ওদিকে আমার এক ছাত্রী একদিন বাসায় এলো পরামর্শ নিতে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সে ঢাকা বেতারে খবর পড়তো। তাতে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেই তার কিছু সমস্যা দেখা দেয় এবং কোনোরকমে একটা পাসপোর্ট সংগ্রহ করে সে শিশুসন্তান নিয়ে বিলেতে চলে আসে। লন্ডনে সে একটি অফিসে কাজ পেয়েছিল, সেসঙ্গে তার প্রচলিত নাম পালটে ভালো নামের একাংশ ব্যবহার করে বিবিসির বাংলা বিভাগে বেতার-অনুষ্ঠান করতো। এখন তার এদেশে থাকার মেয়াদ শেষ হয়ে এসেছে, তবে সে দেশে ফিরতে চায় না। বিলেতে থেকে যাওয়ার যে সহজ উপায় তার সামনে খোলা আছে, তা হলো একজন ব্রিটিশ নাগরিককে টাকা পয়সা দিয়ে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষকে দেখানো-বিয়ে করা। উপার্জনের উপায় হিসেবে অনেক ব্রিটিশ নর-নারী এমন করে থাকে। কিন্তু আমার ছাত্রীর ভয় হলো, এই মিথ্যে বিয়ের পাত্র যদি হঠাৎ করে তার কাছে দাম্পত্য সম্পর্ক দাবি করে, তাহলে কী হবে? আমি এত অল্পদিন হয় ওদেশে গেছি এবং এসব বিষয়ে এত কম জানি যে, তাকে কোনো পথ বাতলাতে পারলাম না। পরে, মনে হয়, তাকে এরকম ঝুঁকির মধ্যে যেতে হয়নি, ইমিগ্রেশনের কর্মকর্তাদের বুঝিয়ে সে বিলেতে থাকার সময় বাড়াতে পেরেছিল। বিবিসিতেও তার আসা-যাওয়া অনেকদিন অব্যাহত ছিল।
বিবিসিতে আমিও নিয়মিত অনুষ্ঠান করতে লাগলাম। সাম্প্রতিক ঘটনার অনুষ্ঠান প্রবাহ, সংস্কৃতি, শিল্প ও বিজ্ঞান–এসবে। এরমধ্যে প্রবাহের কাজটা ছিল তাৎক্ষণিক অনুবাদের, বাকি সব বাড়িতে বসে তৈরি করা যেতো। প্রবাহের কাজটা হতো দুপুরবেলায়–তা প্রচার হতো সরাসরি।
তখন লাইব্রেরি থেকে বুশ হাউসে চলে যেতে হতো। দুপুরের খাওয়াটা সারা হতো ওই বাড়ির ক্যান্টিনে। বাকি সব অনুষ্ঠানের রেকর্ডিং হতো বিকেলে বা সন্ধ্যায়। তখন লাইব্রেরির পাঠ শেষ করে এসে কাজটা করা যেতো। সেসঙ্গে বুশ হাউসের নিচের তলায় বিবিসি ক্লাবে তুমুল আড্ডা দেওয়া যেতো। সিরাজুর রহমান ও শ্যামল লোধ খুবই আড্ডাবাজ মানুষ–তাদের উপস্থিতি ছিল প্রত্যহ। মানুষকে কাছে টানার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল সিরাজুর রহমানের, আপ্যায়ন করতেও তিনি ছিলেন অকৃপণ। নূরুল ইসলাম ও দীপঙ্কর ঘোষও প্রায় আসতেন। অনুষ্ঠান থাকলে তো বটেই, অনুষ্ঠান না থাকলেও নাজির আহমদ সেখানে আসতেন আর তাঁর অফুরন্ত ভান্ডার থেকে বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার কথা বলে আসর জমিয়ে রাখতেন। আমার মতো আর যারা বাইরে থেকে অনুষ্ঠান। করতে আসতেন–শফিক রেহমান, তালেয়া রেহমান, নূরুস সাফা, নরেশ চক্রবর্তী–এই আড্ডায় তাদের যোগদানও ছিল অনিবার্য। আচ্ছাটি খুবই উপভোগ্য হতো, আমার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যে সত্যিই অনুকূল। মাঝে মাঝে বিবিসি ক্লাব থেকে শ্যামল লোধের সঙ্গে বেরিয়ে বাসে চেপে আসতাম ওয়াটারলু। স্টেশনে। শ্যামল থাকতেন লন্ডনের একটু বাইরে–ওয়াটারলু থেকে তিনি বাড়ি যাওয়ার ট্রেন ধরতেন, আমিও সেখান থেকে টিউব ধরে বাড়ি ফিরতাম। কোনোদিন উদ্দিষ্ট ট্রেন না ধরতে পারলে কিংবা ট্রেনের দেরি থাকলে স্টেশনেরই কোনো বারে বসে শ্যামল আরেক পাইন্ট বিটার খেয়ে নিতেন। তাঁর ট্রেন না আসা পর্যন্ত আমি তাকে সঙ্গ দিতাম।
প্রবাহের কাজ করতাম বলে বাংলা বিভাগের সাপ্তাহিক রোস্টারে আমার নাম মুদ্রিত হতো। আমার ছাত্র, লন্ডনের সাপ্তাহিক জনমতের সম্পাদক এ টি এম ওয়ালী আশরাফ একদিন খানিকটা ইতস্তত করে বলেই ফেললো যে, রোস্টারে এভাবে নাম থাকাটা আমার অধ্যাপক পদমর্যাদার পক্ষে হানিকর বলে তার মনে হয়–আমি যেন বিষয়টা ভেবে দেখি। ওয়ালী আশরাফ নিজেও বিবিসিতে অনুষ্ঠান করতো। আমি তার কাছে জানতে চাইলাম, অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়াটা আমার পক্ষে অসম্মানজনক বলে তার মনে হয় কি না। সে বললো, অনুষ্ঠান করতে কোনো বাধা নেই, কিন্তু আর দশজনের সঙ্গে বার ও সময় উল্লেখ করে কর্তব্যতালিকায় যেভাবে আমার নাম দেওয়া হয়, তাতে আমাকে বিবিসির চাকুরে বলে মনে হয়। আমি বললাম, কাজটা যদি অসম্মানজনক হয়, তাহলে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নিয়মকানুন বা আনুষ্ঠানিকতা মানতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। ওয়ালী আমার যুক্তি যে মানলো তা নয়, তবে চুপ করে গেল। তার কথাও আমি স্বীকার করিনি, কিন্তু আমার সুনাম ও সম্মানরক্ষায় তার এই উদ্বেগ আমার মন স্পর্শ করেছিল। তার অনুরোধে কিছুদিন আমি জনমতে লিখতে আরম্ভ করেছিলাম, তবে তা বেশিদিন চালাতে পারিনি। সেসব লেখার সম্মানী সে নিয়মিত পাঠিয়ে দিতো। বৃত্তির অতিরিক্ত কিছু উপার্জন যে আমার প্রয়োজন, তা সে বুঝেছিল।
৯.
ব্রিটিশ মিউজিয়ম লাইব্রেরিতে আমার গবেষণার উপকরণ ছিল অপেক্ষাকৃত কম, তাই সেখানকার কাজ আগে শেষ করতে চাইলাম। আঠারো শতক থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নিত্যনতুন যেসব আইন প্রণয়ন করছিল, তার বাংলা মুদ্রিত অনুবাদ সেখানে রক্ষিত ছিল। একেবারে আন্দাজের ওপর ভর করে ওয়ারেন হেস্টিংসের ব্যক্তিগত কাগজপত্রের সংগ্রহ খুঁজতে আরম্ভ করলাম এবং সত্যিই তার মধ্যে বাংলা হস্তাক্ষরে কাগজ পেয়ে গেলাম। লন্ডনে যখন হেস্টিংসের অভিশংসন হচ্ছিল, তখন বড় মানুষ ও সওদাগর ও আশরাফ ও ভদ্রলোক কলিকাতা শহরের বাসীসকল’ হেস্টিংসের পক্ষসমর্থন করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ডাইরেক্টরদের কাছে বাংলা ভাষায় এক আবেদনপত্র–এখনকার ভাষায়, স্মারকলিপি–পাঠিয়েছিলেন, তার একাধিক নকল পাওয়া গেল। ওই লাইব্রেরিতে টোকাটুকি যা করার করলাম, বেশকিছু কাগজপত্রের ফটোকপিও সংগ্রহ করলাম। যেদিন ফটোকপি পেলাম, সেদিন এই ভেবে লাইব্রেরি থেকে বের হলাম যে, আপাতত এখানে আর না এলেও চলবে।
