাষার বইপত্রের দায়িত্বে। আমার দু-একটি বই যে লাইব্রেরির সংগ্রহে আছে, এ-কথা তিনি উৎফুল্ল হয়ে। জানালেন। অল্পবয়সে বিধবা হয়ে বেশ সংগ্রাম করে আত্মপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন ভদ্রমহিলা। এক মেয়ে নিয়ে তার সংসার। বেশ হাসি-হাসি মুখ, তবু মনে হয় সদাই একটা চিন্তা লেগে আছে তার মনে। পদমর্যাদায় তার ওপরে মাইকেল ও’কিফ–সংস্কৃত, পালি ও প্রাকৃত বই ও পাণ্ডুলিপির সহকারী সংরক্ষক। তার সঙ্গে সহজে সখ্য হয়ে গেল। কিছু না জেনেই পরে একদিন তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তালিকায় নেই, এমন বাংলা কাগজপত্র লাইব্রেরির কোথাও গচ্ছিত আছে কি না। সে বললো, আছে কিছু, তবে সেসব যে কী, তা আমার জানা নেই, লাইব্রেরির আর কেউ জানে না। আমার কৌতূহল বেড়ে গেল। বললাম, সেগুলো একবার দেখা যায় না? সে বললো, জানাব। তারপর একদিন আমাকে ডেকে নিয়ে গেল স্ট্যাকে। সেখানে একটা শেলফের একেবারে নিচের তাকে বেশকিছু কাগজপত্র, সুতোয় গাঁথা খাতার মতো। এমন গোটাদুই খাতা পড়ার ঘরে এনে দেখার ব্যবস্থা হলো। খানিক পরীক্ষার পরে বুঝতে পারলাম, এসব ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঢাকা কুঠির দৈনন্দিন চিঠিপত্র। ঢাকা কুঠি কাপড়ের ব্যবসা করতো। ঢাকা, ময়মনসিংহ ও ত্রিপুরার কয়েকটি জায়গায় ছিল কোম্পানির আড়ং। সেসব আড়ংয়ের গোমস্তারা তাঁতিদের ফরমাশ ও দাদন দিয়ে কাপড় তৈরি করিয়ে নিতো। ফরমাশ আসততা লন্ডন থেকে কলকাতায়, কলকাতা থেকে ঢাকায়, ঢাকা থেকে এসব আড়ংয়ে, আড়ং থেকে তাঁতিদের কাছে। তাঁতিরা কাপড় বুনে দিলে তা যাচাই-বাছাই হয়ে উলটো পথে লন্ডনে পৌঁছোতো। চিঠিগুলো কুঠি ও আড়ংয়ের মধ্যে চালাচালি হয়েছিল। বাংলার অর্থনৈতিক ইতিহাসের একটা অধ্যায় স্পষ্ট হয় এসব চিঠিপত্রের সাহায্যে। এর ভাষা ও রীতিও উল্লেখযোগ্য। আমি কিছু চিঠি হাতে নকল করে নিতে থাকলাম–কেননা এগুলো ফটোকপি করা যাবে না।
এই অবস্থায় মাইকেল একদিন বললো, তুমি কি এই কাগজপত্রের একটা তালিকা করে দেবে–সামান্য কিছু বিবরণ দিয়ে? আমি তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে গেলাম। খাতাগুলোতে ওদের রীতি-অনুযায়ী ডাক-নম্বর বসালাম। বিবরণীতে কাগজের মাপ-জোক, ধরন, প্রেরক ও প্রাপকের নামধাম, পৃষ্ঠা সংখ্যা ইত্যাদি দেওয়া গেল। নিজে হাতে টাইপ করে একটা বাইন্ডার লাগিয়ে A Handlist of Uncatalogued Bengali Manuscripts in the India Office Library and Records নাম দিয়ে তালিকাটা মাইকেলকে দিলাম। সে খুব খুশি হয়ে বললো, এটা বরঞ্চ তুমি আমাদের ডাইরেক্টরের হাতে দাও–আমি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করছি! মিস জোন ল্যানকাস্টার ডাকসাইটে গ্রন্থাগারিক–সহকর্মীরা তাঁকে একটু বেশিই সমীহ করতেন। তার হাতে যখন তালিকাটি সমর্পণ করলাম, তিনি যথেষ্ট সন্তোষ ও সৌজন্য প্রদর্শন করলেন। বললেন, তার দেখা হয়ে গেলে ওটা ক্যাটালগ-হলে অন্যান্য তালিকা গ্রন্থের সঙ্গে স্থান পাবে। এটা আমার জন্যেও ছিল আশাতীত পুরস্কার।
১০.
এর আগে উল্লেখযোগ্য দুটি ঘটনা ঘটেছে।
